২৩ অক্টোবর ২০১৯

সিরিয়ায় কুর্দি বাহিনীর বিরুদ্ধে তুরস্কের সামরিক অভিযান শুরু

সিরিয়ার সীমান্তবর্তী সানিলিউরফা প্রদেশের আক্কাকালের কাছে অবস্থান করছে তুরস্কের সেনাবহর। ইতোমধ্যেই তারা সিরিয়ায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে : এএফপি -

সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কুর্দি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়ার পরপরই এই অভিযান শুরু হলো। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান গতকাল বুধবার এক টুইটে এই অভিযানটির কথা নিশ্চিত করেন।
স্থানীয় অধিকারকর্মী ও কুর্দি যোদ্ধারা জানান, সেখানে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অঞ্চলটি থেকে কুর্দি মিলিশিয়ামুক্ত করার কথা জানিয়েছেন এরদোগান। তিনি বলেছেন, সেখান থেকে কুর্দি মিলিশিয়াদের দূর করে সেটিকে ‘মুক্ত অঞ্চল’ করতে এই অভিযান শুরু করা হয়েছে। কুর্দি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) জানিয়েছে, তুর্কি যুদ্ধবিমানের হামলার শিকার হয়েছে বেসামরিকরাও।
এ দিকে, পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে গত সপ্তাহে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে এক ফোনালাপ শেষে এই ঘোষণা দেন তিনি। এর জন্য ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। জবাবে তিনি তুরস্ককে হুমকি দিয়ে বলেছেন, হামলা অভিযানে সীমা ছাড়ালে তুরস্কের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেয়া হবে।
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রবাহিনী হচ্ছে কুর্দি মিলিশিয়ারা। সেখানে কয়েক হাজার আইএস সদস্য ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কারাগার দেখাশোনা করে থাকে কুর্দিরা। অঞ্চলটির অনেকাংশের নিয়ন্ত্রণই তাদের দখলে। সেখানে তুরস্কের অভিযান আইএসের বন্দী অবস্থার নিশ্চয়তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে বলে সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এরদোগান বুধবার এক টুইটে লিখেন, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি যাতে সন্ত্রাসবাদের করিডোরে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালু করা হয়েছে। সিরিয়ার ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা রক্ষা করতে ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করাও এই অভিযানের লক্ষ্য। এ ছাড়া, সেখানে তুরস্কে অবস্থানরত ৩৬ লাখ সিরীয়র বাসস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।
উল্লেখ্য, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কুর্দিশ পিপলস প্রটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি)। দলটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে তুরস্ক। তুরস্কের সাম্প্রতিক এই অভিযান নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও অন্যান্য বিশ্ব শক্তিগুলো।
আগেই জানা গিয়েছিল, সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এলাকা থেকে কুর্দি ওয়াইপিজি গেরিলাদের সরিয়ে দিতে দেশটির ভেতর প্রবেশ শুরু করেছে তুরস্কের সেনাবাহিনী। বুধবার ভোরের দিকে সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী দলগুলো তাল আবায়েদ ও রাস আল-আইন শহরের দু’টি পয়েন্ট দিয়ে সিরিয়ায় ঢুকে বলে তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তথ্য দেয়া ওই কর্মকর্তা এর বাইরে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াইপিজি মার্কিন বাহিনীর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এভাবে সেনা সরিয়ে নিয়ে ট্রাম্প মিত্রদের ‘পেছন থেকে ছুরি মেরেছেন’ বলে তারা এখন অভিযোগও করছেন। কুর্দিদের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়ার পদক্ষেপ দেশে-বিদেশে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন রিপাবলিকান দলের অনেক প্রভাবশালী সদস্যও ট্রাম্পকে তার সিদ্ধান্ত বদলাতে অনুরোধ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকার কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘সীমা ছাড়ালে’ তিনি তুরস্কের অর্থনীতিকে গুঁড়িয়ে দেবেন। পেন্টাগনও পরে এক বিবৃতিতে তুরস্কের অভিযানে ‘সমর্থন দেয়া হবে না’ বলে জানায়। সিরিয়ায় তুর্কি বাহিনীর প্রবেশ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কুর্দি গেরিলাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার গেরিলাদের এক কমান্ডার নিজেদের জনগণকে রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কুর্দি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার মজলুম আবদি দেশটির উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের সম্ভাব্য অভিযান প্রতিহত করার লক্ষ্যে দামেস্কের সাথে জোট গড়ার আভাস দিয়েছেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টায় তৎপর এই কুর্দি গেরিলাদেরকে এত দিন আমেরিকা পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছিল।
এ সম্পর্কে কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠী ওয়াইপিজির কমান্ডার আবদি বলেন, সম্ভাব্য তুর্কি হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে অনেকগুলো পথ খোলা রেখেছে তার বাহিনী, এর একটি পথ হচ্ছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের সাথে সহযোগিতা করা।
এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে হামলায় বাড়াবাড়ি না করতে সতর্ক করার জবাবে তুরস্ক মঙ্গলবার বলেছে যে তুরস্কের সেনারা অভিযানে এগিয়ে যাবে এবং সিরিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটনের কোনো হুমকির সামনে মাথা নত করবে না।
ট্রাম্প তুরস্ককে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মাত্রা অতিক্রম করলে তুরস্কের অর্থনীতিকে তিনি ধ্বংস ও বিলুপ্ত করে দিতে পারেন। তুরস্কের অর্থনীতি একবারে ধসিয়ে দিতে পারেন। এক টুইটে তিনি বলেন, তুরস্কের এমন কিছু করা উচিত না যেটাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অমানবিক মনে হয়। যদি কোনো মানুষ কষ্ট পায় তাহলে তুরস্ককে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
অথচ এই সপ্তাহের শুরুর দিকে রোববার সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আকস্মিক ঘোষণা দেন তিনি। বলেন, তুরস্কের উত্তরাঞ্চলে তুরস্ক অভিযান চালালে তারা অভিযানে অংশ নেবে না। সিরিয়াতে চলমান ‘চূড়ান্ত বিরক্তিকর অবিরাম’ এই যুদ্ধের সাথে আমেরিকা আর জড়িত থাকবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রচার প্রচারণায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে সেনা প্রত্যাহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে সর্বশেষ উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কিছু অংশ থেকে মার্কিন সেনাদের ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন। রিপাবলিকান সমালোচক ও অন্যান্যরা বলেছিলেন যে তিনি আমেরিকার মিত্র সিরিয়ান কুর্দিদের পরিত্যাগ করছেন এবং আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ করছেন।
আঙ্কারায় তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াত ওকতাই বলেছেন, তুরস্কের লক্ষ্য হলো সিরিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে কুর্দি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং তুরস্কে বসবাসরত ৩৬ লাখ সিরীয়র মধ্যে ২৬ লাখ শরণার্থীর জন্য একটি নিরাপদ এলাকা গড়ে তোলা। এখানে তুরস্কের নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। আমরা নিজের পথ নিজেরাই নির্ধারণ করি তবে আমরা আমাদের নিজস্ব সীমা সম্পর্কে সচেতন।
ইস্তাম্বুল সিরিয়া সীমান্তে আরো সাঁজোয়া যান পাঠিয়েছে। তুরস্কের সানলিউরফা প্রদেশের আক্কাকালি শহরে বিশাল সামরিক বাহিনীর গাড়িবহর দেখা গেছে। সীমান্তের আশপাশে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ দিকে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) জানায়, তুর্কি বাহিনী সীমান্ত বরাবর হামলা চালাচ্ছে। প্রধান সীমান্ত শহর রাস আল-আইনের কথা উল্লেখ করে মঙ্গলবার রাতে দেয়া এক টুইটার বার্তায় এসডিএফ বলেছে, ‘তুর্কি বাহিনী তুরস্ক সীমান্তের সারিকানিয়ায় আমাদের বিভিন্ন অবস্থানের একটি লক্ষ্য করে গোলা বর্ষণ করছে।’


আরো সংবাদ