Naya Diganta

উজবেকিস্তানের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন

মধ্য এশিয়ার অন্যতম দেশ উজবেকিস্তান। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর থেকেই দেশটির একমাত্র শাসক ছিলেন ইসলাম করিমভ। ২০১৬ সালে তার মারা যাওয়ার পর শাভাট মির্জিয়ায়েভ নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশটির শাসনভার তুলে নিয়েছেন।

তিনি শাসন ক্ষমতা হতে নেয়ার পরেই উজবেকিস্তানের অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। তিনি দেশটির সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল ফারগান ভ্যালিকে কেন্দ্র করে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সীমানা আবার খোলার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দের হোটেলগুলো পশ্চিমা কনসালটেন্সি, সৌদি রাজকীয় ও আগ্রহী এশিয়ান বিনিয়োগকারীদের ভিড় বাড়ছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও এখান থেকে কমিউনিজম বিতাড়িত হয়নি। যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র কাজাখস্তান দিন দিন পুঁজিবাদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। সেখানে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য দরজা খোলে দেয়া হয়েছে।

অন্য দিকে উজবেকিস্তানের সাবেক প্রধান করিমভ তার দেশে বিদেশী বিনিয়োগের পথ বন্ধ করে রেখেছিলেন। সেখানকার অর্থনীতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করত। ব্যক্তিমালিকানাধীন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোও ছিল সীমাবদ্ধ। মুদ্রা ও পুঁজি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোরভাবে মুদ্রা ব্যবস্থার প্রণয়ন করেছিল। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের সাথে মিলে এসব কাণ্ড ঘটিয়েছে। চাকরির খোঁজে ২ মিলিয়ন উজবেক রাশিয়া চলে যান। প্রাকৃতিক গ্যাস ও তুলা রফতানিতে সরকার একচেটিয়াভাবে অর্থায়ন করে। পরে বাধ্যতামূলক শ্রমের মাধ্যমে ফসল কাটানো হয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট মির্জিয়ায়েভ অবশ্য প্রকাশ্যে করিমভকে বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। কিন্তু গত দুই বছরে করিমভের নেয়া বিভিন্ন ব্যবস্থায় তিনি হস্তক্ষেপ করেছেন। মিরজিওয়েভ ক্ষমতায় আসার পর নিরপত্তা বিভাগের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রুস্তাম ইনয়েতাতভকে বরখাস্ত করেন। অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে সীমান্ত খুলে দেন, মুদ্রা ব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এ ছাড়া তিনি নাটকীয়ভাবে বাধ্যশ্রম বন্ধ করেন।

অর্থমন্ত্রী জামশেদ কুচক্রোভ বলেছেন, শুধু গত বছরের মধ্যে দেশটিতে নিবন্ধিত ব্যবসা সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ চার গুণ বেড়ে গেছে, যদিও সম্প্রতি এই বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে, কারণ তা এখানকার সাধারণ নাগরিকদের কাছে এটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ সুবিধার বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর বেসরকারীকরণ, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কারণে সেখানে এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। তাদের জন্য দ্রুততম সময়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশটির আবাদি জমির বেশির ভাগ অংশে তুলা ও গমের চাষ করা হয়। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবেই এখানে দু’টি বিষয় চলে আসে, তা হলো এই ফসল দু’টি উৎপাদন করতে অধিক পানির ব্যবহার হয়। কিন্তু এসব ফসল থেকে সেই পরিমাণ লাভ করা যায় না। এসব কারণে সরকার কৃষকদের ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন উপায়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। বলা হয়, এক হেক্টর জমিতে তুলা চাষে যেখানে দু’জন শ্রমিক লাগে সেখানে এক হেক্টর জমিতে টমেটো চাষে ২০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। রাশিয়া, চীন ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে উজবেকিস্তানের টমেটো ও চেরি ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

তুলা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত দেশটিতে কৃষকদের তুলা চাষের জন্য প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। দেশেই টেক্সটাইল কারখানা নির্মাণের মাধ্যমে তুলা রফতানি কমিয়ে আনতে চাচ্ছে দেশটি। গত ১০ বছর আগে যেখানে ১০০ মিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল পণ্য রফতানি করা হতো তার গত বছরে এক বিলিয়নে পৌঁছেছে। দেশটির সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে এটা ৭ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
অন্য দিকে উজবেকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে তারা বিদেশী বিনিয়োগের প্রতি ব্যাপক মনোযোগ দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাথে বিনিয়োগকেন্দ্রিক বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করছে দেশটি।

কিন্তু এতসব পরিবর্তনের লক্ষ্যে চালিয়ে যাওয়া এসব পরিকল্পনা কতটুকু সফল হবে তা নিয়েও রয়েছে জল্পনা-কল্পনা। কারণ ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সাথে সখ্য গড়ে অনেকেই নিজের কার্য হাসিল করে নিচ্ছেন বিভিন্ন উপায়ে। তাই এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা সত্যি উজবেকিস্তানের সাধারণ নাগরিকদের উন্নত জীবনের পথে সহায়ক হবে কি না সে প্রশ্নের জবাব পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু সময়।