Naya Diganta

আফগানিস্তানে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগের বারের মতোই চলমান যুদ্ধের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আবারো প্রমাণিত হয়েছে যে, আফগানিস্তানকে গণতন্ত্র কার্যকর করতে হলে শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়।
বরং এই নির্বাচনে দেখা গেছে, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো দুর্বল হয়ে আছে, সেখানে সাংগঠনিক কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে এবং ব্যাপক দুর্নীতিতে সেগুলো জর্জরিত। আফগান রাজনীতিকে রূপান্তরের মতো সক্ষমতা তাদের নেই।
নির্বাচনের এমনকি দুই দিন পরেও আফগানিস্তানের ‘ইনডিপেন্ডেন্ট ইলেকশান কমিশন’ নিশ্চিত করতে পারেনি যে, নির্বাচনের দিনে আসলে কতগুলো ভোটকেন্দ্র খোলা ছিল এবং কতজন ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর সাথে রেকর্ড কম সংখ্যক ভোটারদের ভোট দেয়ার সমস্যাটি তো রয়েছেই।
বর্তমান আফগান সরকারের অনেকেই চটজলদি বলে দিয়েছেন যে, ভোটারদের কম উপস্থিতির কারণ হলো তালেবানের হামলার হুমকি, যেটা আসলে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ভোটে ব্যাপক কারচুপি ও প্রতারণা এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আস্থার সঙ্কটও একটা বড় কারণ। ফলে ভোটারদের উপস্থিতি বহু কম হয়েছে। তালেবানের হামলার হুমকি আগের নির্বাচনগুলোর সময়ও ভালোমতোই ছিল, কিন্তু সেটা আফগানদের ভোট দেয়ার ব্যাপারে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি।
কিছু বিশ্বস্ত রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ফল ঘোষণায় বিলম্ব ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য সরবরাহে দেরি করা হচ্ছে ইচ্ছা করেই, যাতে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো যায় এবং কারচুপির সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, প্রার্থীরা এরই মধ্যে নিজেদের বিজয় দাবি করছেন। এতেই বোঝা যায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর অদক্ষতা কতটা প্রকট। নতুন আফগান সরকার কি শান্তি প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারবে এবং দেশকে অচলাবস্থা থেকে বের করে আনতে পারবে? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নটাই আফগানদের একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রেখেছে।
এটা নিশ্চিত যে, আফগানিস্তানে বিগত দুই দশকে একটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিকাশ হয়নি। এর কারণ শুধু এটা নয় যে, বিদেশী আগ্রাসনের বিপরীতে তালেবান এর বিরোধিতা করেছে বরং বিদেশী আগ্রাসী শক্তি নিজেরাও এ প্রক্রিয়াকে গভীর করার জন্য কোনো গঠনমূলক ভূমিকা রাখেনি। তা ছাড়া আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তালেবানের সাথে শান্তি চুক্তি হওয়ার আগে নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে বিরোধিতা করেছে। নির্বাচনের মাত্র কিছু দিন আগে, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ কাবুলে জড়ো হয়েছিল এবং তারা নির্বাচন বাতিল করে শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর মনোযোগ দেয়ার জন্য সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করে। এই জমায়েতে শুধু সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই-ই ছিলেন না, বরং সাবেক মুজাহিদিন ও সাবেক তালেবান নেতারাও ছিলেন।
বিবৃতিতে তারা বলেছেন যে, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটা দেশকে এখনকার চেয়েও গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান আলোচনার প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব শুরু হওয়া উচিত এবং আফগানিস্তানের শান্তির ব্যাপারে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্যও তৈরি হওয়া দরকার।
ভারতের দিক থেকে, বিরোধীদের উদ্বেগ ও দাবির কথা বাদ দিয়ে, এই নির্বাচন তাদের পাকিস্তানবিরোধী এজেন্ডা পুনরুজ্জীবিত করা এবং আফগানিস্তানের মাটি থেকে সেই লক্ষ্যে তৎপরতা অব্যাহত রাখার একটা সুযোগ। ভারতের দিক থেকে দেখলে, আফগানিস্তানের নতুন নেতা আশরাফ গনি হোন বা আব্দুল্লাহ হোন, কাবুল সরকার পাকিস্তানের প্রতি শত্রুপ্রবণই থাকবে, তারা রাজনীতিতে তালেবানের ফেরা ঠেকিয়ে রাখবে এবং এই পরিস্থিতিটা নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগাতে চায় ভারত।
ভারত তাই আফগানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে তারা ভোটে অংশ নেয়। কাশ্মিরকে ভারতের সাথে যুক্ত করার বিরুদ্ধে পাকিস্তান তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করায় ভারতের জন্য আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানকে মোকাবেলা করাটা আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বক্তৃতাসহ পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্যিকার অর্থেই কাশ্মিরকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। জাতিসঙ্ঘে খানকে ‘ম্যান অব এ মিশন’ আখ্যা দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের সম্পাদকীয়তে বলেছে যে, খানের বক্তৃতার পর, জাতিসঙ্ঘের জন্য কাশ্মিরকে উপেক্ষা করাটা এখন অসম্ভব। এর অর্থ হলো ভারত এখন অব্যাহতভাবে একটা আগ্রাসনের শিকার হবে, যেটার জবাব দেয়ার জন্য ভারত আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানবিরোধী তৎপরতা বাড়াতে চায়।