Naya Diganta

শুধু নামেই দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের

শুধু নামেই দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়েছে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ। পদমর্যাদা উন্নতির পর সাড়ে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর কোনো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে নামেই রয়ে গেছেন তারা রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রের্ণীর কর্মকর্তা হিসেবে।

সরকারের সব বিভাগের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ১০ম গ্রেডে বেতন পেলেও সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা বেতন পান ১১তম গ্রেডে। এ দিকে সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠানো হলেও চলতি মাসের ৮ তারিখ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের বর্তমান গ্রেড যথাযথ এবং গ্রেড উন্নয়নের সুযোগ নেই। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আবারো প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বৃদ্ধিরও প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তাও প্রত্যাখ্যান করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে লাখ লাখ শিক্ষকদের মাঝে। গ্রেড উন্নয়ন, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে গ্রেড বৈষম্য কমানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন প্রাথমিকের শিক্ষকেরা। সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গ্রেড পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় গত শুক্রবার রাজধানীতে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নেতৃবৃন্দ দাবি আদায়ে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। দাবি মানা না হলে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটেরও হুমকি দিয়েছেন। শিক্ষকদের এ দাবি ঘিরে প্রাথমিক শিক্ষা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অনেক শিক্ষক।

বর্তমানে প্রধান শিক্ষক বেতন পান ১১তম গ্রেডে আর সহকারী প্রধান শিক্ষক বেতন পান ১৪তম গ্রেডে। সহকারী শিক্ষকদের দাবি- প্রধান শিক্ষকের পরই তাদের পদ। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের সাথে তাদের বেতন গ্রেডের ব্যবধান তিন ধাপের। এটি একটি চরম বৈষম্য বলে মনে করেন তারা। তাদের দাবি- প্রধান শিক্ষকের গ্রেড ১০ম ও সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড ১১তম করতে হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড ১০ম ও সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড ১২তম করার প্রস্তাব করা হয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর। এ নিয়েও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ দিকে মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে শিক্ষকদের মাঝে। অনেকেই এতে আশান্বিত হলেও কেউ কেউ বলেছেন এতে সহকারী থেকে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হওয়ার পথ আরো দীর্ঘ হবে। তবে এর পক্ষের শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, খুব সীমিত সংখ্যক সহকারী শিক্ষক পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান। সে কারণে হাজার হাজার সহকারী শিক্ষক সারা জীবন এক পদে চাকরি করেই অবসরে যান। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হলে অন্তত তাদের অনেকে একটি হলেও পদোন্নতি পাবেন জীবনে। সহকারী প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড ১১তম এবং সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড ১২তম করার প্রস্তাব করা হয় মন্ত্রণালয় থেকে। এ নিয়ে সহকারী অনেক শিক্ষকের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

এ দিকে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হলেও তাদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি তো দূরের কথা প্রায় ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি। ২০০৯ সালে একটি মামলার কারণে বন্ধ হয়ে যায় সহকারী থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি। কিন্তু ২০১৪ সালে মামলার সুরাহা হলেও চালু হয়নি পদোন্নতি। কারণ ওই বছরই প্রধান শিক্ষকের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণী করায় প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পদোন্নতির দায়িত্ব চলে যায় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অধীনে। কিন্তু পিএসসির এ বিষয়ে নীতিমালা না থাকা এবং বিষয়টি ত্বরিত সুরাহার উদ্যোগ না নেয়ায় হতাশায় নিমজ্জিত হয় সারা দেশের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক। তবে বিষয়টি শিগগিরই সুরাহার অপেক্ষায় রয়েছে বলে গতকাল জানিয়েছেন একজন শিক্ষক নেতা।

প্রায় এক দশক পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ থাকায় এক পর্যায়ে ২০ হাজারেরও বেশি স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা ছাড়াই সহকারী শিক্ষকেরা বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রধান শিক্ষকের গুরু দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গত বছরের ২৩ মে ভারপ্রাপ্ত এসব প্রধান শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয়া হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল হক গত রাতে নয়া দিগন্তকে বলেন, এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা মাসে দেড় হাজার টাকা এ বাবদ অতিরিক্ত পাচ্ছেন। তবে প্রতিদিনই নতুন করে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ায় বর্তমানে আবার প্রায় সাত হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে ৬৫ ভাগ শূন্য পদ পূরণ করার নিয়ম সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে। বাকি ৩৫ ভাগ পদ পূরণ করা হয় সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে। পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের দীঘদিনের জটিলতার কারণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর ২৩ মে থেকে সহকারী শিক্ষক, যারা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, তাদের চলতি দায়িত্ব দিয়ে চিঠি দেয়া শুরু করে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা এক সময় তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন। সামাজিকভাবে একজন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক যথেষ্ট সম্মানের অধিকারী হলেও চাকরির প্রটোকলে তিনি ছিলেন একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। যেকোনো সরকারি অফিসের তৃতীয় শ্রেণীর একজন কর্মচারীর চেয়ে অনেক বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ দাফতরিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হয় একজন প্রধান শিক্ষককে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষকের পদটি তৃতীয় শ্রেণীর হওয়ায় দীর্ঘদিন এ নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত ছিলেন হাজার হাজার শিক্ষক। দীর্ঘ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা শুধু নামেই দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদার অধিকারী হয়ে রয়েছেন।