Naya Diganta

আসামে আরেকটি আরাকানের পদধ্বনি!

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা গুঞ্জন চলছিল। শেষপর্যন্ত রাজ্য সরকার চূড়ান্ত যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে ১৯ লাখ ছয় হাজার ৬৫৭ জনের নাম বাদ পড়েছে। ফলে ‘রাষ্ট্রহীন’ এ বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন দিশাহারা। এতে বাংলাদেশেরও উদ্বিগ্ন হওয়ার সঙ্গত কারণ রয়েছে। বাদ পড়াদের বেশির ভাগই বাংলাভাষী। একই সাথে বিভিন্ন সময়ে তাদের বাংলাদেশী বলে ভারতের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, যা ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। তথাকথিত বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত করে। কারণে বাংলাদেশের ঘাড়ে যে শরণার্থী সমস্যা চেপে বসেছে, সেই একই ধরনের আরেক সমস্যা দেশটির ওপর এসে পড়বে কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

এনআরসি প্রকাশের মধ্য দিয়ে আসামে আসলে আরেকটি রোহিঙ্গা সঙ্কটের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কারণ মিয়ানমারেও একইভাবে ১৯৮২ সালের সংবিধানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার সময় বলা হয়েছিল, তাদের নাগরিকত্বের কোনো ‘প্রমাণ’ নেই। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর রোহিঙ্গারাও মূলত কৃষিকাজ ও মাছধরা পেশায় নিয়োজিত ছিল। বংশপরম্পরায় বসবাসের প্রমাণ রাখারও দরকার বোধ করেনি কখনো। আসামের চিত্রটাও একইরকম। মিয়ানমারে যেভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধধর্মীয় গোষ্ঠী অত্যাচার চালিয়ে তাদের বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করেছে, ঠিক তেমনিভাবে আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার শুরু হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতে হিন্দুত্ববাদ ও চরম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধারা নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে শুরু করেন, আসামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল সেই ধারাবাহিকতার একটি অংশ মাত্র। বিজেপির এই হিন্দু জাতীয়তাবাদ অ্যাজেন্ডার বাস্তবায়ন আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করেছি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই বিজেপি অভিযোগ করে আসছেÑ আসামে মুসলিম ‘অনুপ্রবেশকারী’ বাড়ছে। তারা বলে আসছে, বিজেপি ক্ষমতায় গেলে এনআরসি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাবে। আবার একই সাথে কোনো ধরনের রাখঢাক না করে বলেছে, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দেবে।

ভারত সরকার বলছে, তালিকার বাইরে যারা আছেন, তারা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবেন। সেখানেও প্রতিকার না পেলে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হতে পারবেন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মুসলিমবিরোধী অবস্থান বেশ স্পষ্ট, সেখানে আসামে অনগ্রসর মুসলিম নাগরিকরা এ দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় কতখানি সহযোগিতা পাবেন? ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, নাগরিক তালিকায় যাদের নাম ওঠেনি, তাদের একজনকেও আটক করা হবে না। শেষ আইনি প্রক্রিয়া পর্যন্ত তারা সব ধরনের রাষ্ট্রীয় অধিকার ভোগ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত যারা নাগরিকত্ব হারাবেন, তাদের কী হবে?

ধরা যাক, এনআরসি থেকে বাদ পড়া ছয় লক্ষাধিক মুসলিমের মধ্যে বড়জোর এক লাখই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে টিকে গেলেন। বাকিদের কী হবে? এর মধ্যে কয়েক লাখকেও যদি বাংলাদেশের দিকে ভারত ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে রোহিঙ্গাদের মতো, তাহলে আমরা বড় সঙ্কটে পড়ব। এ বাস্তবতায় ভারতের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে আমাদের নিরুদ্বেগ থাকার কোনো অবকাশ নেই। কালক্ষেপণ না করে এ ইস্যুতে বাংলাদেশের তরফে এখনই সক্রিয় ও কার্যকর কূটনৈতিক চেষ্টা চালানো উচিত।

অন্য দিকে, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উচিত তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে হত্যা কিংবা নাগরিক তালিকা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। অন্তত বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বে ফাটল ধরতে পারে, এমন কিছু নিশ্চয়ই বাংলাদেশ আশা করে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়