Naya Diganta

অপারেশন কিলো ফ্লাইট

বাংলার আকাশ মুক্ত রাখার কঠিন শপথে বলীয়ান হয়ে যে বিমানবাহিনী ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ভারতের পূর্বাঞ্চল নাগাল্যান্ড প্রদেশের ডিমাপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, তার পটভূমি এবং ইতিহাস যেকোনো কল্পলোকের রূপকথার দুঃসাহসী চ্যালেঞ্জিং অভিযানকেও হার মানাবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্ম কোনো রূপকথা নয় বরং বাস্তব বীরত্বগাথার এক অমর কাব্য। সেই কাব্য রচিত হয়েছিল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর একদল মুক্তিপাগল অকুতোভয় বৈমানিক, বিমানসেনা এবং সংগঠকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনের ইতিকথা বিশ্বের যেকোনো সামরিক ইতিহাসের পাতায় একটি বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়, অবিচার, নিষ্পেষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জেগে ওঠা একটি জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত, তখন সময়ের দাবি মেটাতে একটি স্বাধীন পতাকার জন্য বিদেশ ভূমে জন্মলাভ করে আমাদের জাতির গর্ব এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ, সশস্ত্রবাহিনীর এই প্রতিষ্ঠানটি। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে জাতিকে স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয়ে তদানীন্তন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অনেক বাঙালি সদস্য সুনিশ্চিত অভিজাত জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উপেক্ষা করে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং মরণপণ যুদ্ধ করেন।

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান দেশ মাতৃকার টানে ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট মুক্তিকামী বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য নিজ জীবন উৎসর্গ করে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ ছাড়া একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দু’চোখে ধারণ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বিমানবাহিনীর বাঙালি অফিসার উইং কমান্ডার এম কে বাশার (পরবর্তীকালে এয়ার ভাইস মার্শাল এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান খাদেমুল বাশার), স্কোয়াড্রন লিডার সদরুদ্দিন (পরে এয়ার ভাইস মার্শাল এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান), স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ (পরবর্তীকালে এয়ার ভাইস মার্শাল এবং বিমানবাহিনী প্রধান), ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম, ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম, ফ্লাইং অফিসার ইকবাল রশীদসহ অনেক কর্মকর্তা ও বিমানসেনা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে গমন করেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত প্রায় প্রতিটি বাঙালি সদস্যই তখন নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যার যার অবস্থান থেকে জীবনবাজি রেখে দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন।

পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি সদস্য ছাড়াও পিআইএ এবং প্ল্যান্ট প্রটেকশন ডিপার্টমেন্টের ছয়জন বেসামরিক বাঙালি বৈমানিকও (ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার, আকরাম আহমেদ, শাহাবউদ্দিন, আব্দুল খালেক, আবদুল মুকিত, সরফুদ্দিন) মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য সেই সময় ভারতে গমন করেন। যুদ্ধ চলাকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিমানবাহিনী প্রধান) বিমানবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব গভীরভাবে অনুভব করেছেন। কেননা, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে যুদ্ধের ফলাফলের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিমান আক্রমণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর একটা পন্থা।

এ ব্যাপারে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তথা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী, সৎ, নির্ভীক দেশপ্রেমিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তাজউদ্দীন অত্যন্ত মনোযোগসহকারে খন্দকারের প্রস্তাব শোনেন এবং ভারতের সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক চাপ এবং আইনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে অন্য দেশের মাটিতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও কঠিন হবে জেনেও তিনি প্রজ্ঞা ও অসাধারণ বিচক্ষণতা দিয়ে এ বাহিনী গঠনের গুরুত্ব তৎক্ষণাৎ অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তাজউদ্দীন আহমদ বেসামরিক ব্যক্তি হয়েও পেশাদার ও বিচক্ষণ সমরনায়কের মতো সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এ কে খন্দকারের প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।

এ কে খন্দকার ভারতে অবস্থানরত সব দক্ষ ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশী বৈমানিক ও বিমানসেনাদের পরিপূর্ণভাবে কাজে নিয়োজিত করে মুক্তিযুদ্ধের গতিবিধি দ্রুত পরিবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা লাভের প্রত্যাশায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন। এ প্রসঙ্গে জনাব খন্দকার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ (পৃষ্ঠা ৬৪,৬৫)-এ উল্লেখ করেছেন : ‘তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত মনোযোগসহকারে তখন আমার এই কথাগুলো শুনেছিলেন। এর কিছু দিন পর তিনি একদিন আমাকে তার দফতরে ডেকে পাঠান। খবর পেয়ে আমি তখনই তার দফতরে গেলাম। গিয়ে দেখি, তার দফতরে কয়েকজন বসে আছেন। কে কে উপস্থিত ছিলেন, তা এখন আমার মনে পড়ছে না, তাদের মধ্যে খুব সম্ভবত ভারতীয় প্রতিরক্ষা সচিব কে বি লালও ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে বললেন, ‘উনারা এসেছেন, উনাদের সঙ্গে আপনি আলাপ করেন।’

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ কালে এ কে খন্দকার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনের প্রসঙ্গ তোলেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বলা কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করে তাদের অবগত করেন, এটা চলমান মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর শক্তি হিসেবে কাজে লাগবে, যা পুরো যুদ্ধের গতিপথকে দ্রুত ঘুরিয়ে দিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। প্রতিউত্তরে কে বি লাল জানান, এই মুহূর্তে কোনো বিমান ভারতের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়; কেননা তাদের নিজেদের যুদ্ধবিমানের স্বল্পতা রয়েছে। তবে কে বি লাল প্রস্তাব করেন, বাংলাদেশের পাইলটরা ভারতীয় ফ্লাইং স্কোয়াড্রনে উড্ডয়ন করতে পারেন। লালের প্রস্তাবের বিপক্ষে এ কে খন্দকার যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, পাইলটদের বিমান উড্ডয়নের কিছু নিয়ম আছে, কতগুলো আইনগত ব্যাপার এবং কতগুলো কোড আছে। বাংলাদেশের পাইলটরা যে ভারতীয় বিমানে উড্ডয়ন করবেন, তখন তারা কোন দেশের কোড ব্যবহার করবেন- ভারত না বাংলাদেশের? কে বি লাল বলেন, বাংলাদেশী পাইলটদের ‘ভারতীয় কোড ও নিয়মকানুন অনুসরণ’ করতে হবে।

ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার পুরো সারমর্ম এ কে খন্দকার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে একান্তে অবগত করেন এবং বলেন, বাস্তবিক পক্ষে এই প্রস্তাব মেনে নেয়া যায় না। আমরা একটি স্বাধীন দেশ। তাই আমরা অন্য দেশের কোড, নিয়মকানুন অনুসরণ করতে পারি না। অতঃপর এ কে খন্দকার পুনরায় কে বি লালকে অনুরোধ করে বলেন, যদি সম্ভব হয় তবে বাংলাদেশের পাইলটদের যেন কাজে লাগান হয়, যা চলমান মুক্তিযুদ্ধের জন্য সহায়ক হবে।’

কিছু দিন পর গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে নির্দেশ দেয়া হলো বিমানবাহিনী গঠনে উদ্যোগ নেয়ার জন্য এবং তাকে জানানো হয়, ভারত সরকার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনের জন্য তিনটি এয়ারক্র্যাফট দেবে এবং উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য ভারতের পূর্বাঞ্চল নাগাল্যান্ড প্রদেশের ডিমাপুর নামক স্থানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত একটি পরিত্যক্ত বিমানক্ষেত্র ব্যবহার করতে দেয়া হবে। এলাকাটি তখন ছিল গহিন বনজঙ্গল, উঁচু পাহাড় এবং পঁচিশ থেকে চল্লিশ ফুট উঁচু বৃক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। অপর দিকে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনের জন্য যে তিনটি বিমান প্রদান করা হয়, তার কোনোটিই যুদ্ধবিমান ছিল না।

বরং সেগুলো ছিল অত্যন্ত সাধারণ মানের পুরনো মডেলের বিমান। তন্মধ্যে একটি ছিল ডি সি-৩ ডাকোটা বিমান, যেটি উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন রাজস্থানের যোধপুরের মহারাজা, একটি ডিএইচসি ৩ অটার (de Havilland Canada DHC-3 Otter) সিঙ্গেল ইঞ্জিন বিমান এবং একটি এলিউট-থ্রি হেলিকপ্টার। এ অবস্থায় বাংলাদেশী বৈমানিক ও বিমানসেনাদের যে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়, তা হলো- পরিত্যক্ত বিমানক্ষেত্র এবং পারিপার্শ্বিক এলাকা বিমান চলাচলের জন্য অতি দ্রুত উপযোগী করে গড়ে তোলা, আধুনিক বিমান চালনায় অভ্যস্ত বাংলাদেশী পাইলটদের পুরনো ও ভিন্ন ধরনের বিমানে নিজেদের পরিজ্ঞাত করা এবং সাধারণ মানের বিমানকে যুদ্ধবিমানে রূপান্তর। অদম্য ইচ্ছা শক্তি, স্বাধীনতা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যুদ্ধংদেহী মনোভাব, দেশপ্রেম এবং পেশাদারী একাগ্রতার কাছে সেই সব সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জ খড়কুটোর মতো ভেসে গেল।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয়ের জন্য ভারতীয় বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষ গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সিংলা, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ঘোষাল, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রামকৃষ্ণসহ আরো অনেককে নিয়োজিত করেছিল। এ ব্যাপারে তৎকালীন ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল প্রতাপ চন্দ্র (পি সি) লালের সহযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। জনশ্রুতি রয়েছে, পি সি লালের শ্বশুরকুলের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায়।

২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। ইতিহাসের পাতায় রচিত হলো এক অন্যরকম ইতিহাস। ডিমাপুর বিমানক্ষেত্রে একত্র হলো মুক্তিপাগল, স্বাধীন দেশের স্বপ্নে বিভোর একদল ‘অগ্নিবলাকা’, হৃদয়ে তাদের কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জনের অদম্য বাসনা। এয়ার চিফ মার্শাল পি সি লাল এ দিন ফিতা কেটে উদ্বোধন করলেন নবগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জয়যাত্রা। সূচিত হলো বাংলার অগ্নিবলাকাদের ক্ষিপ্র গতিতে উড়ে চলা। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার নবগঠিত বিমানবাহিনীর পুরো ইউনিটকে বিভিন্ন ভাগে বিন্যস্ত করে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করেন- শুরু হয় আমাদের বিমানবাহিনীর কার্যক্রম। সে দিন থেকেই প্রতি বছর এই দিন (২৮ সেপ্টেম্বর) ‘বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকারের নেতৃত্বে গঠিত বিমানবাহিনীর এই ফরমেশনের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ। শত্রুর ওপর শাণিত আক্রমণ পরিচালনার জন্য শুরু হলো কঠোর প্রশিক্ষণ। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সকাল ও বিকেলে এবং রাত্রিকালীন উড্ডয়ন কার্যক্রম চলতে থাকে। বাংলাদেশী পাইলটরা জানতেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর রাত্রিকালীন বিমান যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতা। আর তাই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ঢাকাসহ শত্রুপক্ষের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রাত্রিকালীন বিমান আক্রমণের।

এ লক্ষ্যে স্থির থেকে সদ্যোজাত বিমানবাহিনীর অকুতোভয় যোদ্ধারা দিবা-রাত্রি প্রশিক্ষণে ব্যস্ত রইলেন এবং উত্তেজনায় অপেক্ষা করতে থাকেন, শত্রুদিগন্তে বিভীষিকা হয়ে উদিত হওয়ার মুহূর্তটির জন্য। বিমান হামলার মূল পরিকল্পনার প্রথম ভাগে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, ডিসি-৩ ডাকোটা বিমানে ৫০০ পাউন্ডের বোমা বহন করা হবে এবং এলিউট হেলিকপ্টার ও অটার বিমানে রকেট পড সংযোজন করে সাধারণ মানের ও পুরনো মডেলের এ বিমানগুলোকে যুদ্ধবিমানে রূপান্তরিত করা হবে। কিন্তু প্রায় পনেরো দিন উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ শেষে ডিসি-৩ ডাকোটা বিমানকে আক্রমণ পরিকল্পনা থেকে বাদ দেয়া হয়। এ জন্য যে, তা বিমানটিকে পুরো মাত্রার গতিতে চালাতে গেলে বিমানের পিস্টন ইঞ্জিনের ধোঁয়ার সাথে নির্গমন পাইপ দিয়ে আগুনের ঝলক বা শিখা নির্গত হয়, যা রাতের অন্ধকারে শত্রু পক্ষের কাছে সহজে চিহ্নিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

এলিউট হেলিকপ্টার এবং অটার বিমান চালনার জন্য পাইলটদের দু’টি ভাগে বিন্যস্ত করা হলো। হেলিকপ্টারের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ এবং কো-পাইলট হিসেবে নিয়োজিত হন ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম ও ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন, অপর দিকে টুইন অটার বিমানে ক্যাপ্টেনের দায়িত্বে ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম এবং কো-পাইলট হিসেবে ক্যাপ্টেন আকরাম ও ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন। প্রবল উৎসাহ নিয়ে বাংলাদেশী বিমানযোদ্ধারা বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। লক্ষ্য তাদের একটিই- স্বাধীনতা এবং শুধুই স্বাধীনতা।

আকাশ থেকে ভূমিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে গোলাবর্ষণের অনুশীলনের জন্য উঁচু উঁচু পাহাড়ের ঢালু পথে কিংবা গাছ গাছালির ওপর বিমান থেকে প্যারাসুট ফেলে এবং তা ছড়িয়ে দিয়ে সেগুলোকে এইমিং টার্গেট বানানো হয়। এলিউট-থ্রি হেলিকপ্টারের দুই পাশে ফাইটার বিমানের দুইটি রকেট পড সংযোজন করা হলো, যার প্রতিটিতে সাতটি করে রকেট বহন করা যায়। রকেটগুলো জোড়ায় জোড়ায় কিংবা একসাথে সবগুলো ছোড়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং সিলেকশন সুইচ ও ফায়ারিং সুইচ পাইলটের কন্ট্রোল স্টিকে সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া হেলিকপ্টারের বাঁ দিকের সøাইডিং দরজা খুলে সেখানে সাইড ফায়ারিংয়ের জন্য টুইন ব্যারেল ব্রাউনিং ‘থ্রি নট থ্রি’ মেশিনগান স্থাপন করা হয়েছিল। সফলভাবে সমরাস্ত্র সংযোজনের পর হেলিকপ্টারটি ৮ অক্টোবর ভারতের আসামের জোড়হাটে আনা হয় এবং পরে জোড়হাট থেকে উড়িয়ে ডিমাপুরে আনা হয়। এর সিরিয়াল নম্বর ছিল ৩৬৪। হেলিকপ্টারটির ভার্টিকেল স্ট্যাবিলাইজারে ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রতীক চিহ্ন মুছে স্বাধীন বাংলার জন্য নকশাকৃত প্রথম পতাকাটি অঙ্কন করা হয়, যা নবগঠিত বিমানবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।

অপর দিকে, অটার বিমানের দুই উইংয়ের নিচে দু’টি রকেট পড এবং একই কায়দায় টুইন ব্যারেল ব্রাউনিং মেশিনগান বসানো হয়। তবে অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে বিমানটির পেছনে ২৫ পাউন্ডের বোমা রাখার জন্য বম্ব র‌্যাক (জধপশ) বসানো হয় উড়ন্ত বিমানটি থেকে প্রয়োজনে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুর ওপর হাত দিয়ে বোমা ফেলার জন্য। এ ছাড়া পাইলট ও বিমানসেনাদের বাড়তি নিরাপত্তার জন্য ককপিটের তলদেশে এক ইঞ্চি পুরো ইস্পাতের পাত লাগানো হয়েছিল। বিমান উড্ডয়ন ইতিহাসের সব নিয়ম এবং আইনকানুনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিমানগুলোতে এইরূপ আদিম পন্থায় সমরাস্ত্র সংযোজন এবং বিমানের কাঠামোগত পরিবর্তনের দরুন বিমানের স্বাভাবিক উড্ডয়ন আচরণ, আকৃতি ও প্রকৃতিতেও অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়, যা বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে কিছুটা বিপজ্জনক। কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য উন্মুখ বিমানযোদ্ধারা সব বিপদ ও চ্যালেঞ্জকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে থাকেন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে। অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিরামহীন প্রশিক্ষণের পর দুঃসাহসী আকাশযোদ্ধা ও বিমানসেনারা চূড়ান্ত মুহূর্তটির জন্য অধীর আগ্রহ ও সীমাহীন উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন।

আক্রমণের প্রথম ধাপে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং নারায়ণগঞ্জ জ্বালানি তেলের ডিপোকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এরূপ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের পেছনে যে যুদ্ধকৌশল বা ভাবনাটি কাজ করেছিল, তা হলো যুদ্ধের যেকোনো পক্ষের সেনাবাহিনীর দ্রুত মুভমেন্ট কিংবা নৌ, বিমানসহ অন্যান্য যুদ্ধসামগ্রী সচল রাখা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল ‘জীবনীশক্তি’ হিসেবে কাজ করে থাকে। কাজেই এই শক্তিকে ধ্বংস করতে পারলেই যুদ্ধক্ষেত্রে বহুবিধ আশানুরূপ ফলাফল লাভ করা সম্ভব। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে এলিউট-৩ হেলিকপ্টার এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলমের নেতৃত্বে অটার বিমান বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার শমশের নগরের উল্টো পাশে ভারতীয় সীমান্তে অবস্থিত, ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহর ফরোয়ার্ড এয়ার ফিল্ডে মোতায়েন করা হয়।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, নারায়ণগঞ্জে হামলা করা হবে হেলিকপ্টার দ্বারা এবং চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারি আক্রমণ করা হবে অটার বিমানে। আক্রমণের লক্ষ্যে স্থির থেকে, বিমানবাহিনীর অকুতোভয় যোদ্ধারা পূর্ণপ্রস্তুতি শেষে প্রতীক্ষায় রইলেন বহুলাকাক্সিক্ষত মুহূর্তটির জন্য। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই মিশনের নামকরণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারের নামের প্রথম অক্ষর ‘ক’ দিয়ে ‘অপারেশন কিলো ফ্লাইট’। প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি যতই নিকটবর্তী হচ্ছিল, ‘কিলো ফ্লাইট’-এর প্রতিটি সদস্যের শিরা, উপশিরা, রক্তকণিকা এক অপূর্ব উত্তেজনায় ঝংকৃত হচ্ছিল। কিন্তু তাদের সবাইকে হতাশ করে ২৮ নভেম্বর নয়া দিল্লি থেকে ওই মিশন বাতিলের নির্দেশ এলো। চরম হতাশা এবং দুঃখ নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যদের সময় অতিবাহিত হতে লাগল।

অবশেষে এলো সেই চূড়ান্তক্ষণ, ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তান বিমানবাহিনী বিকেল ৪টায় ভারতের ওপর বিমান আক্রমণ শুরু করে এবং দু’দেশের মধ্যে পুরোদস্তুর যুদ্ধ বেধে যায়। এই অতর্কিত বিমান হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার জন্য কিলো ফ্লাইট-এর সদস্যদের কাছে নতুন নির্দেশ আসে এবং তাদের বলা হয়, আক্রমণ হবে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী। ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে সব অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে ছুটে চলে এক ঝাঁক অগ্নিবলাকা-নতুন আলো, নতুন সূর্যের সন্ধানে।

এই ছুটে চলার মানে- হয় বিজয় নয়তো মৃত্যু। তাদের সাথে ছিল না দিকনির্ণয় বা লক্ষ্যবস্তু সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য আধুনিক নেভিগেশনাল ইন্সট্রুমেন্ট। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান, সাহস এবং অগাধ দেশপ্রেমই ছিল তাদের অনুপ্রেরণা ও বিজয় ছিনিয়ে আনার মূলমন্ত্র। ভারতীয় স্থাপনার ওপর পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিমান হামলার প্রথম পাল্টা জবাব দেয় সদ্যগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। কিলো ফ্লাইট-এর সদস্যরা অত্যন্ত সফলভাবে চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং নারায়ণগঞ্জ তেল ডিপোর ওপর বিমান হামলা চালিয়ে পাকবাহিনীকে হতবিহ্বল করার পাশাপাশি তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অনেকাংশে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন। নিজ জীবনের মায়া তুচ্ছ করে দুঃসাহসী আকাশ যোদ্ধারা শত্রু দিগন্তে বিভীষিকা ছড়িয়ে যখন ফিরে আসছিলেন, তখন আগুনের লেলিহান শিখা অন্ধকারের বুক চিরে যেন কাক্সিক্ষত আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিচ্ছিল সবখানে।

এ যেন হাজার বছরের নিপীড়ন আর বঞ্চনার আঁধার ছিন্ন করা উদিত এক নতুন লাল সূর্য, যা মুক্তির বারতা। নবগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কর্তৃক বিমান আক্রমণের মাত্র ১৩ দিন পর বিশ্বের মানচিত্র সংশোধিত হয় আরেকবার; সংযোজিত হয় এক নতুন রাষ্ট্র, একটি জাতি, একটি স্বাধীন পতাকা, একটি দেশ- নাম তার বাংলাদেশ। আজ বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দিবসে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ, অব: গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারসহ বিমানবাহিনীর সেই সদস্যদের যাদের সুচিন্তিত ভাবনা ও পরিকল্পনা, সময়োচিত পদক্ষেপ, অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে গঠিত হয়েছিল আমাদের বিমানবাহিনী। শ্রদ্ধাঞ্জলি সব শহীদের আত্মার প্রতি, যাদের মহান আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন মানচিত্র, নির্মল মুক্ত নীলাকাশ- যেখানে স্বাধীনভাবে মুক্ত ডানা মেলে উড়ে আগলে রাখবে আপন আকাশের সীমা-পরিসীমা আজ ও আগামী দিনের অগ্নিবলাকারা। 

ইমেইল: [email protected]