Naya Diganta

বিচিত্র পৃথিবীতে বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি

প্রকৃতি থেকে সৃষ্ট কোনো সৃষ্টির সাথে কোনোটার মিল বা সামঞ্জস্য নেই। কোটি কোটি অগণিত সৃষ্টির কারো পরিমাপ, রূপ, কষ্টের স্বর, চেহারা প্রভৃতি এক নয়। পৃথিবীর সব রাষ্ট্র থেকে মুসলমানেরা সৌদি আরবে হজ করার জন্য সমবেত হয়। এ বছর (২০১৯) মক্কার পার্শ্ববর্তী মিনা, মুজদালিফা, আরাফার ময়দান, কাবা মোবারক, মসজিদে নববিতে (মদিনা) লাখ লাখ লোকের সমাবেশ দেখলাম, দেখলাম ভিন্ন ভাষা, রঙ, আকার ও চেহারা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমাবেশ সেখানে হয়। এর চেয়ে বড় কোনো সমাবেশ কোনো ধর্মাবলম্বীদের হয় না।

স্থানীয়দের অর্থাৎ মক্কা-মদিনায় হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বক্তব্য মতে, বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ৪৫ লাখ মুসলমান নর-নারী এ বছর হজ পালন করেছেন। তাদের মতে, সৌদি আরবের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে অনেকেই হজ করতে আসেন যাদের কোনো হজ পারমিট বা অনুমতি ছিল না। মিনার পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে হাজার হাজার নর-নারীকে রাত কাটাতে দেখেছি। হজ পারমিট নেই বলে মিনার তাঁবুতে তাদের স্থান হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বললেন, যেহেতু বৈধ পথে তারা হজ করতে আসেনি, সেহেতু মিনার তাঁবুতে তাদের স্থান হয়নি। মুজদালিফায় তিল ধারণের স্থান ছিল না। একজনের ওপরে আর একজনের মাথা রেখে নামাজ আদায় করতে হয়েছে। ইতঃপূর্বে কয়েকবার হজে যাওয়ার সুযোগ আল্লাহ পাকের মেহেরবানিতে হয়েছিল বটে, কিন্তু সম্প্রতি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের ব্যবস্থাপনার সাথে মুজদাফিলা বা মিনা থেকে ট্রেনে যাতায়াত সুবিধা অনেক সুন্দর ও সমৃদ্ধ করা হয়েছে।

ফলে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করতে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশ থেকে এ বছর এক লাখ ২৭ হাজারের অধিক নর-নারী হজ পারমিটে হজ পালনে যোগ দিয়েছেন। বিশ্বের ৫৬টি মুসলিম দেশ ছাড়াও পৃথিবীর এমন কোনো রাষ্ট্র নেই, যেখান থেকে হজ পালন করতে মুসলমান আসেননি। যেসব রাষ্ট্রে মুসলমানদের ওপর অমানুসিক নির্যাতন হচ্ছে যেমন- ভারত, জম্মু-কাশ্মির, নেপাল, চীন প্রভৃতি এলাকা থেকেও মুসলিম নর-নারীরা হজ পালনে এসেছেন। শিশু, কিশোর, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারে না এমন অতিশয় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও দেখলাম যারা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রওজা মোবারকে সালাম পেশ করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। পরিচিত-অপরিচিত কেউ কাউকে রেখে কিছু খাচ্ছে না। জানা নেই, পরিচয় নেই, ভাষা জানা নেই- তবুও ভ্রাতৃত্ববোধের কারণে রাত-দিন যার যার ক্ষমতানুযায়ী বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী বিশেষ করে খেজুর, ফলফলাদি, জুস প্রভৃতি একে অপরকে বিতরণ করছেন, যা না দেখলে উপলব্ধি করা যাবে না।

লাখ লাখ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কারো সাথে কারো চেহারা, কণ্ঠস্বরের কোনো মিল দেখা গেল না। একই দেশ, একই পরিবার থেকে এসেছে কিন্তু চেহারা বা কণ্ঠের সাথে কারো কোনো মিল নেই। পাঞ্জাবি, বাঙালি, কোরিয়ান, নেপালি, সুদানি, মিসরি, চীনা, ইরানিদের শরীরের গঠন দেখে বোঝা যায়, তারা কোন দেশের বংশোদ্ভূত, তদুপরি নিজেদের মধ্যে কারো চেহারার সাথে কারো চেহারা বা কণ্ঠের সাথে কারো সঙ্গতি নেই। এ অসঙ্গতি থেকে বোঝা যায়, সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টির মধ্যে কত প্রকার সৃষ্টি করতে পারে!

অপরাধবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, গবেষকেরা গবেষণা করে প্রমাণ পেয়েছেন, যমজ দুই ভাইয়ের আঙুলের ছাপ একজনের সাথে অন্যজনের মিল নেই। ব্রিটিশ ভারতের কুচবিহারের সিভিল সার্জেন্ট ঝরৎ ডরষষরধস ঐবৎংপযবষ মানুষের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে আবিষ্কার করেন, বয়স বাড়লেও আঙুলের রেখার কোনো পরিবর্তন হয় না। খ্রিষ্টের জন্মের ১৭৯২-১৭৫০ পর্যন্ত নরম মাটিতে আঙুলের ছাপ গ্রহণের নিয়মনীতি চালু ছিল। ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে উৎ. ঘবযবসরধয মানুষের হাতকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে আঙুলের রেখা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতেন। ১৭৮৮ সালে ঔড়যধহহ গধুবৎ আবিষ্কার করলেন, দু’জনের হস্তরেখা এক নয় এবং একজনের হস্তরেখার সাথে অন্যজনের হাতের রেখা কোনো দিনই মিলবে না। এমনকি আপন যমজ ভাইয়ের হাতের বা আঙুলের রেখার সাথে মিল নেই। এ কারণেই চীন দেশে দলিল বা মূল্যবান প্রমাণাদিতে আঙুলের ছাপ তিন হাজার বছর আগে ব্যবহার শুরু হয়।

বারবার যারা অপরাধ করে তাদের শনাক্ত করার জন্য ১৮৮৩ সালে অষঢ়যড়হংব ইবৎঃরষষড়হ আঙুলের রেখার ওপর গুরুত্ব দেয়ার নিয়ম চালু করেন। ঝরৎ ঋৎধহপরং এধষঃড়হ এবং ঝরৎ ঊফসঁহফ জরপযধৎফ ঐবহৎু আঙুলের রেখাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। ১৮৯১ সাল থেকে ওাধহ (ঔঁধহ) ঠঁপবঃরপয ১০টি আঙুলের রেখার ছাপ ব্যবহার করার প্রচলন শুরু করেন।

এফবিআই (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন), আমেরিকার ক্রিমিনাল জাস্টিস ডিপার্টমেন্টসহ অপরাধ জগৎ নিয়ে গবেষণা করেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ঐকমত্য পোষণ করে আঙুল রেখার তিনটি চৎরহপরঢ়ষব নির্ধারণ করেন। যা নিম্নরূপ- (১) ঋরৎংঃ চৎরহপরঢ়ষব : অ ভরহমবৎঢ়ৎরহঃ রং ধহ রহফরারফঁধষ পযধৎধপঃবৎরংঃরপ, হড় ঃড়ি ভরহমবৎং যধাব ুবঃ নববহ ভড়ঁহফ ঃড় ঢ়ড়ংংবং রফবহঃরপধষ ৎরফমব পযধৎধপঃবৎরংঃরপং. (২) ঝবপড়হফ চৎরহপরঢ়ষব : অ ভরহমবৎঢ়ৎরহঃ রিষষ ৎবসধরহ ঁহপযধহমবফ ফঁৎরহম ধহ রহফরারফঁধষ’ং ষরভবঃরসব. (৩) ঞযরৎফ চৎরহপরঢ়ষব : ঋরহমবৎঢ়ৎরহঃং যধাব মবহবৎধষ ৎরফমব ঢ়ধঃঃবৎহং ঃযধঃ ঢ়বৎসরঃ ঃযবস ঃড় নব ংুংঃবসধঃরপধষষু পষধংংরভরবফ.

অর্থাৎ প্রথমত, প্রতিটি আঙুল রেখার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। দু’টি আঙুল রেখা এক হবে না। দ্বিতীয়ত, জীবিত অবস্থায় একজন মানুষের আঙুল রেখা পরিবর্তন হবে না। তৃতীয়ত, আঙুল রেখা পদ্ধতিগতভাবে একের সাথে অন্যের আলাদা করা যায়।

বিজ্ঞানীরা আঙুল রেখাকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করেছেন যথা- (১) অজঈঐ, যা ৫ শতাংশ মানুষের আঙুলে রয়েছে, (২) ডওঞঙজখ, যা ৩০ শতাংশ মানুষের আঙুলে রয়েছে এবং (৩) খঙঙচ, যা ৬০ শতাংশ মানুষের আঙুলে রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মায়ের গর্ভে ১০ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকাবস্থায়ই আঙুল রেখা শিশুর দেহে অঙ্কিত হতে শুরু করে। আরো গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানুষের চোখ, ঠোঁট, চোখের দৃষ্টিপাত, এমনকি চোখের ভেতরে চোখের মণির আশপাশে যে রগ আছে তাতেও কারো সাথে কারো মিল নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান, অপরাধ বিজ্ঞান এমনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে যে, মানুষের অঙ্গের প্রতিস্তরের আলাদা রূপ রয়েছে, যা থেকে একজনকে আর একজনের সাথে আলাদা করা যায়।

অপরাধ বিজ্ঞান বা অপরাধী শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা এখন ডিএনের ওপর নির্ভরশীল। ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, একজন মানুষের সাথে অন্য একজনের ৯৯ শতাংশ মিল থাকলেও ১ শতাংশ জায়গায় গরমিল থেকেই যায়।

এত গেল মানুষের দেহের প্রশ্নে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে সৃষ্টি তথ্য আরো বিস্ময়কর। মহাজাগতিক ভাঙাগড়ার দৃশ্যাবলি আরো অবিশ্বাস্য। ডার্কম্যাটারের থিউরির অস্তিত্ব আরো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। মহাকাশবিজ্ঞানীদের মতে, নভোমণ্ডলে এমন সব দূরবর্তী গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে, যেখানে আলোর গতিতে ছুটলেও পৌঁছতে লাগবে আমাদের সময়ের বহু সহস্র কোটি আলোকবর্ষ। মহাশূন্যের অজানা আরো কত গভীরে, কত বিলিয়ন ট্রিলিয়ন আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিলে মহাকাশের সীমানা পাওয়া যাবে, তা বিজ্ঞানীরা এখনো আবিষ্কার করতে পারেননি। (বাকি অংশ পরবর্তী সপ্তাহে) 
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী
(অ্যাপিলেট ডিভিশন)
[email protected]