Naya Diganta

শ্রাবণের প্রতীক্ষায়

‘জানি না আর কতকাল বৃষ্টির ছন্দে তুমি উদাস হবে?’ শ্রাবণ এলে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি। আবার নিজের মনে মনেই উত্তর খুঁজে বেড়াই। এখন মানুষ আগের মতো আর কারো পথ চেয়ে বেশি দিন অপেক্ষা করে না। কিন্তু আমি অপেক্ষা করে যাই। আমার এ প্রতীক্ষার অবসান হবে কি না জানি না! প্রতি বছরই শ্রাবণ আসে। এ নিয়ে তিন শ্রাবণ গত হলো। আর এভাবে বৃষ্টিরাও হেসে খেলে ছুটে আসে আমাকে নাড়া দিতে। এই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো খুবই দস্যি টাইপের! এই ফোঁটাগুলো শিহরণ জাগাতে পারে। স্মৃতির পাতা এলোমেলো করে দিয়ে ঘুম কেড়ে নিতে পারে। বৃষ্টিকে আকাশের কান্না বলে অনেকেই অভিহিত করে। কিন্তু আমি বৃষ্টির মানে খুঁজি অন্য কিছু দিয়ে। বৃষ্টির কাল আমার কাছে প্রতীক্ষার কাল। শ্রাবণে আমি প্রতীক্ষায় থাকি কারণ নিলা। সে আমাকে কথা দিয়েছিল। বলেছিল কোনো এক শ্রাবণে আমার প্রতীক্ষার অবসান হবে। সে ফিরে আসবে আমার কাছে।
নিলাকে প্রথম দেখেছিলাম কোনো এক শ্রাবণে। তখন আকাশের বাঁধ ভেঙে বৃষ্টিরা উচ্ছ্বাসে মেতেছিল। ঘন কালো মেঘের রূপে আঁধারেরা চার পাশ থেকে জড়িয়ে ধরেছিল। এমনই এক মুহূর্তে তাকে দেখেছিলাম রাস্তার পাশে এক গাছ তলায় জড়সড় হয়ে ভিজতে। হয়তো আচমকা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। সে কোথাও একা বেড়াতে যাচ্ছিল। সেই অবেলায় ওই পথে আমিও বাড়ি ফিরছিলাম। আমার হাতে ছাতা ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। মেয়েটি নিজেকে আর এই মাতাল বৃষ্টির ফোঁটাগুলো থেকে রক্ষা করতে পারছে না। আমি সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তার পর তার মাথার ওপর ছাতা ধরলাম। তাকে অভয় দিয়ে বললাম, ‘ছাতার নিচে আসতে পারেন। আমি কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর মতো বখাটে নই!’
আমার কথা শুনে সে হি হি করে হেসে উঠল। তার হাসিতে আমার মনেও বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমি তাকে বললাম, ‘এই অবেলায় এখানে কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে না! তা ছাড়া এই নির্জনে একা দাঁড়িয়ে থাকাও উচিত হবে না। চলুন হাঁটতে থাকি’। সে আমার কথায় আশ্বস্ত হলো। আমার সাথে পায়ে পায়ে এগোল। দেশের যে পরিস্থিতি! একজন একা মেয়ে এই প্রবল বৃষ্টিতে আমাকে বিশ্বাস করে আমার সাথে হাঁটতে থাকল। এই বিষয় আমার কাছে খুব ভালো লাগল। হাঁটতে হাঁটতে তার সাথে অনেক কথা হলো। বৃষ্টির ফোঁটা তার গাল বেয়ে বেয়ে ঝরনার মতো নিচে নামছে। সে ফর্সা না হলেও অপূর্ব মায়াবী। সে মায়া আমাকে হাতছানি দিয়ে ক্রামাগত ডাকছে। আমি কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জানতে চাইলাম ‘অপরিচিত হয়েও আমাকে এত সহজে বিশ্বাস করলেন কেন?’ সে বলেছিল, ‘বিশ্বাসীদের চোখ দেখেই চেনা যায়’! উত্তর শুনে আমি খুব পুলকিত হয়েছিলাম। খুব সাহস নিয়ে তাকে আমার নাম ঠিকানা সব জানিয়ে বলেছিলাম, ‘তা হলে এমন বিশ্বাসীকে বন্ধু বানিয়ে নিন না সারা জীবনের জন্য!’ আমার কথা শুনে সে খুব লজ্জা পেয়েছিল।
একসময় তার গন্তব্যে পৌঁছাই। আমার বারবার মনে হচ্ছিল ইস, এই পথ যদি শেষ না হতো! এ দিকে বৃষ্টিও থেমে গেছে। বিদায় বেলায় তাকে উদ্দেশ করে বললাম, ‘কিছু একটা বলে যাও কিংবা কোনো আশা দিয়ে যাও!’ এবার তাকে আপনি থেকে তুমি করেই বললাম। সে একটা মুচকি হাসি উপহার দিয়ে আমাকে বলল, ‘প্রতীক্ষায় থেকো, কোন এক শ্রাবণে আমি আবার আসব তোমার কাছে!’ আমি সে থেকে প্রতীক্ষায় থাকি...। শ্রাবণের প্রতীক্ষায়।
প্রিয়জন-১৬২৪
পূর্ব শিলুয়া, ফেনী