১৮ আগস্ট ২০১৯

আসামের মুসলিমরা নিজ দেশে পরবাসী!

-

প্রায় ৫০ বছর ধরে বসবাস করে আসা আসামের বাঙালি মুসলমানদের মহাসঙ্কট শুরু হতে বাকি আছে আর মাত্র ১৩ দিন। এরপরই সেখানকার ৪০ লাখের বেশি নাগরিক হারাবেন তাদের নাগরিকত্ব। তাদের পরিচয়পত্র থেকে হারিয়ে যাবে দেশের নামটি। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করে এলেও শেষ পর্যন্ত তারা হয়ে যাচ্ছেন রাষ্ট্রহীন নাগরিক। মূলত আসামের বাংলাভাষী বলে হিন্দু-মুসলিম সবাইকে বোঝানো হলেও চূড়ান্তপর্যায়ে এ কার্যক্রমের মূল টার্গেট মুসলমানরাই।

বিষয়টি শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ৭০ বছর আগে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম বেশ জোরেশোরে আবার শুরু হয় গত বছর। প্রথম দফাতেই তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয় ৪০ লক্ষাধিক মানুষকে, যাদের বেশির ভাগই বাংলাভাষী ও মুসলমান। দ্বিতীয় দফাতে আরো এক লাখ লোককে বাদ দেয়া হয় ওই তালিকা থেকে। এ তালিকায় এমনও মানুষ রয়েছেন, যারা ৬০-৭০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছেন। কেউ কেউ আবার দেশের সরকারি চাকরি করেছেন দীর্ঘ দিন ধরে। অংশ নিয়েছেন দেশের পক্ষে যুদ্ধেও। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জেদের কাছে এসব আবেগ-যুক্তি সবই মূল্যহীন হয়ে গেছে।

গত বছর থেকেই এ বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোড়ন শুরু হয় আসাম রাজ্যে। ধারণা করা হয়েছিল, সরকার পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি পাল্টাতেও পারে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকার আবারো ক্ষমতায় আসায় সে সম্ভাবনাতে গুড়ে বালি। ভারতের নতুন লোকসভা ও রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশনে দেশটির রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করছে। এটি দেশের অনেক অংশে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা এবং সেই সাথে সীমিত জীবনযাত্রার সুযোগগুলোতে বিপুল চাপ সৃষ্টি করে। তাই অনুপ্রবেশের শিকার হওয়া এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন (এনআরসি) প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

তবে মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মের প্রতি যে ভারত খুবই উদার সে কথাটি মনে করিয়ে দিতে ভুল করেননি ভারতের রাষ্ট্রপতি। ওই ভাষণে তিনি আরো বলেন, ভারত সরকার ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশ্বাসের কারণে নির্যাতিতদের রক্ষা করার জন্য সরকার সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো হবে।

আসামে নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধনের (এনআরসি) প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ১৯৫১ সালে। এনআরসিকে তখন সব নিবন্ধিত ভারতীয় নাগরিককে চিহ্নিত করার একটি উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো এ এনআরসি হালনাগাদ শুরু করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে ৩০ জুলাই আসামে যে নাগরিক পঞ্জির খসড়া তৈরি করা হয়, তাতে প্রথম দফায় ৪০ লাখ ৭০ হাজার এবং দ্বিতীয় দফায় এ বছরের ২৬ জুন আরো এক লাখ ব্যক্তিকে ভারতের অনাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আসামের তিন কোটি ২৯ লাখ নাগরিকের মধ্যে দুই কোটি ৯০ লাখ মানুষের নাম এনআরসিতে নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে আসামের প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষকে অনাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা প্রকাশ করা হবে। সে তালিকায় বাদ যাওয়া ব্যক্তিরা রাষ্ট্রহীন বা বিদেশী হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ ক্ষেত্রে যারা মুসলিম তাদের ভারতের নাগরিকত্ব বহাল রাখার আর কোনো উপায় থাকবে না। অন্য দিকে, হিন্দু যারা অনাগরিক হিসেবে তালিকাভুক্ত হবেন তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বলে ভারতীয় নাগরিকত্ব বহাল বা অর্জন করতে পারবেন।

মূলত আসামের স্থানীয় জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলনের কারণেই এ এনআরসির বিষয়টি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু এসব জাতীয়তাবাদী যেখানে বাঙালি হিন্দু মুসলিম সবাইকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়, সেখানে বিজেপির কেবল মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অনাগরিক ঘোষণা করা এবং অমিত শাহের বক্তব্য অনুসারে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার কাজটি সেরে ফেলতে ইচ্ছুক। শুধু তাই নয়, মোদি, অমিত শাহ এবং সর্বশেষ ভারতীয় রাষ্ট্রপতির ঘোষণা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরামেও এনআরসি বাস্তবায়ন করা হবে।

ভারতের বর্তমান শাসক দল বিজেপি সর্বভারতীয় দল হলেও সব ধর্ম ও বিশ্বাসকে ধারণ করে সর্বভারতীয় সংস্কৃতির যে আদর্শ ছিল, সে অনুসারে চলেনি কোনো সময়েই। বরং ধর্মীয় জাতীয়তাবোধের বার্তা দেয়ার জন্যই বিজেপি কখনো ভারতের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মুসলিমদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করে না। এরই অন্যরকম ফলস্বরূপ বিজেপি থেকে নির্বাচিত লোকসভা সদস্য বা এমপিদের মধ্যে কোনো মুসলিমের স্থান নেই।

বিজেপি তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই আসামে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছে। কারণ আসামে ৩০ শতাংশের বেশি মুসলিম ভোটার। এনআরসির মাধ্যমে এই সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনা গেলে অনেক আসনে মুসলিমরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে আর নির্ণায়কের ভূমিকায় থাকবেন না। একই অবস্থা পশ্চিমবঙ্গেও। তাই সেখানেও এনআরসির তোড়জোড় শোনা যাচ্ছে। বিজেপি যদি আসামের ক্ষেত্রে এ সফলতা লাভ করে তাহলে পরবর্তী সময়ে এ ধারাবাহিকতা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরামেও চলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আসামে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর বৈধ কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশকারী ব্যক্তিদেরকে ‘বিদেশি’ হিসেবে শনাক্ত করা হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢুকিয়ে দেয়ার মিয়ানমারের সাফল্যেই উজ্জীবিত হয়ে তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও তারা এ পর্যন্তু উল্লেখ করেনি, এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে তারা কোথায় সরিয়ে দেবে বা নেবে। কিন্তু যেহেতু তাদের বাঙালি হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে, তাই তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি।

তবে আসামের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে দশটি আটক কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। তাই আপাতত ধারণা, তালিকার বাইরে থাকা লোকজনকে এর মধ্যেই রাখা হবে।

এদিকে, প্রত্যাবাসনের মুখে পড়ার ভয়ে আত্মহত্যার হার বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। সিটিজেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস সংস্থা এ ধরনের ৫১টি আত্মহত্যার তালিকা দিয়েছেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে হালনাগাদ তালিকার প্রথম খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।


আরো সংবাদ