২৩ নভেম্বর ২০১৯

  পূর্ব জার্মানিতে ইসলামভীতি ও বিদেশিভীতিতে হুমকির মুখে জাতীয় নিরাপত্তা

-

জার্মানি এই সপ্তাহে বার্লিন প্রাচীরের পতনের ৩০তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে। তবে বিশেষত পূর্ববর্তী কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব জার্মানিতে ক্রমবর্ধমান বিদেশীদের সম্বন্ধে অহেতুক ভয় এবং ইসলামভীতি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার তিন দশক পরেও জার্মান সরকার দেশটির পূর্ব অংশে ডানপন্থী আদর্শের উত্থানের সাথে লড়াই করছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হলো ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের উত্থান, যেটি ২০১৭ সালে বুন্ডেস্টাগ বা পার্লামেন্টে উল্লেখযোগ্য আসন লাভ করেছিল; পূর্ব জার্মানি অঞ্চলে এটিই এখন সর্বাধিক জনপ্রিয় পার্টি। প্রকৃতপক্ষে জার্মানে ইসলামোফোবিয়া ও জেনোফোবিয়ার ফলে অভূতপূর্বভাবে উত্থান ঘটেছে এএফডির। জার্মানের ঐক্যসংক্রান্ত বার্ষিক রাষ্ট্রীয় রিপোর্টে জার্মান সরকার সতর্ক করেছে যে পূর্ব জার্মানিতে বিদেশী লোক বা বিদেশী কোনো কিছু সম্বন্ধে ভয় সামাজিক সম্প্রীতির জন্য একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিকেই উপস্থাপন করে। পূর্ব জার্মানিতে শরণার্থী কেন্দ্র এবং ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর ওপর বারবার আক্রমণ ও হামলা এটাই প্রমাণ করে যে, এই বিদেশাতঙ্ক সহিংসতার ঘটনাগুলো জার্মানির জাতীয় সুরক্ষার জন্য মারাত্মক বিপদ। পূর্ব জার্মানি-ভিত্তিক নিও-নাজি সন্ত্রাসী সেল ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড (এনএসইউ) ২০০০-২০০৭ সালে বিদেশী নাগরিকদের হত্যায় জড়িত ছিল।
গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা সম্পর্কে সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুসারে জার্মানের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ইসলাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেকের ইসলামের প্রতি নেতিবাচক অনুভূতির পেছনের কারণ কী? যদিও জার্মানদের সাধারণত সহনশীল জাতি হিসেবে দেখা হয়; তবুও মুসলমানদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। বার্টেলসম্যান স্টিফটংয়ের ‘ধর্ম পর্যবেক্ষণ’ দ্বারা প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় এই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তার গবেষণা অনুসারে, বেশির ভাগ জার্মান নাগরিক তথা ৮৭ শতাংশই অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতামত প্রকাশের ব্যাপারে সাধারণত উদার। তবে এদের ৫২ শতাংশই ইসলাম ধর্মকে হুমকিস্বরূপ বলে মনে করে। জার্মানে পশ্চিমাঞ্চলের তুলনায় পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বসবাসকারী নাগরিকদের এই ধরনের মনোভাব বেশি দেখা যায়। ধর্মকেই হুমকি হিসেবে দেখছে এমন লোকের সংখ্যা পশ্চিম জার্মানিতে শতকরা ৫০ ভাগ আর পূর্ব জার্মানিতে শতকরা ৫৭ ভাগ; অর্থাৎ দেশের পশ্চিমাঞ্চলের তুলনায় পূর্বাঞ্চলে ধর্মবিদ্বেষ বেশি।
ফাউন্ডেশনের ধর্ম বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন আল-মনোয়ার বলেছেন, ‘স্পষ্টতই অনেক লোক ইসলামকে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে ধর্ম হিসেবে কম দেখেন এবং তাই এটিকে ধর্মীয় সহনশীলতা থেকে বাদ দেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক বিতর্ক এবং মিডিয়ার রিপোর্টগুলো প্রায়ই ইসলামকে একটি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছিল, যা এই ধরনের মনোভাব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। উদ্বেগের কারণ রয়েছে, কারণ ইসলাম সম্পর্কে এই ভীতি ডানপন্থী দলগুলো কৌশলে কাজে লাগাতে পারে।
‘ওয়েল্টানসচৌলিচি ভায়েলফাল্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি’র (ওয়ার্ল্ড ভিউ ডাইভারসিটি অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি) সমীক্ষা অনুসারে, পূর্ব জার্মানির উত্তরদাতাদের শতকরা ৩০ ভাগ এবং পশ্চিম জার্মানির উত্তরদাতাদের শতকরা ১৬ ভাগ মুসলমানদের প্রতিবেশী হিসেবে চায় না। অথচ ফ্রান্সের পরে ৮১ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার দেশ জার্মানিই পশ্চিম ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। দেশটির প্রায় ৪৭ লাখ মুসলমানের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ লাখই তুর্কি বংশোদ্ভূত।
ড্রেসডেন-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ওয়ার্নার প্যাটজেল্টের মতে, ‘২০১৬ সালে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেলের সীমান্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্তের পর শরণার্থী সঙ্কট সবচেয়ে বেড়ে যাওয়ার পেছনে মুসলমানদের নিয়ে উদ্বেগের কারণটিই খুঁজে পাওয়া যায়। সামগ্রিকভাবে এটি ২০১৫ সালে চ্যান্সেলর মারকেলের অভিবাসন রাজনীতির কারণেই ঘটেছিল। জার্মানিতে বেশ কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য সমস্যা ছাড়াই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম সংখ্যালঘুরা বসবাস করে আসছে, এসব সংখ্যালঘুর বেশির ভাগই তুর্কি। এটি একটি সাধারণ বিষয় হিসেবেই দেখা হয়েছে এবং এতে উদ্বেগের কিছু নেই।’


আরো সংবাদ