১৮ আগস্ট ২০১৯

ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ায় আফ্রিকার অসমাপ্ত যুদ্ধ

-

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে আফ্রিকার সবচেয়ে দরিদ্র দুই দেশ ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সীমান্তে শুরু হয়েছিল ভয়াবহ এক যুদ্ধ। দুই বছরের এই যুদ্ধে মারা যায় কয়েক লাখ মানুষ। দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও সীমান্তে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা রয়েই গেছে।

কিন্তু এক সময় দুই পাশের মানুষজন বেশ আনন্দ নিয়ে মেলামেশা করত। কিন্তু যুদ্ধের পর বন্ধ সীমান্ত খোলার অপেক্ষায় থাকত তারা। গত বছর শান্তি ঘোষণা দিয়েছিলেন দুই দেশের নেতারা। গত ৮ জুলাই ছিল অন্যরকম একটি দিন। এ দিন আসমারায় আগমন করেন আবিয় আহমদ। ইথিওপিয়ার নেতাদের প্রথম সাক্ষাৎকারে ইরিত্রিয়ান রাজধানীর রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। এ দিন উভয় দেশের জাতীয় পতাকা বিমানবন্দর থেকে বুলেভার্ড পর্যন্ত ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। মহিলারা পপকর্ন বহন করে, যা তারা উদযাপনে ভিড়ের ওপর ফেলে দেয়।

বছরখানেক আগে ইরিত্রিয়ার বৃদ্ধ বয়স্ক স্বৈরশাসক ইশাইয়া আফভারকি, তিনি তার তরুণ প্রতিপক্ষকে আলিঙ্গন করেছিলেন। দুই দশকের শত্রুতা বন্ধের জন্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। আবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে কোনো সীমানা নেই। পরিবর্তে আমরা ভালোবাসার সেতু তৈরি করেছি।

ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী শহর আদিগ্রাত। ২০ বছর আগে শহরটি ছিল ইথিওপিয়ার সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নশীল আর প্রাণবন্ত একটি শহর। ইরিত্রিয়ার গা ঘেঁষা এই শহরটিকে এখন একেবারে ভিন্ন একটি এলাকা মনে হয়। শহরের বাসিন্দা মালাকো ডেস্টাম।

তিনি বলছিলেন, আমার মনে আছে বড় বড় বাসে করে অনেক মানুষ ইরিত্রিয়ার আসমারা থেকে এখানে আসত। এখানে হোটেল আর রেস্টুরেন্ট ব্যবসা দারুণ জমজমাট ছিল। তরুণ প্রজন্ম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের সাথে জড়িত ছিল। ভালোই রোজগার ছিল তাদের। আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার সেই শহরটি এখন মৃতপ্রায়।

১৯৯৮ সালের ৬ মে শুরু হওয়া যুদ্ধই তার কারণ। তেল নেই অথবা হিরের খনিও নেই এমন একটা শহর বাদমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয়েছিল সেই যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধের আগে দিনকাল একেবারে অন্যরকম ছিল দুই ধারের মানুষের জন্য। মালাকো মৃতপ্রায় আদিগ্রাত শহরে তার ছোট মোবাইল যন্ত্রাংশের দোকানে বসে যে গান শুনছিলেন তা ইরিত্রিয়ার এক শিল্পীর। সীমান্তের এপারে ইথিওপিয়াতে এখনো ইরিত্রিয়ার গান বেশ জনপ্রিয়। তার মনে আছে কিভাবে ইরিত্রিয়ার রুটি দিয়ে সকালের নাস্তা করত তার পরিবার। ছুটিতে তারা ইরিত্রিয়া বেড়াতে যেতেন। সে এখন ইতিহাস।

শহরের অল্প বয়সী ছেলেরা এখন ভালো চাকরির আশায় অন্যত্র চলে গেছে। মালাকো তবুও রয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, আমি এখন বড় হয়েছি। নিজের ব্যবসায় দাঁড় করিয়েছি। আমার কাছের সবচেয়ে বড় শহর ইরিত্রিয়ার আসমারা। কিন্তু তবুও আমাকে মালপত্র আনতে আদ্দিস আবাবা পর্যন্ত যেতে হয়।

আদিগ্রাত থেকে আসমারা যাওয়ার একটিই রাস্তা। সেটি এখনো রয়ে গেছে। রাস্তাটির দুই পাশের মানুষজনের মধ্যে এক সময় বিয়ে হতো। আত্মীয়রা এপাশ থেকে ওপাশে দাওয়াতে যেতেন। কিন্তু সেই রাস্তাটি ধরে আসমারা যাওয়ার সীমান্ত দুই দশক ধরে বন্ধ ছিল।
৭০ বছর বয়সী আব্রাহাত বাহারাম সেই দিনগুলো স্মরণ করছিলেন। তিনি বলেছেন, আমরা সকালের দিকে কফি খেতাম। তারপর আসমারা চলে যেতাম। সেখানে দুপুরের খাবার খেতাম তারপর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম। সে এক দারুণ সময় ছিল। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা আর ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল।

আব্রাহাত এখানে একটি বড় হোটেলের মালিক ছিলেন। বহু জায়গা থেকে সেখানে অতিথিরা আসতেন। এখন আর তারা আসেন না। এখন সেখানে রয়েছে শুধু একটা সস্তা পানশালা। ইরিত্রিয়াতে আব্রাহাতের অনেক আত্মীয় রয়েছে। যাদের সাথে তার বহুদিন দেখা নেই। ইরিত্রিয়ান প্রতিবেশীদের সাথে জীবনের অর্ধেকের বেশির ভাগ সময় তার খুব শান্তিতে কেটেছে। দুই পাশের ভাষা ও সংস্কৃতিও একই। আদিগ্রাতের মানুষজন আসমারা সীমান্ত খুলে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

আদিগ্রাতের বাসিন্দা ইথিওপিয়ার জনপ্রিয় শিল্পী কাসাউন উল্ডোগিওরগিস তাদের একজন। তিনি মনে করেন, তার চারপাশে এমন কেউ নেই যারা আশাবাদী নয়। এখানে যত মানুষ আছে তারা সবাই ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে শান্তি ও ভালো সম্পর্ক আশা করে। তিনি হলফ করে বলেন দুই দেশের মধ্যে শান্তি ফিরে আসবে।

ইথিওপিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদও এমন কথাই বলেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে শিগগিরই দুই দেশের সম্পর্ক শান্তির পথে মোড় নেবে। ইথিওপিয়ার আদিগ্রাত আর ইরিত্রিয়ার আসমারার মানুষজন এখনো অপেক্ষায় আছেন কবে সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখবেন। কবে দেশ দুটির মধ্যে শান্তি ফিরে আসবে। দুই দেশের সীমান্তের যুদ্ধাবস্থা থেকে কবে মুক্তি মিলবে।


আরো সংবাদ