১৫ অক্টোবর ২০১৮

সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের জন্য চাপ

জাতীয় প্রয়োজনেই যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্যজোট - ছবি : সংগৃহীত

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতি সন্নিকটে। দশম জাতীয় সংসদ একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফসল। ভোটারবিহীন অবৈধ ক্ষমতাসীন সংসদকে রেখেই ক্ষমতাসীনরা এই সরকারের অধীনেই সংবিধানের কথা বলে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন। সংবিধানে তো মানবাধিকারে কথা আছে, ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা আছে, সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশে সবার ভোটাধিকারের কথা আছে এবং অপরাধীকে আটক করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির করে তার বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিতে হবে উল্লেখ আছে।

সংবিধানে জনগণের কণ্ঠকে বাধা প্রদানের কথা নেই, বিনা বিচারে গুম-হত্যা করার অধিকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেই, সংবিধানে মত প্রকাশের, স্বাধীনভাবে দাবি আদায়ের, জনসভা, প্রতিবাদ করার অধিকারের গ্যারান্টি দেয়া আছে। বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের শাসনামলে এগুলোকে ভূলুণ্ঠিত ও শতভাগ উপেক্ষা করে সংসদ নির্বাচন সংবিধান মোতাবেক তাদের সরকারের অধীনে হতে হবে- জনগণের কাছে এ যুক্তি তুলে ধরছেন। এক দুরভিসন্ধির বেড়াজালে দেশকে তামাশার পাত্র করে ফেলেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে ফুলবেঞ্চে সাতজন বিচারপতির ষোড়শ সংশোধনী রায়ের মাধ্যমে বর্তমানে সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত বৈধ নয় উল্লেখের ষোড়শ সংসদীয় রায় তো বিদ্যমান আছে। ওই ষোড়শ সংশোধনী রায় আরেকটি ফুলবেঞ্চের মাধ্যমে স্থগিত সংশোধনী আনা হয়নি। শুধু রিভিউ দায়ের করলেই হবে না। সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ষোড়শ সংশোধনী রায় আইনত ও নীতিগতভাবে মেনে নিতে সরকার বাধ্য। অর্থাৎ ভোটারবিহীন ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত অগ্রহণযোগ্য অবৈধ সংসদ ভেঙে দিতে হবে।

কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তা মানছেন না। দশম জাতীয় সংসদের মতো একতরফা ভোটারবিহীন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার পরিকল্পনায় হাঁটছে সরকার। দেশ থেকে গণতন্ত্র উধাও সঙ্কটই রাজনৈতিক বড় সঙ্কট। ক্ষমতাসীনরা বিগত ১০ বছরে পরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্রকে দেশ থেকে নির্বাসন দিয়েছেন। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ দেশনেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন এবং ২০ দলীয় জোট নেতা খালেদা জিয়া দেশকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতেই ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করেও গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের অধিকার উদ্ধার করতে পারেননি। গণতন্ত্রের গড়ঃযবৎ কারারুদ্ধ, তার লাখ লাখ কর্মীর বিরুদ্ধে সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে বের করার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছে। এহেন প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাস করিয়ে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কলম চালানোর পথ রুদ্ধ করে দিয়ে স্বৈরশাসনের ভিত আরো সুসংহত ও মজবুত করে উল্টো দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করা হয়েছে মর্মে প্রধানমন্ত্রী বলে যাচ্ছেন।

গণতন্ত্র নির্বাসনের পর্যায়ে এবং বিদ্যমান হিমালয় পাহাড়ের মতো সর্বত্র অস্বস্তির পরিবেশের পর্যায়ে জাতীয় প্রয়োজনেই সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজ্ঞ সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যথাক্রমে যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নামে বৃহত্তম বিরোধী জোট গঠন হয়েছে। ওই জোটে সংযুক্ত হয়েছে বৃহত্তর বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। পাঁচ দফা দাবিসহ লক্ষ্য অর্জনে ৯ দফা যৌক্তিক দাবি পেশ করে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা-সমাবেশ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এবং নির্বাচনের আগে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনের অর্থবহ দাবি জানাচ্ছেন। দেশের সঙ্কটাকুল প্রেক্ষাপটে ১৬ কোটি জনগণের এই দাবি।

বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়ার জোট গঠনের পর্যায়ে মন্ত্রীরা উসকানিমূলক, অশ্রাব্য-অশালীন ভাষা প্রয়োগ করে চলছেন। আমেরিকায় ক্ষমতাসীন প্রবাসী আওয়ামী লীগ সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতৃবৃন্দকে ‘দুর্নীতিবাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। জনগণ তার কাছ থেকে অরাজনৈতিক ভাষা কামনা করে না। ক্ষমতাসীনরা গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী, রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন আখ্যায়িত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে ব্যবহার করছেন। বঙ্গবন্ধু আইয়ুব খানের শাসনামলে কারাবন্দী থাকাবস্থায় তার মুক্তির জন্য আন্দোলনে পুলিশি বাধা পরিলক্ষিত হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্র উদ্ধারের নেত্রী যখন রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দী। তার মুক্তির আন্দোলনে সারা দেশে পুলিশি বাধা কেন? জনপ্রিয় এই নেত্রীর মুক্তিকামী বিএনপি নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী, রাষ্ট্রদ্রোহী বলে তাদের বিরুদ্ধে সব থানায় গায়েবি মামলা দেয়া হচ্ছে।

নির্বাচন সামনে রেখে মামলা, আদালত ও আইনের দোহাই দিয়ে পরিকল্পিতভাবে কৌশলে ক্ষমতাসীনরা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে। দেশজুড়ে গুম, খুন, দুর্নীতি, বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যা, গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা হরণ, নৈরাজ্য সৃষ্টি ও স্বাধীনতার মূল্যবোধের অবক্ষয় চলছে। গণতন্ত্র এবং ব্যালটের মর্যাদা রক্ষার জন্য যে দেশে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছে, সেই দেশ থেকে গণতন্ত্র উদ্ধার, গণতন্ত্রের আপসহীন দেশনেত্রীকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্যজোট প্রক্রিয়ায় জনগণ কাতারবন্দী।

পাকিস্তান শাসনামলে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার জন্য হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে একটি মাত্র মার্কা নিয়ে নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে মুসলিম লীগের পতন ঘটানো হয়েছিল। তখনকার যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন ব্যতিরেকে নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে জয়যুক্ত হয়েছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের পর্যায়ে প্রকারান্তে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে ভোটের মর্যাদা রক্ষার জন্য রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল।

অগণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে ক্ষমতাসীনরা বিরোধী যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্যজোটে ঠাঁই পাওয়ার যোগ্য নয়। এক যুগ ধরে গণতন্ত্রের নির্বাসন চলছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্বাধীন বাংলাদেশে গঠিত জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি শতভাগ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি এবং উদার গণতন্ত্রের জাতীয়তাবাদের চালিকাশক্তির দল। এ দলের কাণ্ডারি মরহুম রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং বর্তমান কাণ্ডারি খালেদা জিয়া বিপুল জনপ্রিয়তার অধিকারী। এরশাদের শাসনামলে গণতন্ত্র উদ্ধারের নেতৃত্ব দিয়েই খালেদা জিয়া আপসহীন দেশনেত্রী হন। সংসদীয় গণতন্ত্রের সরকার দেশ থেকে গণতন্ত্রের কবর রচনায় এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মাঝে প্রধানমন্ত্রী দেশে ‘গণতন্ত্র সুসংহত’ বলে গণতন্ত্র উদ্ধারের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে ফেলেছেন।

জাতিসঙ্ঘ এবং সব দেশ সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অব্যাহত চাপ দিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী অকপটে দেশে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবাধ সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে দিয়েছেন। কিন্তু দেশে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ন্যূনতম অনুকূল পরিবেশ নেই। কারণ, ক্ষমতাসীনরা তার উল্টো পথেই হাঁটছেন। নির্বাচন যেনতেনভাবে করে তারা ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার গঠন করলে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তার সরকারকেই মেনে নেবেন- ক্ষমতাসীনরা এ ধারণা পোষণ করেই দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পথ বাধাগ্রস্ত করছে। দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেশনেত্রীর কারামুক্তির আন্দোলনকে তাদের মোকাবেলার নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের মাধ্যমে মামলা-হামলা, জেল-জুলুম-অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। অবস্থার এমন নিদারুণ পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অরাজকতা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্যই জাতীয় প্রয়োজনে যুক্তফ্রন্ট এবং ঐক্যপ্রক্রিয়ার জোট গঠন করা হয়েছে। এ লড়াই আন্দোলনে এবং ভোটযুদ্ধে জনতার এ বিজয়কে কিছুতেই ঠেকানো যাবে না।

দেশকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে জাতীয় দাবি নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ এবং আলোচনা করে ১৯৯০ সালের আদলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন করে নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। সংবিধান পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোটের সঙ্ঘাত-সহিংসতা পরিহারে এর চেয়ে সহজ সুন্দর পন্থার বিকল্প কিছুই নেই।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া


আরো সংবাদ