১৮ জুলাই ২০১৯

পশ্চিমতীর দখলের ইসরাইলি ষড়যন্ত্র বুমেরাং হবে

-

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিমতীর দখল করে নেয়ার ইসরাইলি আহ্বান তেলআবিব ও ওয়াশিংটনে বেশ গতি সঞ্চার করেছে। তবে ইসরাইল ও তার আমেরিকান মিত্ররা যে আগুন নিয়ে খেলতে চাচ্ছেন সে ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ফিলিস্তিনিদের হারানোর কিছু নেই। ইসরাইল নিজেই শান্তিচুক্তির মাধ্যমে অধিকৃত পশ্চিমতীর ও গাজা ভূখণ্ড ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। সেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড আবার তারা জবরদখলের চিন্তা করলে ফিলিস্তিনিরা তাদের বর্তমান নীতিকৌশল নিয়ে নতুন করে ভাববে এবং মুসলিম বিশ্বকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনায় এগিয়ে যাবে। ট্রাম্প প্রশাসনের মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে উৎসাহিত হয়ে ইসরাইলি সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন এই সুযোগে গোটা পশ্চিমতীর দখল করে নেয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ইসরাইলের সাবেক বিচারমন্ত্রী আইলেত শাকেদ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে নেয়ার জন্য ‘এখনকার চেয়ে কোনো ভালো সময় নেই’ বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

ইসরাইলে আবার নির্বাচনী মওসুম এসে গেছে। কারণ গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘নিরাপত্তার’ নামে সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে প্রার্থীরা এ ধরনের শক্তির আস্ফালন করতে পারেন। তারা নির্বাচনী প্রচারযুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এই মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইল কখনো এ ধরনের সুযোগ হাতছাড়া করবে না। এটা ডানপন্থী সরকারের অত্যন্ত র‌্যাডিক্যাল অ্যাজেন্ডা। ইসরাইলের দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা ও ইচ্ছা বাস্তবায়নের এটাই উপযুক্ত সুযোগ। ট্রাম্প প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল তাদের যে বৃহত্তর পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে চায়- তার মধ্যে রয়েছে ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেমকে যে অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি, অধিকৃত গোলান মালভূমি ইসরাইলি দখলে নিয়ে বিষয়টির প্রতি ওয়াশিংটনের অনুমোদন এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসার অধিকার বাতিল করে দেয়া।

প্রভাবশালী মার্কিন কর্মকর্তারা এক বিবৃতির মাধ্যমে পশ্চিমতীর অথবা তার অংশবিশেষ সরাসরি ইসরাইলি দখলে নিয়ে আসার প্রতি তাদের প্রাথমিক ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রাইডম্যান এ ধরনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পশ্চিমতীরের কিছু অংশ দখলে রাখার অধিকার ইসরাইলের রয়েছে।’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে ডেভিড ফ্রাইডম্যান এ কথা বলেন। ট্রাম্পের তথাকথিত ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তির’ সাথে ট্রাম্প সরাসরি গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তথাকথিত শতাব্দীর এই সেরা চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো- ফিলিস্তিনিদের প্রধান দাবিগুলো বাতিল করা এবং জনসংখ্যাগত দিক দিয়ে ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ সুগম করার বিষয়টি আবার নিশ্চিত করা।

ইসরাইলের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের এই প্রচেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত জেসন গ্রিনব্লাট এবং জাতিসঙ্ঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকিহ্যালি। ইসরাইলের দক্ষিণপন্থী একটি পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে নিকিহ্যালি বলেন, ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি ‘নিয়ে ইসরাইলে সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরাইলি নেতারা বুঝতে পেরেছেন তারা চালকের আসনে নেই। তাই নির্বাচনী মওসুমে এটা জনপ্রিয় স্লোগান হলেও সত্যিকারভাবে পশ্চিমতীর দখল করাটা কি খুব সহজ হবে? সত্যিকার অর্থে ওটা হবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। অবশ্য এসব বিষয় অতীতে আরব বা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করতে ইসরাইলের কাছে তেমন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইসরাইল ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে যথাক্রমে পূর্ব জেরুসালেম ও গোলান মালভূমি দখল করে নেয়া। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইসরাইল রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত। গত মার্চে ইসরাইলের হারেজ পত্রিকার পরিচালিত এক জনমত জরিপে ৪২ শতাংশ ইসরাইলি পশ্চিমতীর দখল করার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন দিয়েছে। এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। আবার বিষয়টি নিয়ে ইসরাইল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও উভয় সঙ্কটে রয়েছে বলেও জানা গেছে। তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয় ও প্যালেস্টানিয়ান সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিচার্স ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে যৌথভাবে একটি জরিপ চালিয়েছিল। ওই জরিপে ৫০ শতাংশেরও বেশি ফিলিস্তিনি তথাকথিত দুই রাষ্ট্র সমাধান আর বেশি দিন বজায় থাকবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। অধিকন্তু ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ফিলিস্তিনি মনে করেন একটি রাষ্ট্রে ইসরাইলি ইহুদি ও ফিলিস্তিনি আরব (মুসলিম ও খ্রিষ্টান) পাশাপাশি বসবাস করতে পারে।

অধিকতর ভালো একটি ভবিষ্যতের জন্য একমাত্র এ ধরনের একটি ফর্মুলা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেসব ইসরাইলি কর্মকর্তা ইসরাইলি জনসংখ্যাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ফিলিস্তিনিদের একেবারে সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে চান তাদের কাছে আর কোনো ভালো অপশন নেই।

প্রথমত, তারা বুঝতে পেরেছেন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দখল করে রাখা যাবে না। দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ বয়কট, নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি যেভাবে বাড়ছে- তাতে বিশ্বব্যাপী ইসরাইলের রাজনৈতিক বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যে, লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে উপেক্ষা করে পশ্চিমতীর দখল করার যে পথ একজন ইহুদি নেতা বাতলে দিয়েছেন- সেটা হবে অত্যন্ত বড় জনসংখ্যাগত হুমকি।

তৃতীয়ত, তথাকথিত স্থানান্তর অপশনের মাধ্যমে গোটা ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়কে ইথনিক ক্লিঞ্চিং বা সমূলে জাতিগতভাবে নির্মূল করাটা যেটা ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় ১৯৪৮ সালে এবং আবার ১৯৬৭ সালে করা হয়েছে, সেটা এখন আর সম্ভব হবে না। ইসরাইলের গণহত্যাকে কেউ স্বাগত জানাবে না এবং ফিলিস্তিনিরাও তাদের দেশত্যাগ করে কোথাও যেতে চাইবে না। বরং এর জন্য ইসরাইলকে চড়া মূল্য দিতে হবে। বছরের পর বছর অবরোধ এবং বর্বরতম যুদ্ধের পরও গাজায় ফিলিস্তিনিরা আরো সুদৃঢ় ও মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে যাবে।

ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজেদের ভাগ্যের ব্যাপারে আর কখনো নিষ্ক্রিয় থাকবে না। তারা দৃঢ়তার সাথে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে। চূড়ান্তভাবে পশ্চিমতীর অবৈধভাবে দখল করা হলে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাম্যতার যুদ্ধ আরো বেগবান হবে এবং যৌক্তিক পরিণতি লাভ করবে। অন্য দিকে ইসরাইলের এসব নেতিবাচক তৎপরতা দেশটিকে একটি গোষ্ঠীগত বর্ণবাদী ও কূপমণ্ডুক দেশে পরিণত করবে।


আরো সংবাদ