২১ আগস্ট ২০১৯

ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়

-

শক্তি নয়, ইচ্ছাই রাষ্ট্রের ভিত্তি- টি এইচ গ্রিন। হবস, লক এবং রুশোর মতে, ‘চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে’। প্রকৃতির নির্মম খেয়াল থেকে বাঁচা এবং জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্য পারস্পরিক চুক্তিতে উপনীত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি। বিভিন্ন রাষ্ট্র, জাতি, উপজাতি, বর্ণ ও গোত্রে বিভক্ত হলেও সবার মূল পরিচয় মানুষ। তাই তো দেশে-দেশে এত ভেদ-প্রভেদ থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ চিরন্তন। মানবাধিকার ও জন নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা একমাত্র রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।

আমার এক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জোর দিয়ে বললেন, ‘পৃথিবীতে যত চুক্তি হয়েছে (বিনা রক্তপাতে) এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ চুক্তি হলো, বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি (ছিটমহল বিনিময়)। উন্নত দেশ হলে উভয় দেশের সরকারপ্রধান নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতেন।’ ভাবলাম ছিটমহল সম্পর্কে জানব এবং লিখব। পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট এবং বইয়ের তথ্য সূত্রে জানলাম অনেক অজানা ইতিহাস। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের নির্মমতার শিকার বা অতীত রাজন্যবর্গের খামখেয়ালিপনা অথবা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতীক হলো ছিটমহল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কুচবিহারের রাজা এবং রংপুরের মহারাজা তিস্তার তীরে তাসখেলায় বাজি ধরতেন ছিটমহলের মালিকানা নিয়ে। ‘ছিট’ শব্দের অর্থ খণ্ড বা টুকরা। বিভিন্ন মহালকে এক একটি খণ্ডে বিভক্ত করার পরে এর নাম হয় ছিটমহল। ছিটমহল (Enclave) হলো রাষ্ট্রের এক বা একাধিক ক্ষুদ্র অংশ, যা অন্য রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত।

A Piece of territory surrounded by foreign dominion is Enclave. অর্থাৎ এক ধরনের দেশহীন মানুষের আবাসস্থল ছিটমহল। জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে মোগল সম্্রাট শাহজাহানের আকস্মিক অসুস্থতার কারণে কুচবিহারের রাজা প্রাণনারায়ণ কামরূপের সুবেদার মীর লুৎফুল্লাহকে আক্রমণ করে মোগল সাম্রাজ্যের বেশ কিছু অংশের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে আরোঙ্গজেবের নির্দেশে বাংলার সুবেদার মীর জুমলা বিশাল বাহিনী নিয়ে কুচবিহার আক্রমণ করেন এবং মোগল সাম্রাজ্যের হৃত অংশগুলো পুনরুদ্ধার করে রাজধানী কুচবিহারও অধিকার করে পরে ইসফান্দিয়ার বেগকে কুচবিহারের দায়িত্ব দেন। রাজা প্রাণনারায়ণ পালিয়ে গিয়ে শক্তি সংগ্রহ করে নিজের রাজ্য উদ্ধার করেছিলেন। তখন থেকেই মোগলদের সাথে দফায় দফায় সে রাজার যুদ্ধ লেগেই থাকত, যা শেষ হয় ১৭৭২ সালে।

কুচবিহারের রাজা হলেন শান্তনু নারায়ণ। তখন খাঞ্জা খাঁ কুচবিহারের বোদা, পাটগ্রাম এবং পূর্বভাগ নামের চাকলা তিনটি অধিকার করেন। ওই রাজা বেনামে চাকলা তিনটি ইজারা নেন। অন্য ভূ-সম্পত্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত হলেও মূলত এ তিনটি চাকলার অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলোই কুচবিহারের ছিটমহল। পরে বহু বছরব্যাপী খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের ফলে কুচবিহার রাজ্যের বেশ কয়েকটি ভূ-খণ্ডে মোগলদের কর্তৃত্ব কায়েম হয় এবং কালক্রমে এ অংশগুলো রংপুরের জমিদারির অধীনে চলে আসে, যা পরে ‘রংপুরের ছিটমহল’ নামে পরিচিত। সেই ভূখণ্ড মূল সম্পত্তির সাথে নয়। তবে ঠিকই খাজনা আসত রাজা বা জমিদারের তহবিলে। ১৭৮৯ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে ইংরেজরা কৌশলে কুচবিহারের রাজাকে নিজেদের বশে নিয়ে আনে। সে প্রেক্ষাপটে প্রথমেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কুচবিহার রাজার কাছ থেকে বোদা, পাটগ্রাম ও পূর্বভাগ-এ তিনটি চাকলা অধিকার করে কুচবিহারের রাজাকে ফিরিয়ে দেয়।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় সমস্যা বাধে কুচবিহারকে ঘিরে। কুচবিহারের রাজা জগদ্বীপেন্দ্র নারায়ণের কিছু জমিদারিস্বত্ব ছিল বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার আওতাধীন। অপর দিকে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারদের কিছু তালুক ও জোত ছিল কুচবিহারের সীমানার মধ্যে। দু’পক্ষ সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের এবং ভারতের মধ্যে বাংলাদেশের কিছু এলাকা পড়ে যায়। দেশ বিভাগের মতো এত বড় জটিল কাজটি করতে গিয়ে (৮ জুলাই ১৯৪৭ থেকে ১৩ আগস্ট ১৯৪৭) স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ অখণ্ড ভারতের দীর্ঘ দিনের স্থল ও জলযোগাযোগ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সমন্বিত অর্থনীতি ও স্থিতি সম্পন্ন এলাকা, ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব-পশ্চিম দুই অঞ্চলের দুটি প্রদেশ বাংলা ও পাঞ্জাবকে ম্যাপের ওপর দাগ টেনে ভাগ করেন। সীমারেখা নির্ধারণী Top Sheet এর মূলকপি ১৬ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রকাশ করা হলে বিতর্কের ঝড় ওঠে এবং সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় ছিটমহলবাসীর ১৬২টি ছোট বড় ভূ-খণ্ড অনিষ্পন্ন অবস্থায় রাখা হয়।

ফলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে এই অঞ্চলকে ‘বিধ্বস্ত বলয়’ (Shattered Belt) বলা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার শিকার হয়ে ছিটমহলবাসীর অবস্থা অত্যন্ত করুণ ও জটিল। নাগরিক অধিকার বঞ্চিত, নিপীড়িত অসহায় মানুষগুলো সম্ভ্রমহানির ভয়ে মেয়েদের সন্ধ্যা হলেই লুকিয়ে রাখত, শান্তিতে ঘুমাতে পারত না, হাসপাতালে গেলে ডাক্তাররা তাদের দেখতেন না, বলতেন, দু’দিন পরে আসো এবং গর্ভবতী মহিলাদের সন্তান জন্মদানের সময় ভর্তি করা হতো না। কাজলাদীঘি ছিটমহলের বাসিন্দা হবিবর অসম্ভব মেধাবী ছোট মেয়েকে আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায়, পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। মেয়েটি এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেলে তার পিতৃ-পরিচয় জানাজানি হয়ে যায়। দেশী-বিদেশী সংস্থা মেয়েটির পড়াশোনার সহযোগিতা করতে আগ্রহী হলে আইনগত সমস্যা দেখা দেয়।

এ অবস্থায় মেয়েটিকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হলেও সে পড়াশোনা ছাড়তে চায়নি এবং দিনরাত কান্নাকাটি করেছে। খাগরাবাড়ি সরকারপাড়া ছিটে সুরতন বেগমের জন্ম হওয়ায় বিয়ে হলেও তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হয়নি। নিরুপায় বাবা তাই জামাই এনে ঘরে রেখেছিলেন। কোর্টভাজনী ছিটের স্বপন চন্দ্র রায় গোপনে বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পরে পুলিশের চাকরিতে উত্তীর্ণ হলেও নাগরিকত্বের জটিলতায় চাকরি হয়নি এবং বর্তমানে তার চাকরির আর বয়স নেই। মনছুর আলী মিয়া বলেন, ১৯৬৬ সালের পর ৭ বছর আমরা গ্রাম থেকে বের হতে পারিনি। গ্রামে হকার আসত। আমরা গ্রাম থেকে বের হলেই ভারতের পুলিশ তাড়া করত। ১৯৯২ সালে শালবাড়ি ছিটমহলে শালবনের গাছ কেটে ফেলেছিল দুষ্কৃতকারীরা। তারা ধরা পড়লে উভয়পক্ষের মারামারিতে মারা যায় একজন, আহত অনেক, ৫০০ বাড়িতে আগুন, নির্বিচারে লুটতরাজ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ বন্ধ, অবরোধ এবং সারারাত চলে নারী নির্যাতন। ঘটনাগুলোর বিচার করা তো দূরের কথা, তদন্ত পর্যন্ত হয়নি।

র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ, বাউন্ডারি কমিশনের রিপোর্ট, নুন-নেহরু চুক্তি, ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও দীর্ঘ ৬৮ বছর (পরপর ৩টি প্রজন্ম) বিচ্ছিন্ন ভূ-খণ্ডের অবহেলিত, নাগরিকত্বহীন মানুষেরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন, যাকে বলা যায়, সভ্য সমাজের এক ‘কলঙ্ক তিলক’। জাতিসঙ্ঘ সনদে Protocol to the Internationl Covenant on Civil & Political Rights Gi 4.3 (3) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে ‘রাষ্ট্র সকলের আত্মবিকাশের সমান সুযোগ প্রদান করিবে।’ অন্যত্র জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক শিশুর একটি জাতীয়তা লাভের অধিকার থাকিবে।’

কথাগুলো একদিন ছিল কাগজে আর কলমে, বাস্তবে নয়। শেখ হাসিনা সরকার ১৯৯৬ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির সূত্র ধরে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে এ ব্যাপারে ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশে সফরে এলে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে ছিটমহল বিনিময় ও সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত বিলটি (পানির সীমানা পূর্বেই মীমাংসিত) ৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয়। ভারতে নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় এলে ছিটমহলবাসীর দীর্ঘ দিনের করুণ আর্তনাদ কর্ণগোচর হয়। ৭ মে ২০১৫ সালে ১১৯তম (প্রকৃতকক্ষে ১০০তম স্থলসীমান্ত চুক্তিসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল (ছিটমহল বিনিময়) লোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছিল। বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল (লালমনির হাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি, নীলফামারীতে ৪টি; মোট ১৭ হাজার ১৬০.৬৩ একর এবং জনসংখ্যা ৩৭৩৮৬ জন) বাংলাদেশ পেল এবং ভারতের মধ্যে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (কুচবিহারে ৪৭টি, জলপাইগুড়িতে ৪টি; মোট ৭ হাজার ১১০.০২ একর; জনসংখ্যা ১৪০৯০ জন) ভারত পেয়েছে।

বসবাসরত মানুষ তাদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো দেশের অভ্যন্তরেই থেকে যেতে পারলেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ভারতের দখল করে রাখা ২২৬৭.৬৮২ একর এবং ভারত বাংলাদেশের দখল করে রাখা ২৭৭৭.৩৮ একর জমি যার যা দখলে আছে, সে তার মালিকানা পেয়েছে। তদুপরি নীলফামারী-পশ্চিমবঙ্গ, ফেনীর মুহুরী নদী-ত্রিপুরা, লাঠিটিলা ও ডুমাবাড়ী-আসাম সীমান্তে ৬.৫ কিলোমিটার অমীমাংসিত সীমারেখা চিহ্নিত করা হবে এবং উত্তরবঙ্গে তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকল। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছিল ছিটমহল বিনিময়ের খবর। সাবেক ছিটমহলবাসীদের জীবন ধারা বদলে গেছে। দাসিয়ারছড়ার ছোট কামাত গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছোবেয়া খাতুন (৫১) বলেন, ‘ভাবিনি কোনো দিন বাঁচার অবলম্বন পাবো। প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে নতুন করে জীবন পেয়েছি।’ কালিরহাটের জয়নাল (৪৬) দৈনন্দিন রোজগারের অবলম্বন একটি ভ্যান পেয়ে স্ত্রী সন্তানদের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে পারছেন।

সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় জীবনের শেষ আশ্রয় একটি ঘর পেয়ে স্বস্তিতে আছেন আশ্রয়হীন ভবঘুরে, বালাতাড়ি গ্রামের হাতেম আলী, মংলু চন্দ্র, জংলু চন্দ্র। কামালপুর গ্রামের আবুবক্কর সিদ্দিক (৭৯) বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের আপন করে নিয়েছেন। তার কাছে ছিটমহলবাসী সারাজীবন কৃতজ্ঞ।’ ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন কাটাচ্ছিলেন রাশমেলা গ্রামের জহিরন, জমিলা ও রাশেদা। বিধবা ভাতা পেয়ে তারা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন।

পুষ্টি প্রোগ্রামের আওতায় সন্তান আর নিজের জন্য পরামর্শ, ওষুধ ও খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন বালাতাড়ি গ্রামের মুক্তা বেগম, জহিরন ও তানিয়া। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, আকাশ সংস্কৃতি, বিদ্যুৎ সংযুক্তিসহ আধুনিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে স্বপ্ন নয় বাস্তবে দৃশ্যমান হচ্ছে। দুই দেশের ছিটমহলবাসীর ২০১২ সালে ছিল সম্মিলিত সেøাগান, ‘দাও নাগরিকত্ব, নয় মৃত্যু।’ ২০১৫ সালে এসে তা পূর্ণতা পেল। জয় হয়েছে মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং মনুষ্যত্বের। নবনব প্রজন্ম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আলোর পথে এগিয়ে যাবে, সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করবে।

লেখক : শিক্ষক
[email protected]


আরো সংবাদ