২১ আগস্ট ২০১৯

‘জুয়া’র জন্য প্রণোদনা!

-

গত ৩০ এপ্রিল সংসদের সমাপনী বক্তৃতায় ‘পুঁজিবাজার’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিস্মিত ও হতাশ করেছে। ‘শেয়ারবাজার অনেকটা জুয়া খেলার মতো। বাজার যাতে বেশি না ওঠে বা পড়ে, সে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ কথা শুনে মনে হলো, তাকে পুঁজিবাজার নিয়ে ভুল বুঝানো হয়েছে। সঠিক অবস্থা জানলে তিনি এ কথা বলতেন কি? তাই প্রকৃত অবস্থা জানানোর চেষ্টা হিসেবে এ লেখা। জুয়ার বাজারে কেন প্রণোদনা দেবেন? এটা কি আসলে ‘জুয়ার বাজার’? অর্থমন্ত্রী একবার বলেন, পাঁচ লাখ কোটি টাকা দিলেও পুঁজি বাজারে থাকবে না।

তাহলে এ বাজার কেন তলাবিহীন বাজার? আবার তিনি বলেন, প্রণোদনা দেবেন। কী বুঝে প্রণোদনা দেবেন? আগের অর্থমন্ত্রীর মতো উল্টাপাল্টা কথা বলে বাজার শেষ করে দেবেন না। এ বাজার ইতোমধ্যেই বহু মানুষের প্রাণঘাতী হয়েছে। অতি লোভে নয়, বরং লাভের আশায় বাজার আর কোম্পানিকে নির্ভরযোগ্য মনে করেই বিনিয়োগ করা হয়। সৎ, আল্লাহভীরু এবং যোগ্য কর্তৃপক্ষই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। না হয় শুধু কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করলেই পুঁজিবাজার ঠিক হবে না। সূচক ১০ বছর আগে যা, ১৩০ কোম্পানি আসার পরও তা রয়ে গেছে কেন?

২০১০ সালে পুঁজিবাজার পতনের অন্যতম কারণ ছিল ব্যাংকগুলোর বেপরোয়া ঋণ, আমানতের ১০ শতাংশের স্থলে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেয়া, সাথে গুজব ও কারসাজি। ৯ শতাংশ ঋণ দেয়ার পর সাবধান হলে বাজারকে আকাশে তুলে এভাবে আছাড় মারা যেত না, বিনিয়োগকারীরা এসব জানতেন না, কিন্তু যারা জানতেন তারা কেন এমন করলেন? ২০১৯ সালে বাজারে ধস নামার প্রধান কারণ হচ্ছে শেয়ারবাজারে নিম্নমানের কোম্পানির স্তূপ ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত এবং অতি উচ্চমূল্যে ভিত্তিহীন নিম্নমানের শতাধিক কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে যেমন পুঁজি নিয়ে গেছে; তেমনি কোম্পানিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ায় বাজার ধপাস করে পড়ে দিশাহারা হয়ে গেছে।

অনেকেই বাজার খারাপ হওয়ার কারণ খুঁজে পান না। টাকা ছাড়া কেবল মুখের কথায় বাজার চলে না। নতুন কোম্পানিগুলো ভালো হলে সে আয় দিয়েই বাজার সুন্দর পুঁজিতে চলত, এখন তাও হচ্ছে না। দেশে এমন কোনো দুর্যোগ হয়নি যেভাবে কোম্পানির আয়-উৎপাদন হঠাৎ কমে যাবে বা বন্ধ করে দেয়া হবে।

নতুন কোম্পানিগুলো খারাপ হওয়ার পরও ১০-১৫ গুণ আবেদন পড়ত। এতে অনেকেই উৎফুল্ল হতেন; সেটি ছিল মারাত্মক ভুল। কারণ এক দিকে এসব কোম্পানির হিসাব কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে ‘খুব ভালো’ দেখানো হতো। একজন বিনিয়োগকারীর পক্ষে সে হিসাবের বাইরে চিন্তা করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কী দেখে এত ভুল কোম্পানির অনুমোদন দিয়ে মানুষকে বিপদে ফেলল? তাদের বিচার কে করবে? তা ছাড়া, বাজারের অবস্থা খারাপ হওয়ায় অনেকেই সেকেন্ডারি মার্কেটে না ঢুকে শুধু আইপিও কিনতেন। বাজার যত খারাপ থাকবে আইপিওতে আবেদনের সংখ্যাও তত বেশি হবে। আপাতত বাজার ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আইপিও বন্ধ রাখা হোক। এ কথা আগেও বলা হয়েছে, কর্ণপাত করা হয়নি।

বলা বাহুল্য, পুঁজিবাজার জটিল হলেও দুর্বোধ্য কিছু নয়। একটি সুপার মল বা সাধারণ দোকানে যেমন ভালো মালামাল বিক্রি হয়, খারাপগুলো ফেলে দিতে হয়; তেমনি পুঁজিবাজারও তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বা অংশ বেচাকেনার বাজার। কোম্পানি ভালো আয় করলে সে শেয়ারের দাম বাড়ে; না হয় কমে যায়। এ বাজারের বিনিয়োগ গ্রহণকারী কোম্পানিরা সুদ দেয়ার জন্য যে বড় অঙ্কের টাকা দেয়, এজন্য ভাবতেই হয় না। তারপরও কেন বাজার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়?

যে কোম্পানি ভালো করবে আশা করা যায়, সে কোম্পানির শেয়ার, যে যত তাড়াতাড়ি কিনতে পারে, সেজন্য চেষ্টা করে। এটা হলো পুঁজিবাজারের নিয়ম। কিন্তু কেউ যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় দফা হিসেবে ‘লাভজনক’ দেখিয়ে শেষ দফা আশ্চর্যজনকভাবে চরম লোকসান দেখায়, সেখানে দায় কার? বিগত বছরগুলোতে এমন অহরহ ঘটেছে। পুঁজিবাজারকে যদি ‘বিএসটিআই’র মতো কিছু দিয়ে বাছাই করা যেত, তখন দেখা যেত কত পচা কোম্পানি ঢুকানো হয়েছে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেত। তখন বাজারের দাম ওঠানামাও নিয়মমতো হবে। নিয়ন্ত্রণ করলে অবস্থা খারাপ হতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তাহলে শেয়ারবাজার কি জুয়া খেলার মতো? তাহলে জুয়াড়িদের ধরুন না। জালিয়াতি করে জীবিকা আহরণের এ জায়গাটিকে ধ্বংস করা হয়েছে। ৭০ বছরের এ বাজারে শুধু আপনার সময় তিনবার (১৯৯৬, ’১০, ’১৯) এমন পতন হলো। ভুল বিনিয়োগ করেও এত লোকসান হয়নি, কেননা তখন ভালো কোম্পানি বেশি ছিল। অসৎ ও ব্যর্থ কোম্পানিকে বাইব্যাক বা বিক্রি করে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব।


আরো সংবাদ