১৯ অক্টোবর ২০১৯

সৌদির তেলক্ষেত্রে সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধের ঘোষণা হাউছিদের

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেলক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত আরামকোয় মেরামতের কাজ করছেন শ্রমিকরা হইন্টারনেট -

সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো হামলা থেকে রক্ষার জন্য সেখানে সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবের তেল শিল্পক্ষেত্রে গত সপ্তাহের হামলার পর দেশটিতে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। গত শুক্রবার এক ঘোষণায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার উপসাগরে নতুন করে সৈন্য পাঠানোর এ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেছেন, সৈন্য মোতায়েনের এ ধরন হবে ‘প্রতিরক্ষামূলক’। তবে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে সৌদি আরবে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে। তবে কত সেনা পাঠানো হবে, তা নিশ্চিত করেননি তিনি। গত শনিবার সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হামলা চালানো হয়। আরামকোর সবচেয়ে বড় তেল পরিশোধনাগার আবকায়িক ও খুরাইস এলাকায় এ হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা। তবে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি ও গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানই ওই হামলার জন্য দায়ী। সৌদি আরবও হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। যদিও তেহরান ওই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, ‘ইয়েমেনের জনগণ তাদের প্রতিরক্ষামূলক বৈধ অধিকার প্রয়োগ করছে।’
গত শুক্রবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ মাত্রার’ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তিনি সামরিক সংঘাত এ ড়াতে চান বলে আভাস দিয়েছেন। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, শক্তিশালী মানুষের প্রকাশভঙ্গি এবং যেসব জিনিস শক্তিমত্তা প্রকাশ করে, তা কিছুটা সংযমের সাথে দেখানো যায়।’ ট্রাম্প জানান, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে কেন্দ্র করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আসবে। সৌদি আরবে হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সব ধরনের বিকল্প আছেÑ এমনটা বলার পর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়ে তিনি সামরিক পদক্ষেপ এ ড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের। নতুন এ নিষেধাজ্ঞার নজর ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সার্বভৌম অর্থ তহবিলের ওপর থাকছে বলেও ট্রাম্প জানিয়েছেন।
সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মার্ক এসপার বলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ সহায়তা চেয়েছে। মার্কিন সেনারা ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ পথে হামলাগুলোর দিকে নজর রাখবেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে উপস্থিত জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ড জুনিয়র জানান, সেনা মোতায়েন হবে ‘মাঝারি’ ধরনের। এ সংখ্যা হাজারের বেশি হবে না। এ দিকে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর খবর অনুসারে, সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, ইরানে সামরিক হামলার বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন।
হাউছি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জনবহুল এলাকাগুলোতে একের পর এক রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধে লিপ্ত। ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেন-যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাউছি বিদ্রোহীদের কারণে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব।
ইরান সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার পর ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ নিয়ে এ বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক চরম আকার ধারণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জুন ও জুলাই মাসে উপসাগরীয় এলাকায় দু‘টি তেল ট্যাংকারে হামলা চালানোর ঘটনার পেছনে ইরানের হাত রয়েছে। তবে দু’টি অভিযোগই অস্বীকার করেছে ইরান।
হামলা বন্ধের ঘোষণা হাউছিদের
এ দিকে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ করা হবে জানিয়েছেন ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের এক কর্মকর্তা। সতর্ক করে দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, চলমান যুদ্ধের পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। গত শুক্রবার রাতে হাউছিদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কাউন্সিলের প্রধান মাহদি আল মাসাত এই ঘোষণা দিয়েছেন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর দু‘টি বৃহৎ তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই হামলার পর সৌদি আরবের তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী হাউছি বিদ্রোহীরা এ হামলার দায় স্বীকার করলেও এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রের তরফে স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে হামলার নেপথ্যে ইরান জড়িত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তেহরান। এই ঘটনার জেরে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে আরো সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত শুক্রবার হাউছি বিদ্রোহীদের পরিচালিত আল মাসিরাহ টেলিভিশনে বিদ্রোহী নেতা মাহদি আল মাসাত বলেন, সৌদি অঞ্চলে সামরিক ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্য সব ধরণের অস্ত্র নিয়ে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছি। আর তাদের দিক থেকেও একই ধরণের পদক্ষেপের অপেক্ষা করছি। এই হাউছি নেতা বলেন, তারা (সৌদি আরব) এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে ব্যর্থ হলে প্রত্যাঘাতের অধিকার আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধ কোনো পক্ষই লাভবান হবে না।
ইয়েমেনে যুদ্ধে লিপ্ত বিভিন্ন পক্ষকে সত্যিকার আলোচনায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে হাউছি নেতা আল মাসাত বলেন, এই আলোচনা কাউকে বাদ না দিয়ে বিস্তৃৃত জাতীয় পুনর্গঠনকে ত্বরান্বি^ত করবে। তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধের বড় লক্ষ্য হবে ইয়েমেনিদের রক্ত রক্ষা করা আর সাধারণ দায়মুক্তি অর্জন।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদিকে উচ্ছেদ করে রাজধানী সানা দখলে নেয় ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী হাউছি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পালিয়ে যান হাদি। ২০১৫ সালের মার্চে হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ‘অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। সৌদি জোটের অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে কোটি কোটি মানুষ। হাউছি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ঘোষণা বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

 


আরো সংবাদ