২৩ মার্চ ২০১৯

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ - ছবি : সংগৃহীত

১৯৬৩ সালে টুঙ্কু আবদুর রহমান সিঙ্গাপুরসহ মালয়েশিয়ার সব ক’টি প্রদেশ নিয়ে ফেডারেশন গঠন করেন। মালয়েশিয়াতে যোগ দিয়ে সিঙ্গাপুরের তৎকালীন নেতা লি কুয়ান ইউ টুঙ্কু আবদুর রহমানের কাছে অতিরিক্ত দাবিদাওয়া পেশ করেন। একপর্যায়ে সুপরিচিত এই প্রভাবশালী নেতা সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বের করে দেন। ১৯৬৫ সালে ফেডারেশন থেকে বের হওয়ার দুই মাস পরই নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন সিঙ্গাপুরের পিএপি নেতা লি কুয়ান ইউ। তারপর আর তিনি পেছনে তাকাননি। দিন দিন এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে। তাদের এই এগোনো যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি হয়েছে সমালোচিত। একটি প্রধান দ্বীপ ও ৫৮টি ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গড়া দরিদ্র সিঙ্গাপুরকে লি কুয়ান ইউ ঢেলে সাজালেন।

মালাক্কা প্রণালীর সংযোগে অবস্থিত ছোট সিঙ্গাপুর দেশটির সীমাহীন গুরুত্ব লি কুয়ান সহজেই বুঝেছিলেন। সমুদ্রসম্পদকে তিনি যথাযথভাবে ব্যবহার করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়েছেন। দীর্ঘ ৫৬ বছরের লি কুয়ান ও তার দলের একটানা শাসন সিঙ্গাপুরকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আজ সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে বেশি। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো রাষ্ট্রের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে অনুসরণ করতে চাইছে। বাংলাদেশ সরকারও উন্নয়শীল গণতন্ত্র বলেই সিঙ্গাপুরের নীতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন; কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সিঙ্গাপুর থেকে কী কী শিখব আর কী কী বর্জন করব, লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে এগিয়ে নিতে গিয়ে বেশ কিছু সমালোচনার শিকারও হয়েছেন। সেটা তার কাজের জন্যই হয়েছেন। তিনি সেখানে গণতন্ত্রের নামে ‘ভয়ের তন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার ও তার দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা ছিল অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। বিরোধীদের তিনি একে একে কৌশলে করেছেন নিশ্চিহ্ন। উল্লেখ করার বিষয় হলো, সিঙ্গাপুরে ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক। ভোট না দিলে বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়। এমনকি মামলাও করা হয় ভোট না দেয়ার অপরাধে! ভোটের প্রতি এত প্রীতি দেখে লি কুয়ান ইউকে অতি গণতন্ত্রী ভাবার অবকাশ নেই, সেখানে নির্বাচন শেষে দেখা যায় প্রায় শ’খানেক সংসদীয় আসনের মধ্যে বিরোধী জোট পেয়েছে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি আসন।

বাংলাদেশে গত দশ বছর শাসন করে আসছে মহাজোট সরকার। এই জোটে আওয়ামী লীগই সর্বেসর্বা। শরিক দলগুলো তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না এতে। গত দশ বছরের শাসনে দেশে বেশ লক্ষণীয় উন্নয়ন ঘটেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু, ‘সাগর বিজয়’, মেট্্েরা রেল ও মহাসড়ক সংস্কারের মতো কাজগুলো প্রশংসার দাবিদার। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দান, কমিউনিটি ক্লিনিক ও অনলাইন খাতে ব্যাপক সংস্কার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে। উন্নয়নের এসব ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নত দেশের সারিতে পৌঁছাতে পারবে। তবে এসব উন্নয়ন কাজ সরকার করলেও, বেশ কিছু কাজ এসব উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে উন্নয়নকাজে দুর্নীতি এর প্রধান অন্তরায়। সড়ক নির্মাণে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় বাংলাদেশে। সুইজারল্যান্ডে একটি রাস্তা নির্মাণে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, বাংলাদেশে হয় তার দ্বিগুণ। কিন্তু এত খরচ করেও বাংলাদেশে রাস্তা নির্মাণ করা হয় অত্যন্ত নি¤œমানের। দেখা যায়, বছর না ঘুরতেই রাস্তা চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ খাতে দুর্নীতির বিষয়ে সরকার প্রত্যক্ষভাবে অবগত বলে মনে করা যায়। লি কুয়ান ইউ শক্তভাবে দুর্নীতির বিপরীতে অবস্থান করেছিলেন। দুর্নীতির দায়ে তিনি নিজের দলের নেতাদের শাস্তি দিয়েছেন। গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বিরোধী মতের স্বাধীনতা। এই জায়গায় প্রচণ্ড ব্যর্থ ছিলেন লি কুয়ান।

এক সমীক্ষা মতে, বাংলাদেশে গত ৯ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ৪০৩ জন এবং গুম হয়েছে ৪৬ জন। এর চেয়ে উদ্বেগের সংবাদ আর হতে পারে না। আধুনিক রাষ্ট্রে এই বিষয়গুলো সরকার ইচ্ছে করলেও ধামাচাপা দিতে পারে না। এক দিকে উন্নয়ন অন্য দিকে গণতান্ত্রিক আচরণের অনুপস্থিতি থাকলে, তেমন কোনো ফায়দা পাবে না জাতি। প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবার প্রবণতা থেকে সরকারকেই আগে বেরিয়ে আসতে হবে। এক হিসাব মতে, এ দেশে বেকার চার কোটি ৪৬ লাখ। তাদের ৪৭ শতাংশ অনার্স পাস। বেকারদের কথাও ভাবতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে, এই সম্ভাবনাময় তরুণেরা একসময় বিরাট সমস্যায় পরিণত হবে। লি কুয়ান ইউ শিক্ষাব্যবস্থাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষা খাত বেকার তৈরি করে। এ দেশে উচ্চশিক্ষা শেষে একজন তরুণ একটি কাগজের সার্টিফিকেট ছাড়া আর কিছু পান কি? শিক্ষা শেষে কর্মজীবনে গিয়ে এ অবস্থায় একজন তরুণ হতাশ না হয়ে পারে না। তখন দেখে, তার শিক্ষাজীবন আর কর্মজীবনে কোনো মিল নেই। তার অর্জিত শিক্ষা তাকে কর্ম দিতে সহযোগিতা করছে না। কর্মের জন্য তাকে শিখতে হচ্ছে আবার নতুন করে; কিন্তু সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা এমন নয়। সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী। উন্নত হওয়ার প্রত্যাশী বাংলাদেশকেও এই বিষয়টি ভাবতে হবে।


আরো সংবাদ