Naya Diganta

অভিনেতাই হতে চাননি ফেলুদা খ্যাত সব্যসাচী চক্রবর্তী

সব্যসাচী চক্রবর্তী

সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র এই ফেলুদা। আর ফেলুদার নাম শুনলে সৌমিত্র চট্রোপাধ্যায়ের পর যার ছবি সবার আগে ভেসে ওঠেন তিনি হলেন অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী। ফাখরুল আরেফিন খান পরিচালিত 'গন্ডি' ছায়াছবির কাজ করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন মি. চক্রবর্তী। শুটিংয়ের ফাঁকেই তাঁর সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ হয়।

যেভাবে শুরু

গল্প করার সময় জানতে পারলাম যে কখনোই অভিনেতা হতে চাননি সব্যসাচী চক্রবর্তী।

"আমার প্রথম স্বপ্ন ছিল খেলাধুলো করবো। আমার ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক ছিলো। তারপরে ইচ্ছে হলো পুলিশ হবো। তারপরে ইচ্ছে হলো ইঞ্জিনিয়ার হবো। তখন আরেকটু বয়স বেড়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যে মার্কস দরকার সেটা আমার হলো। প্রি-মেডিকেল টেস্টের জন্যে অ্যাপ্লাই করলাম কিন্তু সেটাও ফেল করলাম। এরপর ইচ্ছা হলো ফাইটার পাইলট হবো। কারণ আমার প্লেন ভীষণ ভালো লাগতো...যুদ্ধজাহাজ চালাবো এমন একটা ইচ্ছাও ছিলো...."।

"অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক আমার কখনো ছিল না। এখনও নেই। আমি একসময় একজন মিস্ত্রি হয়ে গিয়েছিলাম। ইলেকট্রো মেডিকেল ডায়াগনস্টিকসে কাজ করতাম এবং ডায়াগনস্টিক এক্সরে মেশিন নিয়ে কাজ করতাম। বাবারই একটা ছোট ফ্যাক্টরি ছিল। সেখানে কাজ করতে করতে অনেক কিছু শিখে গেলাম। মিস্ত্রিই হয়ে গেলাম। আমি তখন দিল্লিতে থাকতাম। বাবা চলে যাওয়ার পর মাকে নিয়ে দিল্লি থেকে কলকাতা চলে এলাম ১৯৮৪ সনে। তারপরে নাটক করতে শুরু করলাম, নাটকের ব্যাকস্টেইজে কাজ করবো। আমার পরিবারটাই কিন্তু নাটকের। সবাই নাটক করেন। কিন্তু আমার অভিনয় করার শখ তখনও ছিল না। বলেছিলাম সেট করবো, লাইট করবো..."।

অভিনয় করার শখ না থাকলেও তাঁর পিসেমশাই যোশেন্দর সিজার (নাটকের পরিচালনায় কাজ করতেন) একরকম জোর করেই অভিনয়ের সাথে সম্পৃক্ত করেন সব্যসাচীকে।

"তিনি বললেন, তুমি চেষ্টা করলে পারবে এবং আলটিমেটলি আমাকে ঢুকিয়ে দিলেন সিরিয়ালে"।

'তেরো পার্বণ' সিরিয়াল দিয়ে শুরু হয় সব্যসাচী চক্রবর্তীর অভিনয়ের যাত্রা।

মি. চক্রবর্তীর, ভাষায় "আমি মনে-প্রাণে চেয়েছিলাম লোকে আমাকে বর্জন করে দিক। ভালো করতে পারিনি বলে বা ভালো হচ্ছে না বলে বা ভালো দেখতে নয় বলে। কিন্তু কোনটাই হলো না। লোকের ভালো লেগে গেল এবং আমি আটকে গেলাম"।

'আসামী ভাগ রাহাহে'

আরো অনেক বিখ্যাত মানুষের মতোই স্কুলে যেতে ভালো লাগতো না তাঁর।

"কলকাতায় আমাদের স্কুলে হিন্দি টিচার ছিলেন মি. পান্ডে। তাঁর ক্লাসের ঠিক গায়েই একটা পাঁচিল ছিলো যেটা টপকে আমরা পালাতে পারতাম। ওটা একটু ভাঙা ছিল। তখন আমরা হাইস্কুলে পড়ি। তখন জেমস বন্ডের কি যেন একটা ছবি এসেছে। আমরা ঠিক করলাম ছবিটা দেখতে যাবো। শো বারোটায়। ..দু-তিনজন মিলে ঠিক করলাম হিন্দি ক্লাসে যাবো না, হিন্দি টিচার যখন বেরুবেন বা ওয়াশরুমে যাবেন ওই সময়টায় পাঁচিল টপকে পালাবো"।

"পরে মনে হলো ক্লাসে ঢুকে পালানো যাবে না। উনি ক্লাসে ঢোকার আগেই আমাদের পালাতে হবে। হিন্দি টিচার ক্লাসে ঢুকার আগে প্রথমেই পাঁচিল টপকে উঠে গেল আমার এক বন্ধু এবং পাঁচিলটা ভেঙে পড়ে গেল। বিকট একটা আওয়াজ হলো। টিচার তখনই আসছিলেন। তিনি দেখলেন ইট পড়ছে আর নিচে একজন পড়ে আছে। তিনি চিৎকার করলেন - এই গার্ড জালদি আও আসামী ভাগ রাহাহে..."

"আলটিমেটলি আমরা তিনজনই ধরা পড়লাম এবং তিনজনই প্রিন্সিপালের অফিসে কান ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম"।

স্কুলের কয়েকজন বন্ধুর সাথে এখনও যোগাযোগ আছে বলে জানালেন মি. চক্রবর্তী।

"আমার বউকে আমার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। তাদের দেখে বললো যে এরা সব তোমার ক্লাসমেট? আমি বললাম হ্যাঁ। বললো - এরা তোমার থেকে এত বেশি বুড়ো কেন? আমি বললাম - তাহলে দ্যাটস অ্য কমপ্লিমেন্ট যে আমি এখনও বুড়ো হইনি"।

এখনও নিয়মিত শরীরচর্চা করেন তিনি।

"অভিনয় করতে হয় বলে অনেক কিছু করতে পারি না। খুব একটা রাত জাগতে পারি না। খুব একটা বেশি অনিয়ম করতে পারি না। আজেবাজে জিনিস খেতে পারি না। একটু সময় করে নিজের দেখাশুনা করতে হয়। তবে হ্যাঁ, মধ্যপ্রদেশটা একটু বেড়ে গেছে, এটা কমাতে হবে", হাসতে হাসতে বললেন মি. চক্রবর্তী।

অভিনয়ে ফিটনেসটা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

কৈশোরে প্রেমে পড়েছিলেন? এমন প্রশ্নে হাসতে হাসতে বললেন তিনি 'বহুবার প্রেমে পড়েছেন'।

"অন্তত তিনবারতো পড়েছিই। আমার তিনজনের কথাই মনে পড়ে। মনে পড়লে হাসিই পায়। বোকামি করেছিলাম। কোন দরকার ছিল না সেইসব করার। কোন যুক্তি মানে না মন। মেয়েটিকে ভালো লাগে বলে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, কলেজ ছুটির পর পেছন পেছন আসা। কিন্তু খুব বোকা বোকা। বয়স হলে সেগুলো নিয়ে হাসি পায়।...ছেলেরা প্রেমে পড়লে বোকা হয়ে যায়, মেয়েরা হয় কিনা জানি না। তবে আমার বিশ্বাস মেয়েরাও হয়"।

পরিবার :

অভিনয়ে নিজের জড়ানোর গল্প বলতে বলতে সব্যসাচী জানালেন তিনি এমন একজনকে বিয়ে করেছিলেন যিনি অভিনয়ের কিছুই জানতেন না। অথচ তাঁর স্ত্রী মিঠু চক্রবর্তীও অভিনেত্রী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

"তাঁর চৌদ্দপুরুষে কেউ অভিনয় করেনি। কিন্তু বিয়ের পর যখন সে বাড়িতে এলো দেখলো আমি অভিনয় করি, তার শাশুড়ি অভিনয় করে, সবাই অভিনয় করে। সেও আলটিমেটলি অভিনয়ে ঢুকে গেল। এখন বেশ ভালো অভিনয় করছে"।

দুই ছেলে গৌরব চক্রবর্তী, অর্জুন চক্রবর্তীও অভিনেতা হিসেবে বেশ পরিচিত। তবে তাদের অভিনয়ের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন অভিনেতা প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়।

'ফেলুদা' হলেন যেভাবে

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ যেমন 'ফেলুদা' বলতে সব্যসাচীকে বুঝেন, কলকাতার অনেক মানুষও তাঁকে ফেলুদা বলেই ডাকেন।

"অনেকেই আছেন আমার নাম জানেন না। হেঁটে গেলে বলে ওইযে ফেলুদা যাচ্ছেন।"- বলছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী।

নাটকে অভিনয় করতে করতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছা জেগেছিল সব্যসাচী চক্রবর্তীর।

"সৌমিত্র চ্যাটার্জিকে দেখে আমিতো মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তার পরবর্তীকালে টেলিভিশনের অন্য কাজ করতে করতে সত্যজিৎ রায়ের কাছে যাওয়া হয়। জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি কি আর ফেলুদা করবেন না? উনি বললেন সন্তোষ দত্ত আর নেই, আর সন্তোষ দত্ত (জটায়ু) ছাড়া ফেলুদা হয় না। কাজেই আমি ফেলুদা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। শেষ পর্যন্ত বললেন যে, আমার ছেলে সন্দীপ রায়ের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারো। সে যদি করে, আমি আর করবো না"।

"তখন থেকেই সন্দীপ রায়ের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করতাম। কবে করবেন, কবে করবেন। যদি করেন, আমাকে ভাববেন"।

অপেক্ষার মধ্যেই একদিন সন্দীপ রায়ের টেলিফোনে 'বাক্স রহস্য' টেলিফিল্মে ফেলুদা হিসেবে অভিনয়ের জন্য ডাক পেলেন মি. চক্রবর্তী। টেলিভিশনে 'বাক্স রহস্য' খুব জনপ্রিয় হলো"।

সব্যসাচী বনাম ফেলুদা :

নিজের কোন বৈশিষ্ট ফেলুদার সাথে মেলে এমন প্রশ্নের জবাবে মি. চক্রবর্তী বলেন, "অনেক বৈশিষ্ট্য মিলে। ফেলুদা ছেলেবেলায় ক্রিকেট খেলতো, আমিও খেলতাম। ফেলুদা যেমন খয়ের ছাড়া মিঠে পান খেতে ভালোবাসে, আমিও তাই। ফেলুদার চায়ের নেশা আছে, আমারও তাই। ফেলুদা অল্পসল্প রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়, আমিও গাই, যদিও বেসুরো"।

"ফেলুদার হাইট ছয় ফুট দুই ইঞ্চি, আমার একটু কম ছয় ফুট দেড়। ফেলুদা হারমোনিয়াম বাজাতে জানে, আমি জানি না। ফেলুদার অগাধ জ্ঞান, আমার নেই। এগুলো অমিল"।

সেরা ফেলুদা

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পর দীর্ঘদিন ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। হিন্দিতেও ফেলুদার ভূমিকায় শশী কাপুরকে দেখা গেছে। এখন নতুন ফেলুদাকেও পাওয়া যাচ্ছে। আবির চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করছেন। ওয়েব ফেলুদা সিরিজে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছেন। এদের মধ্যে সব্যসাচীর কাছে 'বেস্ট ফেলুদা' হচ্ছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

"সৌমিত্র চট্ট্রোপাধ্যায়কে দেখে আমার মনে হয়েছিল এই একটা বাঙালি চরিত্র যে একটা ঋজু চরিত্র। যার পায়ের তলায় মাটি আছে। যে কারোর দিকে তাকিয়ে কথা বললে সে কথাটা সে গুরুত্ব দেয়। তার এরকমই একটা পার্সোনালিটি। সেই চরিত্রটা তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র চ্যাটার্জি সেটা অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, সত্যজিৎ রায়েরই পরিচালনায়। এখনও আমার মনে হয় উনিই বেস্ট"।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা :

'গন্ডি' ছবির কাজে বাংলাদেশে কয়েকবার এসেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। এদেশে কাজ করতে বেশ ভালো লাগছে বলেও জানান 'ফেলুদা'। এদেশের মানুষের ব্যবহার অতিথিপরায়ণতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে।

গত ৮ই সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর জন্মদিন। "এবার আমি এত কেক কেটেছি। ৪০০ গ্রাম কেক খেয়ে ফেলেছি" হাসতে হাসতে বলছিলেন সব্যসাচী। অভিনয় থেকে অবসর নিয়ে ভবিষ্যতে জঙ্গলে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করছেন।

"আমি এতদিন ধরে সিনেমা করছি, টেলিভিশনে কাজ করছি। আমার আর নতুন করে কিছু করতে ইচ্ছে করছে না। দুই-একজন পরিচালক আছেন যাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয় যে এরা সিনসিয়ারলি কাজ করার চেষ্টা করছেন, কাজ করি। কিন্তু আর নতুন কিছু দেওয়ার নেই আমার"।

"আমি কিছু না করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবো"। সূত্র : বিবিসি।