১৯ জুলাই ২০১৯

হরমুজ প্রণালীতে ব্রিটিশ ট্যাঙ্কার আটকের চেষ্টা ইরানের

জিব্রালটার প্রণালীতে ইরানের তেলবাহী জাহাজের প্রহরায় ব্রিটিশ জাহাজ -ফাইল ছবি -

ওমান ও পারস্য উপসাগরের মাঝামাঝি হরমুজ প্রণালীতে একটি ব্রিটিশ তেল ট্যাঙ্কার প্রতিহতের চেষ্টা করায় এক ইরানি নৌকাকে সরিয়ে দিয়েছে রয়েল নৌবাহিনীর একটি জাহাজ। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগন এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এ খবর নাকচ করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালীর উত্তর দিকের প্রবেশ মুখে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পাঁচটি বোট তেলবাহী জাহাজ ব্রিটিশ হ্যারিটেজকে থামতে বলে, কিন্তু একটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ তাদের সতর্ক করলে তারা সরে পড়ে। ব্রিটিশ রয়েল নেভির কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পেন্টাগন জানায়, ইরানি সেনারা ব্রিটিশ তেল ট্যাঙ্কারকে আটকানোর চেষ্টা করলে রয়েল নেভির পক্ষ থেকে তাদের সতর্ক করা হয়। সেখানে থাকা রাজকীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ওই বোটগুলোর দিকে বন্দুক তাক করে ওয়্যারলেসে তাদের সরে যেতে বলে, এর পর ইরানি বোটগুলো চলে যায়। মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের এমন তৎপরতাকে হয়রানি এবং ওই প্রণালীতে বিঘœ সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে পারস্য উপসাগরে ব্রিটিশ তেল ট্যাঙ্কার আটকের চেষ্টার খবর নাকচ করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। তারা বলেছে, ইরানি বোট তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রিটিশ জাহাজসহ কোনো বিদেশী জাহাজের মুখোমুখি হয়নি ইরানি বোট।
গত বৃহস্পতিবার গ্রেইস-১ নামের একটি ইরানি সুপারট্যাঙ্কার জব্দ করেছে ব্রিটিশ রয়েল নেভি। এ নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে উত্তেজনা চলছে ইরানের। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতেই ইরানি তেল ট্যাঙ্কারটি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আটকে রেখেছে। তবে ব্রিটেনের দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সিরিয়ায় তেল বহন করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে জাবালুত তারিক থেকে ওই ট্যাঙ্কারটি জব্দ করেছে তারা।
ট্যাঙ্কার আটকের ঘটনায় ব্রিটেনকে ‘পরিণতি’ ভোগ করতে হতে পারে বলে বুধবার হুঁশিয়ার করেছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তা ছাড়া এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, তাদের জাহাজ ছেড়ে না দিলে ব্রিটিশ জাহাজ জব্দ করা উচিত। এ ছাড়া ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তারা।
এরপর ইরানের মন্ত্রিসভার এক অধিবেশনে ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, আমি ব্রিটিশদের বলতে চাই যে তোমরাই অনিরাপদ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছ। তোমরা পরবর্তীতে এর পরিণতি বুঝতে পারবে।
অন্যদিকে ইরানের হাতে আটক হওয়ার ভয়ে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি সুপারট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালীতে না ঢুকে সৌদি উপকূলে অবস্থান করছে। ‘ব্রিটিশ হেরিটেজ’ নামে ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের ওই সুপার ট্যাঙ্কারটি গত শনিবার থেকে সৌদি উপকূলে অবস্থান করছে। ইরানের দাবি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন উত্তেজনার সময় প্রণালীটি বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দেয় ইরান।
হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তেল রফতানি করা হয়। এই সমুদ্রপথটি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল যায় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশে। হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে এ দেশগুলো এবং এর বাইরে তেল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গত ৫ নভেম্বর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে জুনে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সই করা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। গত ২২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের তেল বিক্রি একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, মে মাস থেকে ইরানের কাছ থেকে কোনো ক্রেতা কোনো তেল কিনতে পারবে না। মার্কিন সরকার হুমকি দেয়, কোনো দেশ ইরান থেকে তেল কিনলে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে।
এই নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ ইউরেনিয়ামের মজুদ থাকার কথা, তার সীমা অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। ট্রাম্প ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। রণতরী পাঠানোর পাশাপাশি যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে গত মে ও জুন মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী ছয়টি ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র; যদিও তেহরান সব সময় এই অভিযোগ নাকচ করে আসছে। এ বিষয় নিয়ে কথার লড়াই চলতে থাকে দুই পক্ষের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে গত ২০ জুন ইরান জানায়, আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় হরমুজ প্রণালীতে তারা গুলি করে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। পরে বিষয়টি স্বীকারও করে যুক্তরাষ্ট্র। সাথে অভিযোগ করে, এর আগের সপ্তাহেও ইরান মার্কিন একটি ড্রোনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে ছিল।

 


আরো সংবাদ