২১ আগস্ট ২০১৯

ভিআইপি সংস্কৃতি প্রভুত্ববাদী মানসিকতা

-

যুগ্মসচিবের অপেক্ষায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ফেরি ছাড়ায় স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা রিটের শুনানিতে ভিআইপি প্রটোকল বিষয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নন, বাকিরা সবাই প্রজাতন্ত্রের চাকর। বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ৩১ জুলাই এ মন্তব্য করেছেন। ৩০ জুলাই তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যুগ্মসচিব ও ফেরি ম্যানেজারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট দায়ের করা হয়।

নড়াইল কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র তিতাস মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তাকে খুলনার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য আইসিইউ সংবলিত একটি অ্যাম্বুলেন্সে ২৫ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির উদ্দেশে রওনা দেন পরিবারের সদস্যরা। ওই রাত ৮টায় কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথের মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি এক নম্বর ভিআইপি ফেরিঘাটে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্সটি। তখন কুমিল্লা নামে ফেরিটি ঘাটে যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্মসচিব পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাবেন বলে ওই ফেরিকে অপেক্ষা করতে ঘাট কর্তৃপক্ষকে বার্তা পাঠানো হয়। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরিতে ওঠে অ্যাম্বুলেন্সটি। কিন্তু এর মধ্যে #মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তিতাস।

আমরা সবাই জানি, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। সংবিধান অনুযায়ী, সব সময় জনগণের সেবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কাজ। এ কর্তব্যের অংশ হিসেবেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অর্পিত দায়িত্ব সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করতে হয়। দায়িত্ব পালনে অতিকথন বা বেফাঁস বক্তব্যের আইনগত কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানের প্রথম ভাগে ৭-এর (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ ১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানে জনগণের সার্বভৌমত্ব, সুপ্রিমেসি ও অধিকার উচ্চকিত আছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও দেশে জনগণের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বরং পাবলিক সার্ভেন্টদের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিছু মানুষের প্রভুত্ববাদী মানসিকতায় সংবিধানের মূল চেতনা লঙ্ঘিত হচ্ছে।

প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের দেয়া করের টাকায় রাষ্ট্র চলে। আমরা যারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেতনভাতা, যানবাহন, আবাসনসহ বিভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্ত হই, তা জনগণের করের টাকায়। জনগণের করের টাকায় প্রজাতন্ত্রের সব খরচ নির্বাহ হয়ে থাকে। সংবিধান, আইন, নৈতিকতা কোনো দিক থেকেই জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তারা লাট বাহাদুর নন। বেতন নেবেন জনগণের টাকায়, শপথ নেবেন সংবিধান সমুন্নত রাখার, অঙ্গীকার করবেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কাজ করার; কিন্তু জনগণকে অবহেলা করবেন এটি হতে পারে না। এটি স্ববিরোধী।

নব্বইয়ের দশকেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দায়িত্বের প্রয়োজন ছাড়া সংবাদমাধ্যমে বা জনসমক্ষে কোনো বক্তব্য দেয়ার নজির খুব একটা ছিল না। ওই সময়ে দায়িত্বের প্রয়োজনে সংবাদমাধ্যম বা জনসমক্ষে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রেও তাদের পরিমিতবোধ ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের পর থেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সংবাদমাধ্যমে বা জনসমক্ষে দায়িত্বের প্রয়োজন ছাড়াও বক্তব্য দেয়ার শুরু। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে অতিকথন ও বেফাঁস বক্তব্য। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে আচরণবিধির প্রয়োগ তেমন একটা না থাকায় বর্তমানে তা প্রকট হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এখন প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে জনসমক্ষে ও সংবাদমাধ্যমে অহরহ বক্তব্য দিচ্ছেন; যা তাদের ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করছে। জনমনে আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।

সংবিধানের ৩৯ (২) বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইন দিয়ে আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য বাধানিষেধের অতিরিক্ত চাকরি সংক্রান্ত বিধিবিধান দিয়ে আরোপিত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী তার বাকস্বাধীনতার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাদের জন্য প্রযোজ্য সরকারি কার্যবিধি ও আচরণবিধির বিধান উপেক্ষা করে বাকস্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন না। আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারেন না।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচিত। কেননা, সরকারের রাজনৈতিক মুখপাত্রের কাজ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর দায়িত্বের অংশ নয়। যার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর কোনো কথা রাজনৈতিক বক্তব্যের পর্যায়ভুক্ত হলে, তা আচরণবিধি পরিপন্থী। আচরণবিধির পরিপন্থী যেকোনো কাজ অসদাচরণ হিসেবে গণ্য। অসদাচরণের জন্য চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড প্রয়োগযোগ্য। অথচ আমাদের পদ্ধতিটি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীকে পাবলিক সার্ভেন্টের পরিবর্তে ‘লর্ড অব পাবলিক’ বানিয়েছে। যোগদানের আগ মুহূর্তে তিনি দেশ, সংবিধান ও জনস্বার্থের প্রতি চির-আনুগত্যের অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করেন। কিন্তু সিস্টেম তাকে জনসেবকের পরিবর্তে জনশাসকে পরিণত করে। এ মানসিকতা শুধু পাবলিক সার্ভিসে নয়, এটি সর্বব্যাপী। আমরা যেকোনো সবল ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত দুর্বলের ওপর প্রভুত্ব করা বা অযথা হয়রানি, অবজ্ঞা, অবহেলা করার মানসিক রোগে আক্রান্ত। নিজের থেকে উঁচু স্তরে আপ্রাণ তৈলমর্দন এবং নিম্নে অবস্থানকারীদের প্রতি উল্টো আচরণ বাঙালির অস্থিমজ্জায় মিশে আছে।

প্রত্যেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিচারপতি ও সাংবিধানিক পদমর্যাদায় নিযুক্ত সবাইকে শপথ গ্রহণ করতে হয়। সিভিল সার্ভিসে যোগদানের আগ মুহূর্তে সবাইকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে তা দাখিল করতে হয়। সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অঙ্গীকারনামার বাইরেও পাসিং আউট প্যারেডে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ সামনে নিয়ে শপথ করেন। প্রজাতন্ত্রের সুবিধাজনক পদে থেকে জনগণের ওপর সুপ্রিমেসি একটি প্রভুত্ববাদী মানসিকতা। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক কর্মচারী সরকারের কার্যবিধিমালা ও আচরণবিধি অনুসরণ করবেন। আর সরকারও আচরণবিধির যথাযথ প্রয়োগ করবে- এটিই জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


আরো সংবাদ