Naya Diganta

জাতি গঠন বনাম সার্বভৌমত্ব

জাতি
রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া, ভারত কর্তৃক কাশ্মিরে আগ্রাসন চালানোর পর জাতি, জাতি গঠন এবং সার্বভৌমত্বের বিতর্কটি বিশ্ব রাজনৈতিক সাহিত্যে নতুনভাবে হাজির হয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার পুনরায় আগমন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের (সৌদি আরব, ভারত, ইরান) সামরিক ও অর্থনৈতিক বিকাশ এ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপালের মতো উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের আলোচনায় জাতি, জাতি গঠনের বিষয়টি পর্যালোচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর প্রায় ৪৫ বছর অতিক্রম করেছে। প্রশ্ন উঠছে এই ৪৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে? বাংলাদেশ কি একটি জাতি রাষ্ট্র?

ইংরেজি ‘নেশন’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে জাতি শব্দটি ব্যবহার হয়ে আসছে। ১৮৮৭ সালে সরবর্নে ফ্রান্সের বিখ্যাত জাতীয়তাবাদী পণ্ডিত আর্নেস্ট রিনাসের বিখ্যাত প্রশ্ন ‘হোয়াট ইজ নেশন’ অর্থাৎ জাতি আসলে কী? এর পর থেকেই এ নিয়ে অ্যাকাডেমিসিয়ানদের মধ্যে বিতর্কের সূচনা হয়। এ নিয়ে তিন ধরনের স্কুল অব থট পরিলক্ষিত হয়। জাতীয়তাবাদী, আধুনিক ও ধারণাবাদী এ তিন ধারায় ‘জাতি’ শব্দের ধারণা আমরা এ যাবতকালে পেয়ে আসছি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে দার্শনিক রেনান জাতি বলতে যেটাকে বোঝাতে চেয়েছেন তা হচ্ছেÑ আত্মা, ধর্মীয় নীতিমালা ও নৈতিক সচেতনতার সমন্বয়ে গঠিত একটি চেতনা- যা জাতীয়তাবোধ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তার মতে, একটি জাতি তার ঐতিহাসিক ঘটনাবলি স্বতন্ত্রভাবে প্রদত্ত অঞ্চলটির জনসংখ্যাকে একটি জাতির মধ্যে মিশিয়ে দেয়। যার ফলে একটি জাতি একটি আত্মায় রূপান্তরিত হয় এবং সম্মিলিতভাবে ত্যাগ এবং উৎসর্গের স্মৃতি ভাগ করে নেয়।

সমাজবিজ্ঞানী বেনডিক্ট এন্ডারসনের মতে, জাতি হচ্ছে- সার্বভৌম, সংরক্ষিত একটি কমিউনিটির ধারণা মাত্র। ‘জাতি’ সংশ্লিষ্ট উপরোক্ত ধারণার আলোকে বাংলাদেশের জাতি ও জাতি গঠনের বিষয়টি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে যে চিত্রটি ভেসে আসে সেটি হচ্ছে- বাংলাদেশের ধর্মীয় নীতিমালায় ইসলাম ডমিনেট করছে। আর ভাষাভাষী হিসেবে বাংলা ৯৫ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা। ছোট্ট ভূখণ্ড, অত্যধিক জনসংখ্যা সত্ত্বেও এই ইউনিক আইডেন্টিটি প্রাকৃতিকভাবেই একটি জাতির জাতিসত্তা বিনির্মাণে কাজ করেছে। প্রাকৃতিক নির্মাণের পাশাপাশি জাতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের এলিট শ্রেণী, রাজনৈতিক নেতাসহ বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক জনতার ত্যাগ ও তিতিক্ষা। ত্যাগ ও সংগ্রামের এই ধারায় ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক ছয় দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ- একটি জাতির বুনিয়াদ শক্তিশালীকরণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লড়াইও করতে হয়েছে দেশটিকে। জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় অনেকদূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। সমাজবিজ্ঞানী বেনডিক্ট অবশ্য জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় দু’টি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন এক. সার্বভৌমত্ব দুই. সংরক্ষণ। অর্থাৎ জাতি হিসেবে সার্বভৌমত্ব অর্জনই শেষ কথা নয় এর সংরক্ষণ অপরিহার্য দিক।

জাতি গঠন
একটি জাতির জাতি গঠনপ্রক্রিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী যে উপাদান কাজ করে তা হচ্ছে- ওই জাতির জাতীয় ইতিহাস বিনির্মাণ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, আমরা আমাদের জাতির গ্রহণযোগ্য জাতীয় ইতিহাস বিনির্মাণ করতে সচেষ্ট হইনি। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে আমাদের বিতর্ক করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, চেতনা করে হয়রান হয়ে যাচ্ছি কিন্তু ভুলে যাই যার হাত ধরে স্বাধিকার আন্দোলনের বুনিয়াদ রচিত হয়েছিল সেই মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। ভুলে যাই মুক্তিযুদ্ধের পেছনে যে নিউক্লিয়াস কাজ করেছিল সেই ঐতিহাসিক সত্যকে। রাজনৈতিক ডামাডোলে উপেক্ষিত করে রাখি মুক্তিসংগ্রামের রাজনৈতিক সিপাহসালার প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে। ইতিহাস পর্যালোচনায় উপেক্ষিত থেকে যান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানী। এখনো নিরূপণ করতে পারেনি ঠিক কতজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তন হয় সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর যেহেতু দুটি দল বেশির ভাগ সময় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সুতরাং বাংলাদেশের ইতিহাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইতিহাস পর্যালোচনায় অবশ্যম্ভাবীভাবেই এ দু’জনের নাম শীর্ষে থাকবে এ নিয়ে আশা করি কারো বিতর্ক নেই। কিন্তু এ দু’জনই যদি ইতিহাসের শুরু এবং শেষ হয় সে জাতির স্থায়িত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে তা আর বলা অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয়ত, জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় শক্তিশালী উপাদান হচ্ছে- গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। একটি জাতির গঠন প্রক্রিয়া অনেকাংশেই নির্ভর করে ওই জাতির গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত হওয়ার ওপর। এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট সরকার পদ্ধতি অপরিহার্য নয়। সরকার পরিচালনায় জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণই একটি জাতির জাতি গঠন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।

কারণ জনগণের অংশগ্রহণই কেবল জনসমর্থিত সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি আমরা লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত গোড়াপত্তন হয়েছিল ’৭০-এর নির্বাচনে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কারণে। এ নিয়ে টালবাহানা শুরু করায় বাংলার জনগণ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে এগোতে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু বারবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নস্যাৎ প্রতিবেশী দেশের অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বেশিদূর এগোতে দেয়নি দক্ষিণ এশিয়ার এ ক্ষুদ্র দেশটিকে। বাঙালি নাকি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এ বিতর্ক করতে হয়েছে দীর্ঘ ৪০ বছর।

তৃতীয়ত, একটি দেশের জাতি গঠনপ্রক্রিয়া নির্ভর করে সে দেশের ‘সচেতন এলিট শ্রেণীর’ ওপর। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা একটি শক্তিশালী এলিট শ্রেণী গঠনে সহায়তা করেছিল। যার পথ ধরে বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো সংখ্যায় কম হলেও একটি শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখে। হাজারো মানুষের চেয়ে কম সংখ্যক শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক সমাজ জাতি গঠনে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ এলিট শ্রেণী অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। সমাজ বিজ্ঞানী গ্রামসির একটি বিখ্যাত উক্তি ছিলÑ রাষ্ট্র হচ্ছে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়। পরিস্থিতি এত নাজুক পর্যায়ে ঠেকেছে যে গেল ১০ বছরে নাগরিক সমাজের অস্তিত্ব পর্যন্ত আঁচ করা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশী গণতন্ত্র, দেশের সার্বভৌত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।

চতুর্থত, জাতি গঠন প্রক্রিয়া অনেকাংশেই নির্ভর করে ওই জাতির জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। রাজনৈতিক দল, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ মোটা দাগে এ তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা একটি জাতির জাতি গঠন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জনগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল পাওয়া আজ দুষ্কর। দলের অভ্যন্তরে কালো টাকা ও পেশিশক্তিই দলীয় নেতা বনে যাওয়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমাহীন দুর্নীতিতে জড়িত শাসন বিভাগ। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। এমনি বাস্তবতায় টেকসই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবনা খুবই দুষ্কর।

সার্বভৌমত্ব
এবার আসি সমাজবিজ্ঞানী বেনেডিক্টের সার্বভৌমত্ব¡ ও সংরক্ষণের আলোচনায়। সার্বভৌমত্বের ধারণা নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিতর্কে রয়েছে। অনেকে মনে করেন বিষয়টি খানিকটা জটিল। তবে এ বিষয়ে সবাই প্রায় একমত যে, সার্বভৌমত্বের অর্থই হচ্ছে স্বাধীনতা। অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কার্যাবলি সম্পাদনের ক্ষমতাই হচ্ছে স্বাধীনতা। বেশির ভাগ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, Sovereignty is the ultimate power, authority and/or jurisdiction over a people and a territory. একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিলাম ১৯৭১ সালে। আর এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছিল অল্প দিনেই। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর প্রশ্ন থেকে যায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়বলি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিক জনগণের ইচ্ছায় কি চলে? উত্তর, না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনগণের ইচ্ছায় এখন একটি অবাধ, নিরপক্ষে নির্বাচন পর্যন্ত আয়োজন করা যায় না।

প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এসপি হান্টিংটন তার সভ্যতার সঙ্ঘাত বইয়ে পুরো পৃথিবীকে সাংস্কৃতিকভাবে সাতটি ভাগে ভাগ করেছেন। এতে তিনি বাংলাদেশকে ইসলামী সভ্যতায় নয়, ভারতীয় সভ্যতা তথা হিন্দু সভ্যতায় বিলীন হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমনি বাস্তবতায় বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ করাই হোক প্রতিটি বাংলাদেশীর আগামী দিনের কর্মপন্থার অগ্রাধিকার।

লেখক : সাংবাদিক ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক, নিউ জার্সি সিটি ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র