Naya Diganta

তাল-লয়-ছন্দ ও গীত সঙ্গীতের বাল্যকাল!

ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবন কেটেছে ফরিদপুরে। জেলার প্রধানতম ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমিক বিদ্যালয় বলে স্বীকৃত বাইশরশি শিবসুন্দরী একাডেমির একজন ছাত্র ছিলাম- এমন স্মৃতি মনে হলে এখনো মনের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি বয়ে যায়। সেই জমানায় শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে নিয়মিত সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা, খেলাধুলা, বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপন, ধর্মীয় অনুষ্ঠাদি ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। সম্মানিত শিক্ষকেরা ছিলেন অতি উঁচু মানের মানবিক ও নৈতিক বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, সততা এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আপত্য স্নেহ দেখলে এমনিতেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যেত। অন্য দিকে, কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতা এবং পাঠদানের পর পড়া আদায়ের কৌশলের কারণে আমরা সবাই শিক্ষকদের যমের মতো ভয় পেতাম। বিদ্যালয়টিতে আমি মাত্র একটি বছর অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েই আমি বাবার কর্মস্থলের অন্য একটি বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম।

আমি আমার শিক্ষাজীবনে দেশ-বিদেশের নামকরা বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছি। আমার কর্মজীবনও নানারকম রোমাঞ্চকর বিচিত্রতায় ভরপুর। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে রয়েছে অসংখ্য সুমধুর স্মৃতি। সাহিত্য-সংস্কৃতি-ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক অনুরাগীদের সাথে চলাফেরা, আড্ডা ইত্যাদির পাশাপাশি সদলবলে অথবা একাকী পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করে নিজের মানসপটে বহু বর্ণিল চিত্র অঙ্কিত করেছি। শৈশব থেকে কৈশোর এরপর যৌবন পেরিয়ে পৌঢ়ত্বে দাঁড়িয়ে বার্ধক্যের হাতছানির আশায় অপেক্ষা করতে গিয়ে কখন সে সন্তান থেকে বাবা হলাম কিংবা জামাই থেকে শ্বশুরে পরিণত হলাম তা ভাববার অবসর না হলেও আমার বাল্যকাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীর অধ্যয়নকালীন বহু স্মৃতি নিজের অজান্তে প্রায়ই মন-মস্তিষ্কে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় আহারে-বিহারে অথবা নিদ্রা কিংবা বিশ্রামে।

আগেই বলেছি, আমার পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং কর্মজীবনে অতি উত্তম পরিবেশ পেয়েছি। কিন্তু কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতিই আমার বাল্যকালের ষষ্ঠ শ্রেণী অবধি সময়ের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরিবার-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, সমাজ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম বছরটি আমার স্মৃতিতে কেন সুখময়তার আবেশ ছড়ায়, সে কথাগুলো আজ আপনাদের শোনানোর চেষ্টা করব। আমি খুব অল্প বয়সেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। সুতরাং সেই হিসাবে ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে আমার বয়স বড়জোর ১০ কিংবা ১১ বছর ছিল। আমার গ্রামের বাড়ির সামনের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ পেরিয়ে ছোট একটি খাল পাড়ি দিয়ে আমরা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় উঠে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম। আমাদের সেই সময়ে গ্রামবাংলার বেশির ভাগ এলাকা ছিল বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি নাম না জানা বৃক্ষের ছায়াশীতল পরিবেশ, পাখির কূজন এবং বন-বনানীর অদ্ভুত নৈসর্গিক শব্দমালা শিশুমনে ভয় ধরিয়ে দিত। আমরা বলতে গেলে সবাই দিনে-রাতে, সবসময়ই ভূত-প্রেতের ভয়ে তটস্থ থাকতাম।

তা ছাড়া রাক্ষস-খোক্ষস ছাড়াও ছেলেধরার আতঙ্কও আমাদের তাড়া করত। আমাদের শৈশবের মা-দাদী, খালা-ফুফু ও চাচীরা সম্ভবত আমাদের চেয়ে বেশিমাত্রায় ভূত-প্রেতের আতঙ্কে অস্থির থাকতেন। ফলে গ্রামগঞ্জের গৃহস্থ বাড়িগুলোতে ডাক্তার কবিরাজের চেয়ে গণক ঠাকুর, ওঝা, সাপুড়ে, পীর-ফকির ও সাধু সন্যাসীদের কদর ছিল অনেক বেশি। পরিবারের ছেলে-বুড়ো ও নারী-পুরুষ সবাই একাধিক তাবিজ ধারণ করতেন। যারা যত বেশি সুন্দর বা সুন্দরী অথবা আদরের বা সোহাগের পাত্র-পাত্রী ছিলেন তাদের শরীরের কোমর, গলা এবং হাতে কম করে হলেও গোটা বিশেক তাবিজ থাকত। অনেকে আবার অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য সোনা-রুপার মাদুলি, সপ্তধাতুর চাকতি, চকিদারের চামড়ার বেল্টের অংশ, কড়ি, হরিতকীর বীজ ইত্যাদির মালা বানিয়ে গলা অথবা কোমরে পরত। সংসারের বড় ছেলে শিশু যদি অতিশয় সুদর্শন হতো, তবে অশরীরী আত্মার অভিশাপ থেকে বাঁচার জন্য ছেলেটির ডান কান ছিদ্র করে একটি সপ্ত ধাতুর কানফুল পরিয়ে দেয়া হতো। আমাদের গ্রামের সচ্ছল মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই কমবেশি এসবের প্রচলন ছিল। তবে দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা ইচ্ছা করলেও তাদের সন্তানদের একাধিক তাবিজ পরাতে পারত না আর্থিক কারণে। তারা শুধু সাপের দংশন থেকে বাঁচানোর জন্য একটি তাবিজ অথবা গাছের শিকড় প্রিয় সন্তানদের শরীরে লটকিয়ে দিতেন।

বহুবিধ সতর্কতায় তাবিজ-কবজে ঝাড়ফুঁক ইত্যাদির পরও বহু লোক সর্প দংশনে মারা যেত। গভীর রাতে ভূতের ভয় পেয়ে অনেকের হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যেত। কারো কারো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতো, কেউ কেউ পাগল হয়ে যেত। ভূতেরা এবং দুষ্ট জিনেরা সাধারণত নিমগাছ, বটগাছ অথবা গাবগাছে থাকত। তারা দুপুরের সময় বাঁশঝাড়ে আড্ডা দিতে আসত এবং গভীর রাতে গ্রামের বাড়িঘরসংলগ্ন কাঁচা পায়খানা যেগুলোকে স্থানীয় ভাষায় টাট্টি বলা হতো, সেখানে বসে থেকে লোকজনকে ভয় দেখাত এবং মাঝে মধ্যে বদনা চুরি করত। ভূতেরা এবং বদ জিনেরা গ্রামের সুন্দরী উঠতি বয়সের মেয়েদের ওপর ভর করত এবং সেসব মেয়েকে দিয়ে দিনে-রাতে এমন কাণ্ড করাত যা দেখে গ্রামের সবাই ভয়ে থরথর করে কাঁপত। পুরো গ্রামের মুরব্বিরা মিলে ভূত-প্রেত ও জিনের আছর থেকে সুন্দরী মেয়েকে বাঁচানোর জন্য বিখ্যাত ওঝার দল ভাড়া করে আনতেন। ওঝারা সারারাত আবার কখনো কখনো কয়েক রাত চেষ্টা করে ভূত-প্রেত-জিনের আছর থেকে মেয়েটিকে রক্ষা করত এবং অশরীরী আত্মারা চলে যাওয়ার সময় নিকটস্থ কোনো গাছের বড়সড় একটি ডাল ভেঙে তারপর নিজেদের দেশে উড়াল দিত।

গ্রামবাংলার উল্লিখিত কুসংস্কারগুলোর সাথে আরো একটি কুসংস্কার বেশ জনপ্রিয় ও সর্বজনবিদিত ছিল, আর তা হলো- ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় ভূত-প্রেত ওঠে না। এটা নাকি ব্রিটিশ আমল থেকেই হয়ে আসছিল। সুতরাং জনপ্রিয় এই জনশ্রুতির ওপর ভরসা করেই আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে এক দৌড়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় ওঠে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম। তারপর ঘোড়ার গাড়ির পেছনে প্রতিযোগিতা করে সদলবলে দৌড়াতে দৌড়াতে স্কুলে গিয়ে পৌঁছাতাম। আমাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর আমরা সবাই যেন এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত হতাম। গ্রামের তাবৎ কুসংস্কার ভুলে গিয়ে আমরা বিদ্যাচর্চার মাধ্যমে আধুনিকতার এক নবদিগন্তে প্রকেশ করতাম। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলীদের প্রায় সবাই চমৎকার করে কথা বলতে পারতেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এত চমৎকারভাবে আমাদের গল্প শোনাতেন, যার শব্দ আজো আমি শুনতে পাই।

আমাদের বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নানা রকম যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্যসংকলিত একটি গবেষণাগার ছিল। গানবাজনার জন্য ছিল ভিন্ন একটি বড়সড় কক্ষ। এ ছাড়া বিভিন্ন দুর্লভ প্রাচীন বইপুস্তকে ঠাসা একটি লাইব্রেরি ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানের পিপাসা মেটাত। আমি লাইব্রেরিতে যেতাম এবং বই ধার নিয়ে পড়তাম। লাইব্রেরি থেকে ধার নেয়া আমার জীবনের প্রথম বইয়ের নাম ছিল ‘টারজান দ্য অ্যাপম্যান’। এডগার রাইস বারোজের টারজান সিরিজের সেই বইটির প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি দৃশ্য, কাহিনী এবং প্রেক্ষাপট আমার মনে এমনভাবে গেঁথে আছে, যা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। হামেদ মিয়া নামের একজন প্রবীণ শিক্ষক লাইব্রেরির দায়িত্বে ছিলেন।

তিনি সাধারণত বাংলা প্রথমপত্র পড়াতেন। অসাধারণ গল্প বলার ক্ষমতা, হাস্যরস এবং সম্মোহনি শক্তি দ্বারা তিনি আমাদের চিত্তে অমর হয়ে আছেন। হামেদ স্যারের উৎসাহে অনেক ছাত্রছাত্রী সেই ষষ্ঠ শ্রেণীর বয়সকাল থেকেই শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস-দর্শন-কাব্য কিংবা মহাকাব্যের অনুরক্ত পাঠক-পাঠিকাতে পরিণত হয়ে যায়। শুধু হামেদ স্যার নন, অন্য স্যারেরাও পাঠদানের পাশাপাশি আরো অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতেন। অঙ্কের স্যাররা সঙ্গীত শেখাতেন, বিজ্ঞানের স্যারেরা খেলাধুলার নেতৃত্ব দিতেন, শরীর চর্চার শিক্ষক ইংরেজি পড়াতেন এবং বাংলা ব্যাকরণের শিক্ষকরা স্কাউট ও ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর পরিচালনা করতেন।

আমাদের বিদ্যালয় আন্তঃজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। ফুটবল কিংবা হাডুডুর মতো খেলাধুলায় অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতা হলে আমরা সদলবলে খেলার মাঠে উপস্থিত থেকে নিজ নিজ দলকে উৎসাহ দিতাম এবং দলের জয়-পরাজয় হৃদয়ে ধারণ করে হর্ষ-বিষাদে অবগাহন করতাম। নজরুলজয়ন্তী, রবীন্দ্রজয়ন্তী, ঈদে মিলাদুন্নবী, সরস্বতী পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নবীনবরণ, বিদায় অনুষ্ঠান ছাড়া স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান এতটা জাঁকজমকপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক ছিল, যা বর্তমানকালে কল্পনাও করা যায় না। এতসব আচার-অনুষ্ঠানের বাইরে মাঝে মধ্যে রাজধানী শহর থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল আসতেন আমাদের বিদ্যালয়ে। আমার ষষ্ঠ শ্রেণীর অধ্যয়নকালে তৎকালীন সময়ের রেডিও ও টেলিভিশনের তিনজন নামকরা শিল্পী আমাদের বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন। তারা সম্ভবত শিল্পকলা একাডেমি অথবা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রেরিত হয়েছিলেন।

উল্লিখিত তিনজন সম্মানিত সঙ্গীত শিল্পীর সেদিনকার সব কথাবার্তা, গানবাজনা এবং তাদের পোশাক আশাক আমি আজো স্পষ্ট মনে করতে পারি। সেদিন গানের ফাঁকে ফাঁকে তারা যা বলেছিলেন, সেসব উপদেশের মর্মকথা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। সঙ্গীতের সুর-তাল-লয় এবং ছন্দের মাধ্যমে তারা যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন, তা আমি আজো স্মরণ করি এবং প্রতিপালন করি। আমি সেই দিনের পর অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি, যাদের চেহারা-সুরত-বেশভূষা অথবা কথাবার্তা আমার স্মরণে আসে না। অথচ মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে কয়েক ঘণ্টার জন্য দেখা তিনজন সঙ্গীত শিল্পীর দেহসৌষ্ঠব, কথাবার্তা এবং গানবাজনা কেন আমার ওপর এতটা প্রভাব ফেলল? তিনজন শিল্পীর মধ্যে একজন ছিলেন অত্যন্ত প্রবীণ যিনি পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এবং শ্মশ্রুমণ্ডিত ছিলেন। তিনি আমাদের মানবজীবনে গানের গুরুত্ব, সুন্দর কণ্ঠের সুবিধা এবং কণ্ঠকে সুন্দর করার কতগুলো কৌশল শিখিয়েছিলেন। পরিশেষে তিনি আমাদের একটি আরবি গান শুনিয়ে যারপরনাই চমকিত ও বিস্মিত করে দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন মধ্যবয়সী কেতাদুুরস্ত ভদ্রলোক। তিনি আমাদের লেখাপড়ার গুরুত্ব, বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসার লাভ এবং বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ এবং শিক্ষকমণ্ডলীর প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পরামর্শ সংবলিত কয়েকটি সমধুর গান শুনিয়েছিলেন, যার মধ্যে একটি গান ছিল এরূপ- ‘আমার জামাল-সামাল স্কুলেতে যায়- ও তোরা দেখরে শহরবাসী ও তোরা দেখরে নগরবাসী। আমার জামাল-সামাল স্কুলেতে যায়।’ একজন দরিদ্র অসহায় এবং বিধবা মায়ের যক্ষের ধন দুই শিশুপুত্র যখন স্কুলে যায়, তখন মায়ের মনের আকুতি কেমন হয় তা বোঝানোর জন্য শিল্পী সেদিন যে গান ধরেছিলেন তা উপস্থিত শত শত কোমলমতি শিশু-কিশোরের মর্মে মর্মে এমনভাবে ঢুকে গিয়েছিল যার কারণে সেদিনের একজন শিশু-কিশোর শ্রোতা মরে গেলেও বাবা-মায়ের অবাধ্য অথবা অকৃতজ্ঞ হতে পারবে না। তৃতীয় শিল্পী ছিলেন বয়সে তরুণ। তিনি কোনো নীতিকথা বলেননি। তবে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া সঙ্গীত পরিবেশন করে আমাদের অন্তর জয় করে নিয়েছিলেন।

মাধ্যমিক স্তর ছাড়া প্রাথমিক স্তরেও আমাদের বিদ্যালয়ের জীবন ছিল তাল-লয়-ছন্দ এবং গীত সঙ্গীতে ভরপুর। বিদ্যালয়ের বাইরের সমাজ-সংসারে আমরা কোনো অনৈতিক বিষয় শিশু-কিশোর বয়সে শুনিনি বা দেখিনি। আমাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু, শিক্ষকদের মান এবং সমাজের দায়িত্ববানদের সততা ও নিষ্ঠার কারণে সত্তর ও আশির দশকের শিশু-কিশোরদের বিরাট অংশ যে আদর্শ ও নীতিনৈতিকতা নিয়ে বড় হয়েছে, তা বর্তমান জমানার ঘুণে ধরা দুর্গন্ধযুক্ত সমাজের শিশু-কিশোররা কল্পনাও করতে পারে না।

আমাদের শৈশবে আমরা ধর্মীয় মাহফিলে যেতাম, যেখান থেকে কোনো উগ্রবাদ প্রচার করা হতো না কিংবা কোনো প্রতিপক্ষকে কাফের, মুরতাদ ইত্যাদি বলে গালাগাল দেয়া হতো না। আমরা যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, থিয়েটার, জারি-সারি ও বিচার গানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কিন্তু একবিন্দু অশ্লীলতা বা কুকথার দুর্গন্ধে আক্রান্ত হইনি। বরং সেসব অনুষ্ঠানের কথামালা-সুর-তাল এখনো কানে বাজে। আমাদের শৈশবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, পীর মহসেন উদ্দিন দুদুমিয়া, হজরত সামসুল হুদা পাঁচবাগী, হাফেজ্জী হুজুর প্রমুখ দেশবরেণ্য আলেম ওয়াজ শোনাতেন। আবদুর রহমান বয়াতি, হাজেরা বেগম, আবদুল হালিম প্রমুখ গুণীজনেরা গান শোনাতেন এবং নটরাজ অমলেন্দু বিশ্বাস যাত্রাপালার নায়কের ভূমিকায় মঞ্চ কাঁপানো অভিনয় দিয়ে দর্শকদের বিমোহিত করতেন।

আমাদের বর্তমান সমাজের ঘুষ-দুর্নীতি, ভোট চুরি, দখল-গুম-খুন-হত্যাকাণ্ড এবং সীমাহীন সন্ত্রাসের কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় লেখাপড়ার নামে কী চলছে তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বলতে পারবেন। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি বুঝতে পারবেন। আমার নির্বাচনী এলাকার নামকরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আমার সাথে দেখা করতে এলেন কয়েক দিন আগে, যার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল দুই হাজারের উপরে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- আপনার প্রতিষ্ঠানের রেজাল্ট কেমন হচ্ছে। তিনি হেসে বললেন, খুব ভালো, আমরা যেভাবে পড়াই- তার চেয়ে রেজাল্ট এত বেশি ভালো হয় যে, আমরা মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে যাই। আমি বললাম, পড়ান না কেন? তিনি বললেন, কিভাবে পড়াব? যাদের পড়াব তাদের বিরাট অংশ নেশাগ্রস্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পাণ্ডা। তারা স্কুল-কলেজের সামনে মদ-গাঁজা-ইয়াবার আসর বসায় এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোনো শিক্ষককে দেখলে ধর ধর বলে ধাওয়া দেয়। কয়েক দিন আগে আমি সন্ধ্যার পর এক গাঁজার আসর অতিক্রম করার সময় ধাওয়া খেয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছি। ঘটনাটি লজ্জায় কাউকে বলিনি- আজই প্রথম আপনাকে বললাম!

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য