১২ ডিসেম্বর ২০১৯

আসামে এনআরসি বাতিলের ইঙ্গিত অমিত শাহের

ফের এনআরসি মানবে না ‘আমসু’
-

গোটা ভারতেই নাগরিকপঞ্জি হবে জানিয়ে আসামের এখনকার তালিকা বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গত বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় তিনি এ কথা জানান। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মাও একই কথা বলেছেন।
অমিত শাহ জানান, গোটা দেশের সাথেই আসামে নতুন করে এনআরসি হবে। যার সূত্র ধরে আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মাও জানান, রাজ্যে হওয়া এনআরসি পুরোপুরি বাতিল করে সারা দেশের সাথে আসামেও নতুন করে এনআরসি হোক।
সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে আসামে হওয়া এনআরসিরর চূড়ান্ত তালিকায় বাদ যান ১৯ লাখ মানুষ। যাদের মধ্যে অন্তত ১৩-১৪ লাখই হিন্দু। তালিকা প্রকাশ হতেই অস্বস্তিতে পড়ে যায় শাসক দল বিজেপি। ওই এনআরসি সঠিক নয় সেই যুক্তিতে তৎপর হন হিমন্তরা। এনআরসিতে বেশির ভাগ হিন্দুদের নাম বাদ পড়ায় ভোট ব্যাংকে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে শীর্ষ নেতৃত্বকে জানায় আসাম বিজেপিও। চাপ বাড়াচ্ছিল সঙ্ঘ পরিবারও। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবারই আসামে নতুন করে এনআরসি হবে বলে বিতর্ক সৃষ্টি করেন অমিত।
সরকারের ওই সিদ্ধান্তকে অবশ্য স্বাগত জানিয়েছে এনআরসি মামলার মূল আবেদনকারী আসাম পাবলিক ওয়ার্কসও। তাদের দাবি ছিল সব তথ্য ফের যাচাই করা হোক। এই মামলার পরের শুনানি ২৬ নভেম্বর। সংগঠনের সভাপতি অভিজিৎ শর্মা বলেন, ‘১৬০০ কোটি টাকা খরচের সম্পূর্ণ অডিটও হোক।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, আসামে এনআরসি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। আসাম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে এনআরসি তৈরির ভিত্তিবর্ষ বলে ধরা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে দেশের সব রাজ্যে যখন এনআরসির কাজ শুরু হবে তখন অতীতের একটি নির্দিষ্ট দিনকে ধরে তার ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হবে। কোন বছরের কোন তারিখের ভিত্তিতে ওই কাজ শুরু হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। তবে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ ভিত্তিবর্ষ হচ্ছে না। তাই মন্ত্রণালয়ের যুক্তিÑ এক দেশে দু’টি ভিত্তিবর্ষ হতে পারে না। তাই গোটা দেশে যে ভিত্তিবর্ষ ধরা হবে, সেটির হিসাবে আসামেও নতুন তালিকা তৈরি করা হবে।
বিরোধীদের মতে, এনআরসিতে হিন্দুরা বাদ যাচ্ছে বলে যে প্রচার শুরু হয়েছে তা আটকাতেই ১,৬০০ কোটি রুপি জলাঞ্জলি দিতে চান মোদি সরকার। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে করা তালিকা এভাবে বাতিল করা কি শীর্ষ আদালতের অবমাননা নয়? মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু তার পরে কী হবে তা নিয়ে কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি। আইনের সেই ফাঁক দেখিয়ে এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে হওয়া এনআরসি কার্যত বাতিল করতে চাইছে সরকার।
কংগ্রেস মুখপাত্র অভিজিৎ মজুমদারের মতে, ‘নোট বাতিল, জিএসটির পরে এনআরসি বাতিল বিজেপির খামখেয়ালিপূর্ণ শাসনের আরো এক নজির। ১৬০০ কোটি রুপি খরচ হলো, কোটি কোটি মানুষ হয়রান হলেন, বহু আত্মঘাতী হলেন। সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবে? এনআরসি বাতিল অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা।’ বহ্মপুত্র উপত্যকা নাগরিক সমাজের উপদেষ্টা হাফিজ রশিদ চৌধুরীর মতে, রাজনৈতিক দলের একাংশ চেয়েছিল বেশি করে মুসলিমের নাম বাদ পড়ুক। উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়াতেই হয়তো এনআরসি বাতিল করার কথা বলা হচ্ছে।
এ দিকে আসামে ফের এনআরসি করা হলে তা মেনে নেয়া হবে না বলে জানিয়েছে অল আসাম মাইনরিটি সুটেডেন্টস ইউনিয়ন বা ‘আমসু’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলেন ‘আমসু’ উপদেষ্টা আজিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা অমিত শাহের সিদ্ধান্ত মানি না। আমাদের আপত্তির পরেও সরকার ফের এনআরসি প্রস্তুতের পথে এগোলে আমরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবো।’
এ ব্যাপারে রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ‘আমসু’ উপদেষ্টা আজিজুর রহমান বলেন, ‘অমিত শাহ এনআরসি সম্পর্কে পার্লামেন্টে যে বিবৃতি দিয়েছেন, গোটা ভারতে তারা এনআরসি প্রকাশ করবে সে সম্পর্কে আমাদের বলার কিছুই নেই। কিন্তু তিনি আসামে আবার এনআরসি করার যে কথা বলছেন, সেক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি আছে। যেহেতু ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় এনআরসির কাজ চলছিল এবং আসাম রাজ্যের সহযোগিতায় এনআরসির কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পথে রয়েছে। সেজন্য পুনরায় এনআরসির কাজ শুরু হলে লোকজনকে আবার দুর্ভোগ পোহাতে হবে। আমরা লোকজনকে দুর্ভোগের মুখে ফেলার পক্ষপাতি নই। যেহেতু এখানে একটা পদ্ধতিতে এনআরসি হয়ে গেছে, সেজন্য আবার এখানে এনআরসি করার কোনো প্রশ্নই আসে না। নতুন করে আবার এখানে এনআরসি করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’
তেমনি আসাম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রিপুন বরা বলেছেন, গত ৩১ আগস্ট যে এনআরসি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটা বাতিল করে যদি নতুন করে এনআরসি করা হয় তাহলে সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া হবে। আসামের বিরোধী নেতা ও কংগ্রেসের বিধায়ক দেবব্রত শইকিয়া বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার দেশের সাথে রাজ্যে নতুন করে এনআরসি নবায়ন করতে চাওয়ার পেছনে একটা গূঢ় উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তার মতে, প্রথমত কেন্দ্রীয় সরকার চাচ্ছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের কোনো রকম তদারকি ছাড়া এনআরসি নবায়ন’ করতে। এমনটা হলে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশকিছু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকের নাম ছেঁটে দেয়া’ এবং ‘ভাষিক সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের একাংশের অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর নাম এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হবে।’ বিজেপি ধর্মীয় লাইনে এনআরসিকে মেরুকরণ করার চেষ্টা করছে বলেও দেবব্রত শইকিয়া মন্তব্য করেছেন।


আরো সংবাদ