Naya Diganta

ফুঁসে উঠছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবরার হত্যা

মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গত তিন দিন ধরে বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) যেমন উত্তাল রয়েছে তেমনি ক্ষুব্ধ ও ফুঁসে উঠছে দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল গতকাল বিক্ষুব্ধ। মূল অভিযোগ যে সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, সে সংগঠন (ছাত্রলীগ) গতকাল দোষী ও দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করেছে। গতকাল তৃতীয় দিনের মতো বুয়েটে কোনো ক্লাস হয়নি, শিক্ষার্থীরা কোনো নিয়মিত পরীক্ষায়ও অংশ নেননি। তারা বুয়েটের ভিসির পদত্যাগ, দায়ীদের আজীবন বহিষ্কার, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ও বিচারের দাবিতে সব ধরনের শিক্ষাকার্যক্রম বর্জন করে আসছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকরাও বিক্ষুব্ধ। বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনও ভিসির অপসারণ, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধসহ ৭ দফা দাবি জানিয়েছেন। বুয়েটের বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল ছাত্রদলসহ সব কয়টি ছাত্রসংগঠন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, বাম ধারার সব ছাত্রসংগঠন আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার ও দায়ীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষক মৌন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
গত ৭ অক্টোবর গভীর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই-ট্রিপল ই) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে ফেসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাসকে ইস্যু করে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা হরে। এরই প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরিচালক (পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়) মো: কামাল উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড অপ্রত্যাশিত, ঘৃণিত ও অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। এ ঘটনায় আমরা সবাই মর্মাহত।
তিনি বলেন, আবরার ফাহাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। এটি সবার জন্য উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক। এসব বিষয়ে ইউজিসি খোঁজখবর রাখছে। কিভাবে চলমান সঙ্কট নিরসন করে বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষাবান্ধব ও গবেষণা কেন্দ্রসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ স্থান নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে ইউজিসির পক্ষে কী কী করণীয় তা নিয়ে ভিসিদের সাথে আলাপ আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, সে উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি। অশান্ত পরিবেশে পাঠদান ও গবেষণা কাজ চলতে পারে না। আমরা সব সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শাস্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই।
গতকাল বুয়েট ও ঢাবি ছাড়াও দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে।
গতকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। ছাত্রদল বিক্ষোভ করতে গেলে তাদের প্রথমে বাধা দেয় ছাত্রলীগ। পরে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন। তিনি জানান, সারা দেশের সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। রাজশাহী ও ফরিদপুর জেলায় ছাত্রদল বিক্ষোভ করেছে। তিনি বলেন, আমরা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ছাত্রসংগঠনের সহ-অবস্থান চাই এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশ চাই।
পুরাতন ঢাকায় অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল বুয়েটের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করতে গেলে স্থানীয় ছাত্রলীগ হামলা চালায়। গতকাল সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ছাত্রদলের সহসভাপতি মিজানুর রহমান নাহিদ এবং যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর রহমান শরীফ গুরুতর আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদল সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁঠালতলায় সমবেত হয় এবং সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে থেকে আবরার হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মিছিল বের করে। মিছিলটি অবকাশ ভবনের সামনে এলে পেছন থেকে ছাত্রলীগের কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় জবি ছাত্রদলের সহসভাপতি মিজানুর রহমান নাহিদ ও যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর রহমান শরীফকে মারধর করা হয়।
বিভিন্ন পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের সংবাদদাতারা জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় (জাবি), জগনাথ বিশ^বিদ্যালয় (জবি), গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ^বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল প্রতিবাদ এবং ছাত্রলীগের দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের শিক্ষার্থীরা মিছিল, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বলে আসছি, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। এখানে মুক্তমত স্বাধীন চিন্তার পথ সঙ্কুচিত ও কণ্ঠ রোধ করে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অস্থির পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ঢাবিতে ছাত্রদল প্রবেশ করলেও মধুর ক্যান্টিনে বসতে দিচ্ছে না। টেবিল-চেয়ার দখল করে এ ধরনের অনৈতিক ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনকেও তারা ব্যবহার করছে। এ অবস্থা চলতে পারে না।
ইকবাল হোসেন বলেন, এ দেশের জনগণ ও ছাত্রসমাজ ছাত্রলীগ এবং তাদের সরকারের লাগামহীন আচরণ ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের লাগাম একদিন ঠিকই টেনে ধরবে এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব মত-পথের সহ-অবস্থান নিশ্চিত করবে।