Naya Diganta

একটি ভিডিও ক্লিপ ও প্রশ্নবিদ্ধ জনপ্রশাসন

কারো অন্যায়ের পাল্লা যখন ভারী হয়ে যায়, তখন ছোটখাটো ঘটনাই অনেক সময় অধঃপতন ডেকে আনে। ফেনীর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এর জলন্ত দৃষ্টান্ত। এবারে জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ায় সারা দেশে জনপ্রশাসন প্রশ্নের মুখোমুখি। এখন প্রমাণ হবে, তার অন্যায়ের মাত্রা কতটা ছিল। মান্যবর! কবীর হয়তো বুঝতে পারেননি, সরকারি অফিস রুমের পাশে বালাখানা করলে তার জীবনে কালিমা বয়ে আনবে! নয়তো তিনি নিজেকে ভেবেছিলেন, ব্রিটিশ আমলের কোনো লর্ড বাহাদুর। সুদূর বিলেত থেকে বাংলা ভূখণ্ডে প্রজাদের শাসন করতে এসেছেন। আর তাই অফিসেই বসিয়েছিলেন বিলাসবহুল বিশ্রামাগার। সেখানে অফিসের সুন্দরী ললনা সহকর্মীকে নিয়ে মন চাইলেই একটু বিশ্রাম নিতেন। শেষপর্যন্ত বিধিবাম! সব চিচিং ফাঁক!

মাঠপ্রশাসনে একজন জেলা প্রশাসক জেলার সর্বোচ্চ সরকারি কর্তা তথা প্রশাসনের প্রধান। তিনি স্টেশনে থাকাকালীন ২৪ ঘণ্টা জনগণের সেবা দিতে বাধ্য। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ ডিসি কি তা মনে করেন? এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান আমলাতান্ত্রিক রাজনীতিতে অফিসাররাই ক্ষেত্রবিশেষে পলিটিক্যাল লিডার। কোনো কোনো জেলায় মন্ত্রী-এমপিদের প্রটোকল দিতে ডিসি-এসপি, ইউএনও-ওসিরা রীতিমতো নিজেরাই নেতার ভূমিকা পালন করেন। আবার কোথাও কোথাও তাদের সরকারদলীয় নেতাদেরও প্রটোকল দিতে হয় ভিআইপি মর্যাদায়। প্রয়োজন না থাকলেও পলিটিক্যাল প্রোগ্রামে অতিথির আসনে বসেন। তবে এটাও ব্যতিক্রম নয় যে, কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপিও ইউএনও-ওসিদের বিশেষ খাতির যতেœ আর আদিখ্যেতায় (!) পঞ্চমুখ। যেন রাষ্ট্র আজ আমলাদের কাছে বন্দী। সবই এখনকার রাজনীতির অসহায় চালচিত্র।

রাষ্ট্র ও রাজনীতির যখন এই অবস্থা, ডিসিরা যে নির্ভয়ে যা তা করবেন না- তাই বা কী করে ভাবা যায়! জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীরের যে যৌন কেলেঙ্কারির ভিডিওটি প্রকাশিত হয়েছে; তা নিয়ে জনমানসে কোনো ধরনের সংসয় দেখা দেয়নি। তবে এটা তো অস্বীকার করা যায় না যে, তিনি প্রশাসনকে যেভাবে জনতার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, সমাজ নিয়ন্ত্রকদের স্বচ্ছতা স্বয়ং রাষ্ট্রকে ধাঁধায় ফেলেছেন- সে দায়ভার এড়াতে পারেন না। তা ছাড়া স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে ভিডিও ক্লিপটির স্থান নিজের অফিস রুম ও মেয়েটি তারই অফিসের সহকর্মী বলে স্বীকার করায়, অন্তরঙ্গতার ঘটনা সরাসরি অস্বীকার করার যুক্তিসঙ্গত কারণও নেই। যদিও ভিডিওটি বানানো ও হ্যাকার গ্রুপের কারসাজি বলে দাবি করেছেন তিনি।

গত ১৫ আগস্ট বিকেলে ভিডিওটি ‘খন্দকার সোহেল আহমেদ’ নামে আইডি থেকে ফেসবুকে আপলোড হয়। ২২ আগস্ট বিকেল থেকে ভিডিওটি ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছালে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, ডিসি আহমেদ কবীরের অফিসের পাশের রুমে একটি খাটসহ পরিপাটি করে সাজানো। রুমটিতে বোরকা পরিহিতা একজন নারী সহকর্মীকে নিয়ে ডিসি রুমটিতে প্রবেশ করেন। তারপর দুইজনকে অন্তরঙ্গভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়।

গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ওই নারীটি তার মাধ্যমেই সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া একই অফিসের এমএলএসএস। দেশের প্রচলিত আইন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মতিতে যেকোনো সম্পর্কে জড়ানোতে বাধা দেয় না। (যদিও ইসলাম ধর্ম মতে, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক হারাম ও কবিরা গোনাহ)। তবে সম্পর্ক হারাম না হালাল, অপরাধ বড় না ছোট- সেটা কথা নয়; কথা হলো জনসম্মুখে তা জানাজানি হলে নৈতিক স্খলনের বহিঃপ্রকাশ ও আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টের কারণ হিসেবেই দেখা হয়। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে কারো সম্মানহানিকর ঘটনা প্রকাশ করলে দেশের আইনে তা শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এখন দেখার বিষয়, পানি কোন দিকে গড়ায়; ডিসির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের শাস্তি নাকি ডিজিটাল অপরাধের আওতায় নিরীহ কারো দণ্ড।

দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলা থেকে শুরু করে মাঠপ্রশাসনের কিছু অফিসারের বিভিন্ন সময় স্ক্যান্ডালের খবর গণমাধ্যমে আসে। যার বেশির ভাগই সময় গড়ানোর সাথে সাথে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। জানি না, ডিসি কবীরের ঘটনাটি কতদিন আলোচনায় থাকবে। তবে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। আমাদের শঙ্কা হয়, যদি কোনোভাবে তিনি পার পেয়ে যান; তবে কিছুদিন পর এ খবর না বেরোয় যে, ‘তার বিরুদ্ধে ছিল দুরভিসন্ধিমূলক গভীর ষড়যন্ত্র।’

লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]