২১ আগস্ট ২০১৯

ত্রাণ কাজে নৌকার দেখা নাই কেন?

-

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে শুরু হওয়া বন্যার তাণ্ডবে দেশের বানভাসিদের দুর্দশার যে সচিত্র প্রতিবেদন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে, তাতে বন্যার্তদের উদ্ধারে ও তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের প্রধান বাহন নৌকার অভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত ১১ বছর ধরে নৌকা প্রতীকের সরকার একটানা ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জেলা পরিষদ এবং পৌর ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নৌকা প্রতীকে হওয়ায় সর্বত্র প্রতীকে প্রার্থীদের শুধু জয়-জয়কার নয়, ১১ বছর ধরে শহর, বন্দর, হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্র আকাশে-বাতাসে অসংখ্য নৌকা দেখা গেছে। এখন নৌকার অভাবে বানভাসি মানুষকে অথৈই পানিতে হাবুডুবু খেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উঁচু জায়গার সন্ধানে যেতে হচ্ছে। কলাগাছের ভেলায় শিশু ও নারীদের বহন করা সম্ভব হলেও গৃহপালিত হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল নিয়ে তাদেরকে বিপাকে পড়তে হয়েছে।

টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বন্যাদুর্গত জনগণকে নিজেদের দুরবস্থার বিবরণ দিতে দেখা গেলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ইউপি, উপজেলা ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পৌরমেয়রদের তেমন দেখা নেই কেন? বন্যাদুর্গত এলাকার জনগণ তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা বলছেন। নির্বাচনের সময় নেতারা ভোট চাইতে এলেও এখন মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন না। কারণ, নির্বাচিতরা সবাই প্রতীকের জোরে একরকম বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ সদস্যরা বাজেট অধিবেশনের পর মন্ত্রী হওয়ার জন্য এবং নিজ এলাকার কতজন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে সরকারি খরচে খয়রাতি এবং হজযাত্রী হিসেবে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করাবেন, সেই তদবিরে ঢাকায় ব্যস্ত থাকায় তাদের দেখা পাওয়া ভার। দলীয় প্রতীকের সুবাদে প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের সহায়তায় ‘মধ্য রাতের নির্বাচনে’ তারা নির্বাচিত হয়েছেন বিধায় জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা নেই। আগামী নির্বাচনকালে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন থাকবে বিধায় ভবিষ্যতেও তাদের জয় নিশ্চিত বলে জনগণের দুর্ভোগ তাদের মনকে নাড়া দেয় না।

গত ১১ বছরে তিনবার সংসদ নির্বাচন, দু’বার করে ইউপি, উপজেলা পরিষদ, পৌর ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার কাজে নৌকা প্রতীকে গেট তৈরি করতে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে তার কিছু অংশ দিয়ে বন্যার্তদের জন্য নৌকা তৈরি করা হলে তাদের দুর্ভোগ অনেক লাঘব হতো। উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশ্বের ‘রোলমডেল’ বলে দাবি করা হচ্ছে। মাথাপিছু গড় আয় এক লাখ ৭০ হাজার টাকা হিসাবে ১৭ কোটি বঙ্গসন্তানের বার্ষিক আয় ২৮ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আমরা তো ইতোমধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশের রেকর্ড অতিক্রম করে উচ্চমধ্যম আয়ের লক্ষ্য অর্জন করতে চলেছি।

টেলিভিশন ক্যামেরার কল্যাণে বন্যাদুর্গত অঞ্চলের সাধারণ জনগণের আর্থিক অবস্থার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় না, দেশের দারিদ্র্য কমেছে। না কি দেশের দরিদ্র জনগণ বন্যাকবলিত অঞ্চলে বসবাস করেন? ১১ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থেকে সরকার সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন করার সক্ষমতা অর্জনের পরেও টেলিভিশন টকাররা কেন বলছেন, সরকারের একার পক্ষে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়? তাই বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ১১ বছরে সাত লক্ষাধিক কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তার মাত্র ১০ শতাংশ দেশে ফিরিয়ে এনে বন্যার্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ নির্মাণে ব্যয় করলে বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানই হবে না, বন্যার্তরা আর দরিদ্র থাকবে না।

ত্রাণ ও দুর্যোগব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী, যিনি রেকর্ডসংখ্যক চার লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি সরকারের ত্রাণ ভাণ্ডারের অবস্থা এবং ত্রাণ বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় নৌকার অভাবের বিষয়টি না পারছেন প্রকাশ করতে, না পারছেন চেপে রাখতে। বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম দেখেই তা বোঝা যায়। গত ১১ বছরে একমাত্র, সাভারের রানা প্লাজা ধস ব্যতীত বড় রকমের কোনো দুর্যোগের সম্মুখীর হতে হয়নি। রানা প্লাজার মহাদুর্ঘটনায় বিদেশী যে সাহায্য পাওয়া গেছে তা থেকেই নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। এদিকে খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে তাদের মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য গত ১০ বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা জনগণের দেয়া ট্যাক্স থেকে দেয়া হয়েছে।

এর সুফল ভোগ করে ঋণখেলাপিরা আজ শুধু কোটিপতিই নন, বিদেশেও ব্যয়বহুল সেকেন্ড হোম নির্মাণ করেছেন এবং সুইস ব্যাংকে তাদের জমানো টাকার অঙ্ক দিন দিন স্ফীত হচ্ছে। গত নির্বাচনে এরা জোটবদ্ধ হয়ে সরকারি দলকে শুধু সমর্থনই দেননি, নির্বাচনে জয়ে সাহায্যকারী প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছেন। এ কারণেই তারা নগ্নভাবে ভোট কাটায় ক্যাডারদের সহায়তা করায় তাদের পক্ষে ১০০ শতাংশ ভোট কাটা ‘দেয়া’ সম্ভব হয়েছে। জনগণের এজাহার দেয়ার যেন জায়গা নেই। জনগণের ভোটে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বর্তমান অবস্থার কিছুটা হলেও পরিবর্তন আশা করা যায়। কারণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতা হারানোর ভয় না থাকলে জনগণের দুঃখ কষ্টের প্রতি, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দরদ থাকে না।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তার ‘কাস্টিং’ ভোটের রায়ে এই দেশের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে গেছেন। পরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটারবিহীন নির্বাচন আদালত কর্তৃক বৈধতা পাওয়ায় নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছিল। এ জন্য মধ্য রাতে ১০০ শতাংশ ভোট কাটার নির্বাচন চালু হয়েছে। জনস্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হলেও ১০০ শতাংশ ভোট পড়ার মতো অনিয়মের কারণে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কেউ রিট করেন কেন? এই রিটের সাথে ১০ কোটি ভোটারের ভোটাধিকার জড়িত। জানি না, বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি কিভাবে মিলবে?


আরো সংবাদ