২০ আগস্ট ২০১৯

কাশ্মির ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ

কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের প্রতিবাদে গতকাল জম্মুতে বিক্ষোভকালে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির ইয়ুথ কংগ্রেসের এক কর্মীকে গ্রেফতার করছে ভারতীয় পুলিশ : এএফপি -

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর দল ন্যাশনাল কনফারেন্স ভারত সরকারের জম্মু-কাশ্মির নীতির বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছে। গত সোমবার সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়। এ ছাড়া ওই অঞ্চলকে ভেঙে দু’টি আলাদা ইউনিয়ন টেরিটোরি করার ঘোষণা দেয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ দাবি করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জমা দিয়েছেন ন্যাশনাল কনফারেন্সের এমপি আকরব লোন ও হাসনাইন মাসুদি।
জম্মু-কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিসহ কয়েক শ’ রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে রাখা হয়েছে। অন্য দিকে জম্মু-কাশ্মির কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সেখানে নিয়মিত সেনাদের পাশাপাশি কমপক্ষে ৫০ হাজার নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করেছে সরকার।
আদালতে জমা দেয়া আবেদনে ন্যাশনাল কনফারেন্স দ্য বলেছে, জম্মু ও কাশ্মিরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে সংবিধানের অধীনে। তাই প্রেসিডেন্ট চাইলেই তা বাতিল করতে পারেন না। তিনি এটা করলে তা সাংবিধানিকভাবে বাতিল হয়ে যায়। কারণ, এ বিষয়ে জম্মু ও কাশ্মির অ্যাসেম্বলির কোনো সম্মতি নেয়া হয়নি।
ওদিকে জম্মু-কাশ্মির ভারতীয় প্রেসিডেন্ট শাসনের অধীনে আসার পর সরকার পরিষ্কার করেছে যে, এখন থেকে জম্মু-কাশ্মিরের অ্যাসেম্বলি থাকবে ভারতের পার্লামেন্টের অধীনে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে পিটিশনে ন্যাশনাল কনফারেন্স বলেছেন, প্রেসিডেন্টই তো কাজ করেছেন মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শে। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে যে পরিবর্তন আসবে তার শিকারে পরিণত হবেন যারা অথবা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মতি ছাড়া এ কাজ করা হয়েছে। একে খেয়ালখুশি মতো কাজ ও আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করা হয়। এতে আরো বলা হয়, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির (রিঅর্গানাইজেশন) অ্যাক্ট, ২০১৯ এর অধীনে এই রাজ্যকে দু’টি ইউনিয়ন টেরিটোরিতে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু এটা সাংবিধানিকভাবে অবৈধ।
কাশ্মির দ্বিখণ্ডিত হবে সরদার প্যাটেলের জন্মদিবসে
এ দিকে ভারতের দ্বিখণ্ডিত জম্মু ও কাশ্মির এবং লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে কার্যকর হবে ৩১ অক্টোবর থেকে। সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৪৪তম জন্মবার্ষিকীর দিন থেকে এটি কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন সরদার প্যাটেল। ভারতের জাতীয়তাবাদী এই নেতাকে ‘লৌহমানব’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
কাশ্মিরে আরো সেনা মোতায়েন করবে ভারত
ঈদুল আজহা উদযাপনকে সামনে রেখে জম্মু-কাশ্মিরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে যাচ্ছে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার। তবে লেহ ও জম্মু এলাকা থেকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে গতকাল শনিবার খুলে দেয়া হয়েছে উপত্যকার সব স্কুল ও কলেজ।
বুকারজয়ী ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় কাশ্মিরকে দেখেন ‘একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকৃত এলাকা’ হিসেবে। সেই ২০১৩ সালে ‘আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলেছিলেন, এখানে কাশ্মিরে রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মিরিদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক।’ ২০১৩ সালের পর আরো পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কাশ্মির সঙ্কটের সমাধানে সেখানে সেনাসংখ্যা আরো বাড়ানো হয়েছে। দমনপীড়নের পথেই হেঁটেছে ভারতীয় বাহিনী। এর সবশেষ সংযোজন হিসেবে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করেছে মোদি সরকার। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্থানে থমকে গেছে কাশ্মিরিদের জীবন। স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে ভারতীয় সার্বভৌম রাষ্ট্রের আওতায় তাদের জীবনের অধিকার আগের থেকেও বেশি করে আটকে পড়েছে রাষ্ট্রীয় সেনানিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহের কারাগারে।
আগামীকাল সোমবার ঈদুল আজহা উদযাপনকে সামনে রেখে উপত্যকায় আরো বেশি করে সেনা মোতায়েন করবে ভারত সরকার। তবুও থামছে না বিক্ষোভ। গত শুক্রবার শ্রীনগরে কমপক্ষে ১০ হাজার বিক্ষোভকারীকে ঠেকাতে টিয়ার গ্যাস ও ছোরার গুলি ছুড়েছে পুলিশ। সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে ভারত সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার পর থেকে নতুন করে নজিরবিহীন ধরপাকড় চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ। চলাফেরায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আটক রাখা হয়েছে কাশ্মিরি নেতাদের। কাশ্মির উপত্যকায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন করে রেখেছে ভারতীয় বাহিনী। ৩৭০ ধারা বাতিলের ১০ দিন আগেই তারা ড্রোন, মানবসম্পদ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করে নিয়েছে।
দিল্লি-লাহোর বাস সার্ভিস বন্ধ
সমঝোতা এক্সপ্রেস এবং ভারতের সাথে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত থর এক্সপ্রেস বাতিলের পর এবার দিল্লিø-লাহোর বাসসেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। ‘দোস্তি’ নামে দিল্লিø থেকে লাহোরগামী ওই বাস সার্ভিস বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন পাকিস্তানের যোগাযোগ ও ডাক পরিষেবামন্ত্রী। এই বাস সার্ভিস ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে তা স্থগিত হয়ে যায়।
পরে ২০০৩ সালের জুলাই মাসে পুনরায় ওই সার্ভিস চালু করা হয়। বুধবার পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের যোগাযোগ ও ডাক পরিষেবামন্ত্রী মুরাদ সাঈদ।
লাহোর-দিল্লি বাস সার্ভিস দিল্লি গেটের নিকটবর্তী আম্বেদকর স্টেডিয়াম টার্মিনাল থেকে চলাচল করে। এই বাসসেবা প্রতি সোম, বুধ ও শুক্রবার এবং পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পিটিডিসি) থেকে প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিবার দিল্লি থেকে লাহোর পর্যন্ত চলাচল করে।
ফেরার সময় পাকিস্তান থেকে ভারতের বাসগুলো প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনিবার লাহোর ছেড়ে ভারতের দিকে রওনা হয়। আবার পাকিস্তানের বাসগুলো প্রতি সোম, বুধ এবং শুক্রবারে দিল্লি থেকে পাকিস্তানে ফিরে যায়।
এর আগে, পাকিস্তানের রেলমন্ত্রী শেখ রশিদ আহমদ শুক্রবার ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে রেলপথে সংযোগ স্থাপনকারী থর এক্সপ্রেসের চলাচল স্থগিত করছে। ওই ট্রেনটি দু’দেশের সাথে রাজস্থান সীমান্তের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করত। থরের শেষ ট্রেনটি শুক্রবার গভীর রাতে ভারতের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গিয়েছিল।


আরো সংবাদ