১৯ জুন ২০১৯

বাংলা সনের প্রচলন

৪৩৫ বছর আগে মুঘল সম্রাট আকবর পয়লা বৈশাখ প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলা সনের সূচনা করেন। ইংরেজি ১৫৮৪ সালে পয়লা বৈশাখকে বাংলা পঞ্জিকার প্রথম দিন নির্ধারণ করে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করা হলেও তার কার্যকারিতা দেখানো হয়েছিল ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১১ মার্চ থেকে অর্থাৎ সেই সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে। সেই হিসাবে, ৪৬৩ বছর আগে ৯৬৩ হিজরিতে ৩৫৪ দিনের গণনায় এনে সম্রাট আকবর নতুন সন প্রবর্তন করেন।

হিজরি থেকে উৎসারিত হয়েছে বাংলা সন। হজরত ওমর রা: ৬৩৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সনের প্রবর্তন করেন। বছরটি ছিল ১৭ হিজরি। হিজরি সনের গণনা করা হয় চাঁদের হিসাবে আর বাংলা সন গণনা করা হয় সূর্যের হিসাবে। বছর চাঁদের হিসাবে ৩৫৪ দিন আর আর সৌর হিসাবে ৩৬৫ দিন। কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ৯৬৩ হিজরিতে ৩৫৩ দিনের স্থলে ৩৬৫ দিনের বর্ষ গণনায় এনে নতুন সন প্রবর্তন করা হয়, এটাই বাংলা সন। সৌর সনে দিনক্ষণ গণনা করা সহজ। সম্রাট আকবরের অর্থ বিভাগের উপদেষ্টা আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী বাংলা মাসের নামগুলো নক্ষত্রের নাম থেকে নিয়ে, সৌর মাসের দিন মিলিয়ে বাংলা (ফসলি) সন প্রবর্তন করেন। সম্রাটের নির্দেশ অনুযায়ী অনেক ভেবেচিন্তে ১৫৮৪ সালে পয়লা বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম দিন নির্ধারণ করা হয়। সম্রাট আকবরের রাজত্বকাল ছিল ১৫৫৬-১৬০৫ সাল।

‘ফসলি’ সন হিসেবে বাংলা নববর্ষের সাথে সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের ঘটনা স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই সময় থেকে এ দেশের মানুষ চাষাবাদ, খাজনা পরিশোধ, হিসাব-নিকাশসহ সব কিছুতেই বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে থাকে। পটপরিবর্তনের পালায় ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমল পার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে অব্যাহত রয়েছে বাংলা পঞ্জিকা। আকবর ২৯ বছর রাজত্ব করার পর বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। হিজরি সন এবং তার সিংহাসন আরোহণের বছরকে সংযুক্ত করেই বাংলা সন প্রবর্তিত হয়েছিল।

বাংলা নর্ববষের প্রথম দিনটি বাঙালির জীবনে একটি প্রধান উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। প্রতিটি জাতি-গোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব ও অনুষ্ঠান রয়েছে। পয়লা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক একটি আনন্দ উৎসব, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষ সব মানুষ পালন করে থাকে। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসব। বর্ষ পরিক্রমায় পুরাতন বছর বিদায় নেয় তার গ্লানি আর জীর্ণতা নিয়ে, আগমন ঘটে সম্ভাবনাময় নতুন বছরের।

বাংলা সনের ইতিহাস ঘটনাবহুল। চান্দ্র মাসের হেরফেরে ফসল কাটায় বিলম্ব ঘটত আর সে কারণে খাজনা আদায়ে সমস্যা হতো। এই সমস্যার সমাধানে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন দিল্লির সম্রাট। বাংলা সনের গণনা সম্রাট আকবরের দিল্লির সিংহাসন আরোহণ করার দিন থেকে ধরা হলেও এটা সত্য যে, হিজরি সনই বঙ্গাব্দের মূলভিত্তি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা:-এর সময়কালে হজরত আলী রা:-এর প্রস্তাবে মহানবী সা:-এর হিজরতের দিন থেকে হিজরি সন গণনা শুরু হয়। সেটা ছিল ৬২২ সালের ১৬ জুলাই। খ্রিষ্টাব্দ যেমন এসেছে হজরত ঈসা আ: তথা যিশু খ্রিষ্টের জন্মের পর থেকে গণনা করে, তেমনি হিজরি সন গণনা শুরু হয়েছে নবী মুহাম্মদ সা:-এর হিজরতের ভিত্তিতে। অতীতে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। ৯৬৩ হিজরি সনের মহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এ জন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং পয়লা বৈশাখকে নববর্ষের প্রথম দিন ধরা হয়।

বাংলা সনের বয়স একদিক দিয়ে ৪৬৩ বছর। বঙ্গাব্দ বা নববর্ষ এখন জাতীয় উৎসব এবং বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। নববর্ষ উদযাপনের রীতি অনেক প্রাচীন। সেকালের মানুষ নববর্ষে দিন-ক্ষণ-লগ্ন ঠিক করত সূর্যের উত্তরায়নে ও দক্ষিণায়নে ঋতু পরিবর্তন দেখে। তাই বলা হয় নববর্ষ ঋতুভিত্তিক উৎসব। বাংলা ভাষার মতো বাংলা বর্ষগণনাপদ্ধতি হাজার বছরের ঐতিহ্য লালিত সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্রাট আকবর যে নতুন সনের প্রবর্তন করেন তার আগে এ অঞ্চলে বিভিন্ন নামে বিভিন্নভাবে বর্ষ গণনার প্রচলন ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- মল্লাব্দ, শকাব্দ, বিক্রমাব্দ, হর্ষাব্দ, বুদ্ধাব্দ, পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ, গুপ্তাব্দ, নসরত শাহী সন, শালিবাহন সন, জালালী সন, সেকান্দর সন ইত্যাদি। তখনকার সনগুলোর বেশির ভাগই গণনা করা হতো চান্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী।

আমরা যতই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠি না কেন, আমাদের অস্তিত্বে আর প্রেরণাজুড়ে বৈশাখের প্রথম দিনটিই যেন ছড়িয়ে দেয় রক্তিম আভা। নববর্ষের পয়লা বৈশাখ জাতির আকাশে এক নতুন সূর্যোদয়। জাতির জীবনে তা মহা আনন্দের দিন। হয় আরেকটি নতুন বছরের শুভ সূচনা, নতুনভাবে পথচলা এবং নতুনের আবাহন। দেশপ্রেম সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধে উজ্জীবিত এ মহা মিলনমেলা, যা আমাদের সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রস্বরূপ। সর্বজনীনতার ক্ষেত্রে এর কোনো তুলনা নেই। বাংলা নববর্ষের সর্বজনীনতা জাতীয় জীবনের সর্বজনীনতায় প্রভাব ফেলে। এটা আমাদের সবাইকে ঐক্যসূত্রে গাঁথার এক মূলমন্ত্র। বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় সত্তার প্রতীক ও ঐতিহ্যমণ্ডিত। বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির স্বতন্ত্র বিকাশে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিন এটি। পয়লা বৈশাখ বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য, প্রত্যাশার একটি রেখাচিত্র। ১৪২৬ সালের নববর্ষে সবার জীবন আনন্দময় হয়ে উঠুকÑ সেই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, কলারোয়া সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা


আরো সংবাদ