১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিক্ষোভ সংঘর্ষের মধ্যেই জি-৭ বৈঠকে বিশ্বনেতারা

জলবায়ু, আদিবাসী সুরক্ষা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অন্যান্য ইস্যুতে বিক্ষোভ; সম্মেলনের আলোচ্য তালিকায় নতুন যোগ ব্রেক্সিট ও আমাজন ইস্যু; চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরান ইস্যুতে পশ্চিমা মিত্রদের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক ফাটলের গুঞ্জন
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বিয়ারিটজে জি-৭ সম্মেলন উপলক্ষে সমবেত নেতারা : ইন্টারনেট -

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিরোধ, ব্রেক্সিট, জলবায়ু সঙ্কট, আমাজনের আগুন, এমন সব নানা উত্তপ্ত বিষয় ও বিক্ষোভের মধ্যেই রোববার ফ্রান্সের বিয়ারিটজে জি-৭ সম্মেলনে বৈঠক করেছেন বিশ্ব নেতারা। এত মতভিন্নতা নিয়ে কখনোই শীর্য সম্মেলনে বসেনি জি-৭। সম্মেলন শেষে বিশ্বনেতারা এই সব ইস্যুতে একমত হবেন এমন আশা নিয়েই গত শনিবার উত্তর ফ্রান্সে শুরু হয় এ বছরের সম্মেলন। এ দিকে জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ মতবিনিময়ের দাবি করলেও ইরান, উত্তর কোরিয়া ও চীন ইস্যুতে তার পশ্চিমা মিত্রদের সাথে ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এ দিকে সম্মেলন উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও এর মধ্যেই বিক্ষোভ করেছেন জলবায়ু অধিকার কর্মী, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধীরা। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, এবারের সম্মেলনই হতে পারে রাজনৈতিক একতায় পৌঁছানোর শেষ সুযোগ। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে টাস্ক বলেন, মুক্ত বিশ্ব ও এর নেতাদের জন্য এবারের সম্মেলন এক কঠিন পরীক্ষা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ জানিয়েছেন, এবারের সম্মেলনে তার অন্যতম লক্ষ্য নেতাদের এটা বোঝানো যে, পারস্পরিক উত্তেজনা বিশেষ করে বাণিজ্য সঙ্কট সব দেশের জন্যই ক্ষতিকর।
প্রতি বছরের মতোই এবারও সম্মেলনস্থলের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন প্রতিবাদকারীরা। বিয়ারিটজের পাশের শহর হেনদায়েতে জি-৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও পরিবেশ নীতি পাল্টানোর দাবিতে চলছে বিক্ষোভ। জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি তাদের।
বাণিজ্য সঙ্কটের কেন্দ্রে ট্রাম্প
সম্মেলনে যোগ দিতে বিমানে ওঠার আগে ফ্রান্সকে হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর ডিজিটাল কর বসানোর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ফরাসি মদের ওপর নতুন কর বসানোর হুমকি দেন। টাস্ক দ্রুত পাল্টা জবাবে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার হুমকি বাস্তবায়ন করলে ইইউ পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। শনিবার বিকেলে ট্রাম্প ও তার স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
এ দিকে সম্মেলনের পূর্বে বিভিন্ন কর বাড়ানোয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ চরম রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য সঙ্কটকেই পৃথিবীজুড়ে চলতে থাকা অর্থনৈতিক ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে আবার অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়তে হতে পারে পৃথিবীকে।
আমাজন নিয়ে সরব ম্যাক্রোঁ
আলোচ্যসূচিতে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনে জ্বলতে থাকা দাবানলও বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনেরো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ইইউয়ের সাথে দেশটির বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের হুমকিও দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আগুন থামাতে এবং পুনরায় বনায়নে শুধু আহ্বানই জানাবে না, আমাজোনিয়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে সাথে নিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবো। মাক্রোঁর এই আহ্বানকে সমর্থন জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মরকেলও।
বিক্ষোভ-সংঘর্ষ
জি-৭ সম্মেলন উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও এর মধ্যেই বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা যাতে বিশ্বনেতাদের কাছাকাছি পৌঁছতে না পারে সেজন্য আগেই বিয়ারিটজে ১৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন করে ফ্রান্স। গতকাল রোববার জলবায়ু পরিবর্তন, আদিবাসীদের সুরক্ষা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অন্যান্য ইস্যুতে বিক্ষোভ করে হাজারো মানুষ। তারা জি-৭ নেতাদের প্রতীকী হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভকারী গায়েল গিলস বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে চলছে প্রকট বৈষম্য। আমি এখানে জি-৭ নেতাদের বলতে এসেছি যে, তারা জলবায়ুসহ অন্যান্য ইস্যুতে সঠিক পথ দেখাতে পারছেন না। একজনের ব্যানারে লেখা ছিলো, ‘রাষ্ট্রপ্রধানরা, পদক্ষেপ নিন, অ্যামাজন জ্বলছে।’ আরেকজন নটর ডেমের আগুনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি জলবায়ু ক্যাথেড্রাল হত তবে আমরা ইতোমধ্যেই এটিকে বাঁচাতাম। এলেন মাসানা বলেন, ‘অ্যামাজন জ্বলছে ও গলছে আর্কটিকের বরফ। ‘ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে অন্য দিকে গরিবরা নিঃস্ব।’
৯ হাজারেরও বেশি জি-৭ বিক্ষোভকারী ফ্রান্সের হেনদেই থেকে স্পেনের ইরুন পর্যন্ত মার্চ করে। এটি শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু কিছু স্থানে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বেঁধেছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ ফ্রান্সের সিটি সেন্টারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথ আটকায়। ১ ঘণ্টা বিক্ষোভকারীদের ঠেকিয়ে রাখার পর পুলিশ তাদের ওপর জলকামান ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। কয়েকজনকে আটক করা হলেও পুলিশ নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে গণমাধ্যমগুলো বলছে, ৬৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে শনিবার ফ্রান্সের উরগুনে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়, বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষে আহত হন চার পুলিশ।


আরো সংবাদ