২১ আগস্ট ২০১৯

তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন

-

উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। এর উত্তরে ও পূর্বে রয়েছে ভূমধ্যসাগর। এর পশ্চিমে আলজেরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্বে লিবিয়া। উত্তর আফ্রিকার বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে অবস্থিত সাহারা মরুভূমি দক্ষিণ তিউনিসিয়া থেকে শুরু হয়েছে। দেশটির ৪৫ শতাংশ জায়গা সাহারা মরুভূমিতে পড়েছে।

১৮৮১ সাল থেকে তিউনিসিয়া ফ্রান্সের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৯৫৬ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। আধুনিক তিউনিসিয়ার স্থপতি হাবিব বুর্গিবা দেশটিকে স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেন এবং ৩০ বছর ধরে দেশটির রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিউনিসিয়া উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। ইসলাম এখানকার রাষ্ট্রধর্ম। প্রায় সব তিউনিসীয় নাগরিক মুসলিম।

২০১১ সালে গণতন্ত্রের জন্য আরব বিশ্বের যে গণ-আন্দোলন শুরু হয়, তার সূচনা হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী নির্বাচনে দেশটিতে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বেজি সাইদ এসেবসি ক্ষমতায় আসেন। গণজাগরণের মাধ্যমে তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক জয়নুল আবেদিন বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার তিন বছর পর দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে প্রথম নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন সাইদ এসেবসি।

সেই তিউনিসিয়ায় ৬ অক্টোবর পার্লামেন্ট এবং ১০ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। দেশটি গণতন্ত্র থেকে সরে যাচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। এ জন্য এ নির্বাচন দু’টিকে বলা হচ্ছে তিউনিসিয়ার জন্য গণতন্ত্র রক্ষার একটি পরীক্ষা।

আরব বসন্তের ঢেউ এই দেশটি থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল। আট বছর আগে তিউনিসিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বেন আলীর পতন হয়। দেশটিতে স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। জনগণকে সরকারি কার্যক্রম থেকে দূরে ঠেলে দেয়া হয়।

কিন্তু তিউনিসিয়ার বিপ্লবের পর এই নিষেধাজ্ঞা দূরীভূত হয় এবং সেখানকার মানুষ রাজনীতি করার সুযোগ পায়। সেই ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে তিউনিসিয়ার মানুষ ক্রমে রাজনীতিক হয়ে উঠেছে। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের পর দেশটিতে স্বকীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দেশটির অর্থনীতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে গত বছর ব্যাপক বিক্ষোভও হয়। তবে সঙ্কটটি বেন আলীর পতনের পর আরো এক বড় সঙ্কটের মধ্যেই তৈরি হয়।

দেশটিতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দু’টি দল বিজয়ী হয়েছে। এক দিকে ছিল মধ্যপন্থী দল নিদা তিউনিস, অন্য দিকে ইসলামপন্থী দল আননাহদা। আননাহদার ইসলামী রাজনীতির বিরোধিতা করেই প্রচারণা শুরু করেছিল নিদা, যদিও শেষমেশ দলটি ইসলামপন্থীদের সাথে জোট গড়তে রাজি হয়।

আরব বসন্তের পর স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন এখনো গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের পর ২০১৩ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে আরো একটি নৃশংস শাসন দেখা গেছে। সম্প্রতি মুরসি কারাগারে বিচারের সময় মারা যান। বাহরাইন বা মরক্কোর মতো অন্যান্য দেশে তারা তাদের শাসনব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করতে পেরেছিল।

তবে তিউনিসিয়া ভিন্ন ছিল। তারা তাদের এই পার্থক্য রক্ষা করতে চায়। দেশটি তার জনগণের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গত ৬ মে পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস করলেও প্রেসিডেন্ট বেজি সাইদ এসেবসি তা অনুমোদন করেননি।

নির্বাচনে দেশটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আননাহদা পার্টির অন্যতম নেতা রশিদ ঘানুশি অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বেন আলীর সময়ে গত দুই দশক ধরে তিনি লন্ডনে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন। তিনি রাজনীতিতে এখন আর আগ্রহী নন বলে জানিয়েছিলেন। ৭৮ বছর বয়সী নেতা রশিদ ঘানুশির দলের মুখপাত্র ইমাদ খেমিরি বলেন, ঘানুশির নির্বাচনে অংশগ্রহণ তিউনিসিয়াকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আননাহদাকে যদিও কট্টরপন্থী বলে মনে করা হয়, কিন্তু বিপ্লব এবং নাগরিক ও গণতান্ত্রিক প্রশাসনে উত্তরণে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এক বিবৃতিতে খেমিরি বলেন, আননাহদা তিউনিসিয়ায় মুসলিম গণতান্ত্রিক দল। তারা সংস্কার, গণতন্ত্র, আধুনিকীকরণ ও জীবনের অগ্রগতির সুযোগের প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা যেকোনো অবস্থার সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করি। যারা এই সহিংসতাকে ব্যবহার করে তাদের প্রতি আমাদের সহনশীলতা থাকে না। আননাহদার বিরুদ্ধে আনীত অবৈধ কার্যকলাপ সম্পর্কিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ ধরনের জালিয়াতি আমাদের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা ও দেশের আন্তর্জাতিক চিত্রকে দুর্বল করে। উপরন্তু আননাহদাকে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত সাব্যস্ত করা যায় না।

পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থী আননাহদা পার্টি, প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ শাহেদের অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষ তাহিয়া তিউন্স পার্টি এবং বর্তমান প্রেসিডেন্টের ছেলে হাফেজ সাইদ এসেবসির নেতৃত্বাধীন নিদা তিউন্স পার্টির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনটি দল একসাথে উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিকে শাসন করছে। কিন্তু জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং বিদেশী দাতাদের দাবি অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের গতিকে কমিয়ে দেয়। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনে প্রথম দফায় কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যদি সরাসরি জয়লাভ না করেন, তবে দুই সপ্তাহের মধ্যেই দ্বিতীয় দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তিউনিসিয়ার প্রধান চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। ২০১৮ সালে তিউনিসিয়ার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল এক হাজার ৯০০ কোটি দিনার। ২০১৭ সালে এটি ছিল এক হাজার ৫৫৯ কোটি এবং ২০১৬ সালে ছিল এক হাজার ২৬০ কোটি দিনার। উপরন্তু তিউনিসিয়ার আমদানি ২০১৮ সালে আগের বছরের তুলনায় ১৯.৮০ ভাগ কমেছে। অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনই বলে দেবে, দেশটিতে গণতন্ত্রের অগ্রগতি কতটুকু।


আরো সংবাদ