২১ আগস্ট ২০১৯

চুক্তি মানবে না ফিলিস্তিন, মরিয়া ইসরাইল

-

চতুর্থবারের মতো ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে জর্দান নদীর পশ্চিমাংশে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জাতীয় নির্বাচনের আগে গত এপ্রিলে ইসরাইল টেলিভিশনের সাথে সাক্ষাৎকারে এমনটাই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ইহুদি বসতি সম্প্রসারণে উৎসাহ যোগালেও এর আগের তিন মেয়াদে প্রকাশ্যে এভাবে কখনো বলেননি তিনি।

নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছে। কিন্তু কথা রেখেছেন তিনি। গত সপ্তাহে জেরুসালেমের উপকণ্ঠে ফিলিস্তিনিদের একটি গ্রামে বেশকিছু বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এই উচ্ছেদ অভিযান চালায় ইহুদি রাষ্ট্রটি। এর পরই বৈঠকে বসেন ফিলিস্তিনের শীর্ষ নেতারা। ইসরাইলের সাথে করা সব চুক্তি বাতিল করে দেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ফলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে।

ইসরাইল অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি গ্রাম সুর বাহের। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গত ২২ জুলাই সোমবার ভোরে বুলডোজার দিয়ে গ্রামটির বাড়িগুলো ভাঙা শুরু করে ইসরাইল। দেশটির সেনাসদস্যরাও উপস্থিত ছিল সেখানে।

ফিলিস্তিন ও জেরুসালেমের সীমান্ত রেখার খুব কাছাকাছি ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছিল ইসরাইল। কয়েক বছর ধরে আইনি লড়াই চলার পর জুনে বাড়িগুলো ভাঙার পক্ষে রায় দেয় ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছে, ভবন নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ভবন।

কিন্তু ফিলিস্তিনিরা বলছে, নিরাপত্তার অজুহাতে তাদেরকে শহর থেকে দূরে সরানো, ওই এলাকা দখল এবং নতুন ইসরাইলি বসতির দিকে রাস্তা তৈরির জন্য এই অভিযান চালানো হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই বেশ কিছু ভবন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এর বাইরে আরো কিছু ভবনে তল্লাশির কাজ শেষ করে সেনা সদস্যরা। রাত ২টা থেকে তারা লোকজনকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে বের করে দেয়া শুরু করে এবং যেসব বাড়ি ধ্বংস করতে চায়, সেগুলোতে বিস্ফোরক বসায়।

১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধে’ পশ্চিম তীর ও পূর্ব ফিলিস্তিনিদের একটি অংশের জায়গা দখল করে নেয় ইসরাইল। ২০০০ সালের দিকে জেরুসালেমের ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি বসতির মধ্যে প্রাচীর তুলে দেয় ইসরাইল।
বাড়িগুলো ভাঙার সাথে সাথে জরুরি বৈঠকে বসেন ফিলিস্তিনের শীর্ষ নেতারা। বৈঠক শেষে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ঘোষণা দেন, ইসরাইলের সাথে করা চুক্তিগুলো ফিলিস্তিনিরা আর মেনে চলবে না।

এ বাড়িঘর ভাঙা নিয়ে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে উত্তেজনা আবার বেড়েছে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট আব্বাস ইসরাইলের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইসরাইলই প্রথম চুক্তি ভঙ্গ করেছে বলে দোষারোপ করেছেন। গত ২৫ বছর ধরে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়েছে, তাতে নিরাপত্তা ও সহযোগিতাসহ নানা বিষয় ও কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত আছে। মাহমুদ আব্বাস বলছেন, এ ঘোষণা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা ঠিক করতে তারা এখন একটি কমিটি গঠন করবেন।

ফিলিস্তিনের এ সিদ্ধান্ত কতদূর পর্যন্ত যাবে তা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে ১৯৯৩ সালের অসলো শান্তিচুক্তিতে ইসরাইলকে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতিও এ সিদ্ধান্তের ফলে বাতিল হয়ে যাবে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। অসলো চুক্তির আওতায় অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুসালেম ও গাজায় ফিলিস্তিনের স্বশাসনের ভিত রচিত হয়েছিল। বোঝাপড়া হয়েছিল, ফিলিস্তিনিরা স্বশাসনের আংশিক অধিকার পাবে। আর ইসরাইল প্রথমে পশ্চিম তীরের জেরিকো ও পরে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। বিনিময়ে ইসরাইলি রাষ্ট্রের বৈধতা স্বীকার করে নেবে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)।

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এর আগেও ইসরাইলের সাথে অতীত সব চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়েছিলেন। তবে তা তিনি কখনো বাস্তবায়ন করেননি। ওদিকে ইসরাইলও অতীতে চুক্তি বাতিল না করার ব্যাপারে ফিলিস্তিনকে সতর্ক করেছে এবং বলেছে, এ পদক্ষেপ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের পতন ডেকে আনতে পারে।

ঝুঁঁকিতে দ্বিজাতি সমাধান
১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর দখলে রেখেছে ইসরাইল। প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি সেখানে বসবাস করে। তাদের সাথে রয়েছে কয়েক হাজার ইসরাইলি ইহুদি, যারা বিগত বছরগুলোতে সেখানে বসতি গড়েছে।

সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সঙ্ঘাত নিরসনে নেয়া দ্বিজাতি সমাধানে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ার বিষয়টি রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ এ ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দিচ্ছে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধে দখলকৃত অঞ্চলে বসতি স্থাপন অবৈধ।
ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি ফেরাতে যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলো জটিলতা সৃষ্টি করছে। সেই আলোচনা অবশ্য ২০১৪ সাল থেকে স্থবির হয়ে আছে। এখন পশ্চিম তীরে যদি ইসরাইল আরো বসতি সম্প্রসারণ করতে চায়, তাহলে দ্বিজাতি সমাধান আরো ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


আরো সংবাদ