২৩ মার্চ ২০১৯

স্বার্থশিকারি নেতৃত্ব ও আমজনতার আকাঙ্ক্ষা

স্বার্থশিকারি নেতৃত্ব ও আমজনতার আকাঙ্ক্ষা - ছবি : সংগৃহীত

একাদশ সংসদের নির্বাচনী বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ৮ নভেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু দল ও জোটের দাবি অনুযায়ী ঘোষিত তফসিলে পরিবর্তনও করা হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনী রাজনীতিতে চাপ, পাল্টাচাপ, হুমকি পাল্টাহুমকি এবং দর-কষাকষি শেষ সময় পর্যন্ত চলে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহের শেষ থাকে না। প্রচারণা চলছে পুরোদমে। দল ও জোটগুলোর মধ্যে চলছে তোড়জোড়। উৎসবের মেজাজে ফিরেছে দেশ। কেউ ভাবছেন ভালো নির্বাচনের কথা। কেউ বলছেন, যা বাস্তব অবস্থা, তাতে ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশা বা সম্ভাবনা কম।

তবে একটা নির্বাচন দেশে হোক, সেই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করুক, শঙ্কামুক্ত পরিবেশে হোক এবং সবাই পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারুক- এসবই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।

দশ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। এবার চাইছে নতুন রেকর্ড গড়তে। একাধারে তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে। কয়েকটি কারণে আওয়ামী লীগ আরো একবার অন্তত ক্ষমতায় ফিরতে চায়। সরকার অনেকগুলো মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেগুলো শেষ করার জন্য সময় দরকার। ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার’ জন্য আরেক মেয়াদে দেশবাসীর কাছে ভোট চাইছেন শেখ হাসিনা। আরো যে কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে চায় তার একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং অন্যটি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ২০২০ এবং ২০২১ সালেই ওই দুইটি ঘটনা। ক্ষমতায় থেকে জাতীয়ভাবে জন্মশতবার্ষিকী এবং সুবর্ণজয়ন্তী পালনের ইচ্ছা থেকেই ক্ষমতায় ফিরতে চায় দলটি।

আমাদের দেশে নির্বাচন এলে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের নির্বাচনমুখী দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। বড় বড় দলের নমিনেশন পেতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করতেও পিছু হটে না। নির্বাচনে একবার জয়ী হতে পারলেই যেন একসাথে দুই হাতে আয় করা সম্ভব। যাদের ন্যূনতম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, এমন ব্যক্তিকেও প্রার্থী হতে দেখা যায়। যাদের হাতে অবৈধ টাকার পাহাড়, তারা অর্থ দিয়ে বড় বড় দলের নীতিনির্ধারকদের বশ করে দলীয় মনোনয়ন নেন।

নরসিংদীর পাশের জেলাগুলোর সাবেক সংসদ সদস্যদের দৃঢ়চেতনায় ও বিচক্ষণতার ভূমিকায় গাজীপুরে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিক্যাল কলেজ, কুমিল্লায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিক্যাল কলেজ, কিশোরগঞ্জে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে এলাকায় শিল্প কারখানায়, হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। জনগণও এসব প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাচ্ছেন।

এ দিক থেকে অভিযোগ, অনেক জেলার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের এবং পরিবারের গাড়ি-বাড়ি-ধনদৌলত বৃদ্ধিতে মগ্ন। মেডিক্যাল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে এলাকার লোকজনের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেননি। কৃত্রিমভাবে গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে, গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় কলহ-বিবাদ লাগিয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন।

বছরের পর বছর ধরে দুই পক্ষের প্রাণঘাতী ঝগড়া-বিবাদের কারণে নিজেদের ভিটেবাড়ি ছেড়ে সপরিবারে আত্মগোপন বা বন-জঙ্গলে নিরিবিলি জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছেন। সর্বশেষ, ১৬ নভেম্বর নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। চরাঞ্চলের বাঁশগাড়ী ও নীলক্ষায় দুই দফায় সঙ্ঘটিত এ সংঘর্ষে নিহত হন কমপক্ষে চারজন। আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দিন ধরে বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের প্রভাবশালী দুইটি পক্ষের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের সূত্রপাত। হামলা ও পাল্টাহামলায় অতীতে জনপ্রিয় পৌর মেয়র চেয়ারম্যানসহ বহু জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

এসব কারণে নরসিংদী জেলার বেলায় অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচন অধিক গুরুত্ব বহন করে। জনগণ সরকারের স্বার্থে দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক কলহ বিবাদ ইন্দনদাতাদের বয়কট করার শপথ গ্রহণ করতে হবে। যুগ যুগ ধরে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে পকেট ভর্তি করছে এবং আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে- এ ধরনের প্রার্থীদের বয়কট করতে হবে। সজাগ থাকতে হবে দল এবং জনগণকে। নির্বাচনে সব দল যেন সৎ, যোগ্য, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিককে সমর্থন দেয়। অর্থ আর কালো টাকার দাপটে বিবাদ সৃষ্টিকারী, চোরাকারবারি, মাদক পাচারকারী, দুর্নীতিগ্রস্ত কেউ যেন বিজয়ী হতে না পারে- সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হতে হবে।


আরো সংবাদ