Naya Diganta

আজকের মধ্যে দাবি না মানলে বুয়েট অচল

আবরার হত্যার প্রতিবাদে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সমাবেশ হনয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে ১০ দফা দাবি মানতে আলটিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আজ শুক্রবার বেলা ২টার মধ্যে বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নিজে এসে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলে দাবি না মানলে প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল করে দেয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তারা। এ দিকে ঢাকা-দিল্লির চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে তা বাতিল করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর। অন্য দিকে ভিসির পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবি জানিয়েছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি।
গতকাল বৃহস্পতিবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বুয়েট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেন। এরপর আবরার হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় হত্যাকারীদের বিচার এবং প্রশাসনের কাছে তাদের ১০ দফা দাবির বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ব্যবস্থাগুলো নেয়া উচিত ছিল, তা নেয়া হয়নি। এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়াও গ্রহণ করেনি তারা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১৪ অক্টোবর বুয়েটে যে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর অন্যতম হলো এ পর্যন্ত বুয়েটে যত শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন হয়েছে তার বিচার করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘বাংলাদেশবিরোধী’ দিল্লি চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করায় গত রোববার রাতে বুয়েটের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এই ঘটনায় গত বুধবার প্রশাসনের জবাবদিহিতা, বিগত সময়ের সব নির্যাতনের বিচার, ক্যাম্পাস ও হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও প্রভোস্টকে প্রত্যাহারসহ ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিটি দাবির সাথে সেটি বাস্তবায়নের জন্য তারা আলটিমেটাম দিয়ে দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সেসব দাবির বিষয়ে প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে জানান আন্দোলনকারীরা। তারা বলেন, বুধবার শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে একাত্মতা প্রকাশ করে নানা সিদ্ধান্ত জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তারা বলছেন, হলের প্রভোস্ট পদত্যাগ করেছেন বলে জানানো হলেও কোনো অফিসিয়াল নোটিশ আমরা পাইনি। শুক্রবারের মধ্যে এসব দাবির বিষয়ে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা ভিসি নিজে এসে আমাদের না জানালে, আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।
১০ দফা দাবির ষষ্ঠ দাবিতে ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে বলা আছে উল্লেখ করে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে বলেন, আমরা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ চাই না। আমরা চাই সাংগঠনিক যে রাজনীতি সেটি বন্ধ হোক। গণমাধ্যমে বিভিন্ন টকশোতে যারা কথা বলছেন, তারা যেন এই পার্থক্যের জায়গাটা বুঝে নেন। তারা বলেন, বছরের পর বছর সাংগঠনিক রাজনীতির নামে জোর করে মিছিল মিটিংয়ে নেয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে আমরা সেটি আর এগোতে দিতে চাই না।
ভারতের সাথে অসম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দেবো না : এ দিকে আবরার হত্যার বিচার দাবি, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব অসম চুক্তি বাতিল ও সারা দেশে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংহতি সমাবেশ ও গণপদযাত্রা করেছেন ঢাবির শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে বাম ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে এই পদযাত্রা শুরু হয়। পদযাত্রায় অংশ নেন ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, যখনই কোনো ঘটনায় ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে, তখনই সরকার তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়, যাতে আন্দোলন ব্যাপক না হয়। এসব লোকদেখানো ব্যবস্থা। এসব দেখিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি মায়ের মতো হয়ে বিচার করবেন, এগুলো কথার ফুলঝুরি। ছাত্ররা রাজপথে থাকলে প্রশাসনের টনক নড়ে। ছাত্ররা রাজপথ ছেড়ে দিলে তারা আবার আগের মতো হয়ে যাবে। ভিপি নুর বলেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়; অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ক্যাম্পাসে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাস ও গুণ্ডামি বন্ধ করতে হবে। তিনি আবরারের রক্ত ঝরানো অসম চুক্তি আমরা বাস্তবায়ন হতে দেবো না উল্লেখ করে বলেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে। গণপদযাত্রাটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
ছাত্রলীগের কলুষিত রূপ সারা বিশ্ব দেখেছে : ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের পাশাপাশি কোনো শিক্ষাঙ্গনে আর কোনো ছাত্রকে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করতেই আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। আজকে ছাত্রসমাজ ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করা, আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার ও দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিলের দাবিগুলোতে আজকে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আমরা চাই এই প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গনগুলো এগিয়ে যাক। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডাকসুর ভিপি বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী চেতনাকে ধারণ করে ছাত্রলীগ করেছি। কিন্তু আমি যখন দেখেছি ছাত্রলীগ করলে সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থবিরোধী কাজ করতে হয় তখন আমি ছাত্রলীগ থেকে সরে গেছি। আমাকে বহিষ্কার করা হয়নি। আজকে যে ছাত্রলীগের কলুষিত রূপ বেরিয়ে এসেছে, সেটা সমগ্র জাতি দেখেছে, সারা বিশ্ব দেখেছে।
বুয়েট উপাচার্যের পদত্যাগসহ ৭ সিদ্ধান্ত শিক্ষক সমিতির : অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততার অভিযোগে বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ, বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ, ছাত্ররাজনীতি বন্ধে প্রশাসনের সহায়তাসহ সাতটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়া উপাচার্য যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে সরকার যেন তাকে অপসারণ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সমিতি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে বুয়েটের শহীদ মিনারের পাশে শিক্ষক সমিতি ও অন্য শিক্ষকেরা এ সাত সিদ্ধান্তের কথা জানান। বুধবার শিক্ষক সমিতির এক জরুরি সভায় এই সাত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ। এ সময় ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হাততালি দিয়ে দাবির প্রতি সমর্থন জানান। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে সহমত জানিয়ে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বুয়েট শিক্ষক সমিতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছে।
বুয়েট শিক্ষকদের সভায় গৃহীত সাত সিদ্ধান্ত হলোÑ আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোর দাবি, মামলা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কার করা, আবাসিক হলগুলোতে সব অবৈধ রুম দখলকারীদের বিতাড়িত করে হলের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অতীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন নির্যাতন এবং র্যাগিংয়ের তথ্যগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে সংগ্রহ করে দোষীদের শনাক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, বুয়েটে সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক সংগঠনভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা।
ছাত্রলীগের শোক র্যালি : আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় ঢাবি ক্যাম্পাসে শোক র্যালির আয়োজন করে ছাত্রলীগ। র্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে মল চত্বর, স্মৃতি চিরন্তন চত্বর, টিএসসি হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সেখানে আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, আবরারের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে সেদিকে কড়া নজর দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। তিনি আরো বলেন, ব্যক্তির দায় কখনো সংগঠনের ওপর পড়া উচিত না। কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে যদি কোনো খারাপ কাজ করি, তাহলে সে দায় কিন্তু সংগঠন নেবে না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি আদর্শিক সংগঠন। এখানে কোনো অপরাধীর জায়গা নেই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ অন্যায় করে থাকলে তার দায় তাকেই নিতে হবে।