১৭ নভেম্বর ২০১৯

নিজ গ্রামে যেতে পারছেন না ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা

রাখাইনে বিদ্রোহীদের হাতে ৩১ বাসযাত্রী অপহৃত
-

এখনো নিজেদের গ্রামে যেতে পারছেন না নিজের ইচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া ৩০০ রোহিঙ্গা। তারা বিভিন্ন সময় রাখাইনে ফিরে গেছেন। কিন্তু এখনো সেখানে বসবাসের পরিবেশ তৈরি হয়নি। নিজের প্রকৃত গ্রামেও তাদের যেতে দিচ্ছে না সরকার।
তবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ দিন রাখাইন রাজ্যে বসবাস করলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে মিয়ানমার। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান জোরালো করলে জনগোষ্ঠীটির সাত লাখেরও বেশি সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এ ছাড়াও জনগোষ্ঠীটির অনেক সদস্য নিরাপত্তার আশায় পাচারকারীদের সহায়তায় সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর চেষ্টা করে থাকে। ইনু নামের এক রোহিঙ্গা জানান, তিনি ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বালুখালি ক্যাম্প ত্যাগ করে মিয়ানমার যান। কিন্তু রাখাইনে গেলেও নিজ গ্রামে যেতে পারছেন না তিনি। বহু কষ্টে পাঁচ সদস্যের পরিবারের জন্য খাবার সংগ্রহ করে যাচ্ছেন।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার। বরং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কোনো অগ্রগতি না হওয়ার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়ও অস্বীকার করে আসছেন তিনি। এমন বাস্তবতায় গত আগস্টে মিয়ানমার সরকার বলেছিল যে, তারা তিন হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গাকে ফিরে আসার ব্যাপারে সম্মত। ওই সময় কেউ ফিরে আসেনি। তবে সম্প্রতি ফিরে যাওয়া ২৬ ব্যক্তির কেউ প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী সেখানে যায়নি।
দুই দেশের কর্মকর্তারাই বলছেন যে তারা রোহিঙ্গাদেরকে তাদের ইচ্ছার ব্যাপারে অবগত করেছেন। তবে ইনু বলেন, ‘আমাদের কেউ জিজ্ঞাসা করেনি যে আমরা মিয়ানমারে ফিরতে চাই না। প্রত্যাবাসন নিয়ে কেউ কথা বলছে না।’
ইনু বলেন, তিনি কিচং গ্রামের প্রশাসনকের সাথে কথা বলেছেন। তার সাথে কথা বলেই প্রত্যাবাসন শিবির দিয়ে ফিরে আসেন তারা। তার দাবি, প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। নিজে ব্যবস্থা করে ফিরেছেন তিনি।
ইনু ও তার পরিবারে অস্থায়ী শিবিরে ছিলেন না। ফেরার দিনই তাদের মংডুতে নিয়ে গেছে রাখাইন সরকার। কিন্তু তারা নিজ গ্রাম কিচংয়ে ফিরে যেতে চান। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ সেখানে কোনো রোহিঙ্গা থাকে না।
মাহমুদ শারি নামে আরেক রোহিঙ্গা গত বছর মিয়ানমারে ফিরে যায় বলে জানিয়েছে রেডিও ফ্রি এশিয়া। তার দাবি, তাকেও প্রত্যাবাসন নিয়ে কিছু জানানো হয়নি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ২৬, ২৭ ও ২৮ নম্বর ক্যাম্পের শরণার্থীরাই শুধু প্রত্যাবাসন ক্তির ব্যাপারে জানে। কয়েকজন ফিরে আসতে চায় আর কয়েকজন চায় না। তবে যারা গ্রামে ফিরতে চাইছে তাদেরকে ফিরতে দিচ্ছে না মিয়ানমার। মংডুর পান্তাপিন গ্রামে প্রশাসক আনোয়ার দাবি করে, রাখাইনে তার গ্রামে কয়েকজন রোহিঙ্গা ফিরে এসেছেন এবং বাসা ভাড়া করে থাকছেন। তিনি বলেন, ‘গত দুই মাসে কয়েকজন রোহিঙ্গা ফিরে এসেছে। সরকার ১১ জনকে খাবার দিয়েছে। তিনি বলেন, কয়েকজন থাংকি গ্রামের ও কয়েকজন অন্য জায়গার। তাদের এখনো কিছু আত্মীয় এখানে থেকে গেছে, তাই এখানেই বসবাস করতে চাইছে তারা। বুথিডং ও মংডুতে থাকা রোহিঙ্গারা বলেন, তারা এখনো জাতিগত নিধনযজ্ঞের আশঙ্কায় রয়েছেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন মিয়ানমারে এখন সেটা সম্ভব না। সিতেতে বাস করা এক রোহিঙ্গা বলেন, আমাদের নির্মূলের জন্য হত্যা করতে হবে না। বরং তারা আমাদের এমন এক জীবনে ঠেলে দিয়েছে যেখানে জীবন বলে কিছু নেই আমাদের।
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইনের গ্রামীণ এলাকায় একটি বাস থামিয়ে ৩১ যাত্রীকে অপহরণ করেছে দেশটির জাতিগত বিদ্রোহীরা। অপহৃতদের বেশির ভাগই ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও নির্মাণশ্রমিক। রোববার রাখাইনের রাজধানী সিত্বইগামী একটি বাস থেকে তাদের অপহরণ করা হয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ওই এলাকার বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার জানিয়েছে, রাজধানী সিত্বাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি বাসকে পতাকা উড়িয়ে থামায় নাগরিক পোশাকে সজ্জিত এক ব্যক্তি। আর তার পেছনে জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল খেলাধুলার পোশাক পরা ১৮ বিদ্রোহী। বন্দুক তাক করে যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে নেয় বিদ্রোহীরা।
কর্নেল উইন জ্য উও জানিয়েছেন, ‘আমরা এখনো তাদের অনুসরণ করছি। হয়তো ভুল করে সেনাবাহিনীর সদস্য ভেবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ধরে নিয়েছে তারা।’
রাখাইনের জাতিগত বৌদ্ধদের অধিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে লড়ছে আরাকান আর্মি। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরাকান আর্মিতে যোগ দিয়েছে হাজারো তরুণ। গত বছরের শেষ দিক থেকে নতুন করে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা জোরালো করে গোষ্ঠীটি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে চারটি পুলিশ পোস্টে একযোগে হামলা চালিয়ে ১৩ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে তারা। এই ঘটনার পর আরাকান আর্মির অবস্থানের ওপর হামলা জোরালো করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সহিংসতার কারণে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে রাখাইনের বেশ কয়েক হাজার বাসিন্দা। সর্বশেষ ওই ৩১ জনকে অপহরণের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সেখানে ওই বিদ্রোহীদের দমনে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী সাধারণ নাগরিকদেরকে অপহরণ করে তাদের ওপর নির্যাতন করে।


আরো সংবাদ