Naya Diganta

ব্রেক্সিট ভূত পিছু ছাড়ছে না ব্রিটেনের

প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন

ব্রেক্সিট ভূত পিছু ছাড়ছে না যুক্তরাজ্যকে। সেই গণভোট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কোনো বিষয়েই একমত হতে পারছে না কেউ। খোদ শাসক দলের ভেতরে মতানৈক্যের জন্য নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবে ব্রিটেন তার সুরাহা করতে গলদঘর্ম সবাই। বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে সঙ্কটময় অবস্থায় ব্রিটেন। এমন বিব্রতকর অবস্থায় ব্রিটেনের সামনে কয়েকটি পথ খোলা বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্ধারিত সময়ে ইইউ ত্যাগ
৩১ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তি বা চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের সম্পন্ন হতে পারে। তবে সম্প্রতি পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের সময় বাড়াতে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে ইইউর কাছে আবেদন করার কথা প্রধানমন্ত্রীর। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়াতে সম্প্রতি হাউজ অব কমন্সে ওই আইন পাস হয়। কিন্তু এ আইনকে ‘আত্মসমর্পণ আইন’ আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি ইইউকে মধ্যে এ ধারণা দিচ্ছে যে, পার্লামেন্ট ব্রেক্সিটের পথ বন্ধ করে দেবে কিংবা তারা সময় বাড়ানোর আবেদন করতে বরিসকে বাধ্য করবে। তবে জনসনের এ মন্তব্যকে ‘ঘৃণ্য’ আখ্যা দিয়েছেন আইনপ্রণেতারা। এ পরিস্থিতিতে আগামী সপ্তাহে জনসনের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট আনা হচ্ছে পার্লামেন্টে। গত শনিবার এ তথ্য জানিয়েছেন স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) অন্যতম নেতা স্টুয়ার্ট হোসি। তিনি বলেন, ৩১ অক্টোবর চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে অনাস্থা ভোটের পদক্ষেপ। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ব্রিটেনের কোনো চুক্তি হোক বা না হোক, ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন হবেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন চুক্তি

যেকোনো বিকল্পের জন্য ইইউ তার পথ খোলা রেখেছে। কিন্তু সেই বিকল্প হতে হবে বাস্তবসম্মত, আইনসম্মত ও কার্যকর। এখনো ইইউ তেমন পদক্ষেপ দেখতে পায়নি। বরিস জনসনের হাতে নতুন চুক্তি করার মতো খুব বেশি সময় নেই, এর মধ্যে যে প্রস্তাব থেরেসা মের সময়কালে নেয়া হয়েছিল, ওই প্রস্তাবই তিনবার ভোটে বাতিল হয়েছে। তবে কোনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এখনো সম্ভব। এটিও হতে পারে ব্রিটেনের অন্যতম সেরা একটি পদক্ষেপ।

পদত্যাগ
প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, তিনি ‘খাদে পড়ে মরে যাবেন’ তবু ব্রেক্সিটের সময় বাড়াতে চাইবেন না। একটু বাড়াবাড়ি শোনালেও জনসনের হাতে থাকা বিকল্পের একটি হচ্ছে পদত্যাগ করা এবং বলা যে, ‘অন্য কেউ চাইলে সময় বাড়াক, আমি সময় বাড়াতে চাইব না।’
এখন যেহেতু কনজারভেটিভ পার্টি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, তাই এমনিতেও হয়তো সাধারণ নির্বাচন দিতে হবে তাদের। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও তো সে জন্য রাজি হতে হবে এবং ব্রিটেনকে চাইতে হবে, কোনো চুক্তি ছাড়া যেন তাকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বেরিয়ে যেতে না হয়।

জনসন পদত্যাগ করলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী যিনি হবেন, হাউজ অব কমন্সের মাধ্যমে ইইউর কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন জানানোর জন্য তিনি ১৪ দিন সময় পাবেন। সেটা হতে পারেন জেরেমি করবিন বা কেন ক্লার্ক। আবার শীর্ষস্থানীয় কোনো আমলাকেও এ দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।

এ দিকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ঘোষণা দিয়েছেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলেও তিনি পদত্যাগ করবেন না। বরিস বলেন, ব্রিটিশ জনগণের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্তে তিনি দেশের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে পারেন না। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি কঠিন সময়ে দল ও দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছি। এ নেতৃত্বভার চালিয়ে যাওয়াই আমার দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করি। শুধু কনজারভেটিভ পার্টির সরকারের পক্ষেই ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সময় বাড়িয়ে নিতে রাজি হওয়া
রাজকীয় সম্মতি পাওয়া নতুন আইন অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবরের মধ্যে এমপিরা চুক্তিসমেত অথবা চুক্তিহীন ব্রেক্সিটে সম্মতি না দিলে, প্রধানমন্ত্রীকে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্রেক্সিট পেছানোর জন্য সময় চাইতে হবে। এখন এটিও জনসনের জন্য একটি বিকল্প, কারণ তাতে তার কিছুটা মানহানি হলেও তাৎক্ষণিক সঙ্কট কাটবে।

এরপর নভেম্বর বা ডিসেম্বরের দিকে তিনি নির্বাচন দিতে পারবেন এবং প্রচারণা চালাতে পারবেন যে, প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই তিনি নিয়েছেন। এতে করে দলের মধ্যে নিজের সমর্থন বাড়ানোর জন্যও সময় হাতে পাবেন তিনি। ফল হতে পারে, পাঁচ বছরের কম সময়ের মধ্যে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে যেতে হবে ব্রিটেনকে এবং নেতৃত্ব দেয়ার জন্য হয়তো চতুর্থ একজন নেতাকে খুঁজে বের করতে হবে।

সর্বশেষ রানীর মাধ্যমে পার্লামেন্ট বন্ধের ঘোষণা ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অবৈধ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। পার্লামেন্ট ব্রেক্সিট-বিরোধীরা হয়তো এটাকে দেখছে তাদের একটা বিজয় হিসেবে, কিন্তু ব্রিটিশ রাজনীতিতে ব্রেক্সিটকে ঘিরে সঙ্কট ও বিভ্রান্তির ফলে আরো গভীর হয়েছে।