২১ আগস্ট ২০১৯

নাগরিক সাংবাদিকতা

-

মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করতে পারেননি। এরই মধ্যে জনৈক এক ব্যক্তি ফেসবুক-টুইটারে ঘটনাস্থলের খবর ছড়ানো শুরু করেছেন। সাধারণ একজন নাগরিকের সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারটা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর বিশালত্ব নিয়ে গবেষণা করা যায়, অস্বীকার করা যায় না। বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে চার পাশের খবর আগের চেয়ে এখন বেশ সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

নিঃসন্দেহে ব্যাপারটা ভালোই বলতে হয়। কিন্তু বিশ্বের সবটাই যেমন সাদা আর কালো নয়, ভালো-মন্দের পাশাপাশি মিশ্র অবস্থা বা ধূসর কিছু অংশও থেকে যায়। পেশাগত সাংবাদিকদের মতোই সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার ব্যাপারটাও সে রকমই। নাগরিক সাংবাদিকতা মানুষকে ঘরে বসে অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ করে দেয়। সোস্যাল মিডিয়ার জয়জয়কারের বর্তমান বিশ্বে খবর ছড়াতে সময় লাগে না। আশপাশের খবরাখবর সহজেই যখন পাওয়া যাচ্ছে। তখন প্রথাগত গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা কী ফুরিয়ে যাচ্ছে? এ প্রশ্ন অনেকেই করছেন। কিন্তু বিষয়টি এত সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ, একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সাংবাদিকতার মতো গুরুদায়িত্ব কোনো প্রশিক্ষণ, দায়বদ্ধতা আর সম্পাদনার কাটছাঁট ছাড়া পালন করা সম্ভব কি না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা বা সত্যতা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। প্রশ্ন তো প্রথাগত গণমাধ্যমের বেলায়ও থাকতে পারে। তাই পুরো বিষয়টি বুঝতে নানা দিক থেকে বিচার-বিবেচনা আর বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন। সব কিছুর আগে সাংবাদিকতার আদ্যোপান্ত জেনে নেয়া জরুরি।

সাংবাদিকতা মানে, চার পাশের খবর, তথ্য সংগ্রহ করে তা যথাযথ সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ, প্রচার বা উপস্থাপন করা। এটি একটি পেশা। অর্থাৎ যে পেশাদার ব্যক্তি কোনো গণমাধ্যমের জন্য সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ প্রস্তুত বা সম্পাদনার কাজ করেন; তাকে সাংবাদিক বলা হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম এক অপরিহার্য উপাদান। এতটাই অপরিহার্য যে, সংবাদমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলে অভিহিত করা হয়। একটি রাষ্ট্রের মূল উপাদান তিনটি ধরা হয়- আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ আর বিচার বিভাগ। সংবাদমাধ্যমের অপরিহার্যতার কারণে চতুর্থ উপাদান হিসেবে এ ফোর্থ এস্টেট নামকরণ করা হয়েছে।

কিছু পেশা থাকে যা আর দশটা পেশা থেকে আলাদা। অর্থাৎ সেসব পেশার মানুষকে বাকিদের থেকে বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়, নতুবা ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে। সাংবাদিকের ছোট্ট একটি ভুল তথ্যের কারণে পুরো একটি দেশের ভেতর তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। আবার তথ্যটি যদি ভুল নাও হয়, শুধু সঠিকভাবে উপস্থাপিত না করা হয়, এতেও একই রকম সমস্যা হতে পারে। এখানে একজন পেশাদার সাংবাদিকের সার্থকতা। একজন পেশাদার সাংবাদিক খবর ও তথ্য সংগ্রহে যথাযথ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তথ্যের সত্যতা যাচাই করেন। সবশেষে যথাযথভাবে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। পুরো কাজটি কারো একার কাজ নয়, একটি খবর সংগ্রহ থেকে শুরু করে যাচাই, সম্পাদনা ইত্যাদির ব্যাপারে অনেক সাংবাদিক কাজ করেন।

একটা নির্দিষ্ট প্রকাশিত খবরের জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক এবং ওই সংবাদমাধ্যম দায়বদ্ধ থাকে। অর্থাৎ পরবর্তীতে খবরটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে বা প্রকাশের ফলে কোনো ক্ষতিকর কিছু ঘটলে তাকে দায়ী থাকতে হয়। ফলে এখানে একটা দায়িত্বশীলতা রক্ষার চেষ্টা সংবাদমাধ্যমগুলো করে থাকে। তথ্য ও খবর ভালোভাবে যাচাই করে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়।

খবর সংগ্রহে সাধারণের চেয়ে সাংবাদিকদের থাকতে হয় বেশি পারদর্শিতা। যেটা তাদের অর্জন করতে হয় মাঠে ময়দানে সময় ব্যয় করে এবং শিখে। খবর সংগ্রহে তাদের প্রাণ সংশয়ে পড়ার মতো ঝুঁকিও নিতে হয়। এটি তাদের পেশাগত জীবনেরই একটা অংশ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা মাঝে মধ্যে গোয়েন্দাদেরও হার মানান। সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংবাদকর্মীরা পেশাগত নৈতিকতা মেনে চলার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকতায় নৈতিকতার মূলনীতিগুলো সংক্ষেপে বলতে গেলে সত্যের অনুসন্ধান করা, নিরপেক্ষ থাকা, তথ্য সংগ্রহে কারো ক্ষতির কারণ না হওয়া, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জবাবদিহি করা ইত্যাদি।

নাগরিক সাংবাদিকতা বলতে বোঝায় যখন একজন সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় খবর বা তথ্য সংগ্রহ করে ব্লগ, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইত্যাদিতে প্রকাশ করে থাকে। এসবে লেখা, ছবি, ভিডিও সবই থাকতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের অনেক ঘটনার খবর আজকাল ব্লগে বা সামাজিকমাধ্যমে পাওয়া যায়। যেমন- কোনো একটি সম্মেলনের ঘোষণা আগে পত্রিকা মারফত জানতেন, এখন ফেসবুক-টুইটারে কোনো গ্রুপ থেকে জানতে পারছেন। আবার কোনো জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটলে টিভি চ্যানেল পৌঁছানোর আগে ফেসবুকে লাইভ দেখাতে পারেন যেকোনো আগ্রহী নাগরিক সাংবাদিক। নাগরিক সাংবাদিকতার যুগে সাধারণ ব্যক্তিও এখন খবর জোগান দিতে পারেন।

বিশেষ করে ব্লগ সাইটগুলো যারা নিয়মিত দেখেন, তারা সেখান থেকে অনেক সংবাদ বা বিভিন্ন বিষয় জানতে পারছেন, আগে তারা যা সংবাদমাধ্যম থেকে জানতেন। মূলত ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা নতুন এ দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ইদানীং অনেক প্রথম শ্রেণীর সংবাদমাধ্যম নাগরিকদেরও খবর সংগ্রহ করে পাঠানোর ব্যবস্থা রেখেছে।

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে সারা বিশ্বেই প্রথাগত সংবাদমাধ্যম এখন মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যদিও মূল কারণটি নাগরিক সাংবাদিকতা নয়, বিজ্ঞাপন। সংবাদমাধ্যম মূলত বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে আয় করা লভ্যাংশ দিয়ে চলে। কিন্তু ইন্টারনেটের যুগে গুগল, ফেসবুক বিজ্ঞাপনের সিংহভাগ নিয়ে যাওয়াতে সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞাপন সঙ্কটে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে এটি ঠিক, নাগরিক সাংবাদিকতা কোনোভাবেই প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হতে পারে না। অনেকগুলো কারণ রয়েছে এর পেছনে। নাগরিক সাংবাদিকেরা কেউই পেশাদার নন। প্রচলিত আইনের কারণে তারাও তাদের প্রকাশিত খবরের জন্য দায়বদ্ধ। যদিও তথ্যের সত্যতা, বস্তুনিষ্ঠতার নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। নাগরিক সাংবাদিকতার ভূমিকা হওয়া উচিত ‘সহায়ক’ হিসেবে।

প্রথাগত সাংবাদিকেরা যেভাবে সরেজমিন সংগ্রহ করেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খবরের সত্যতা যাচাই করেন, তা নাগরিক সাংবাদিকতায় একজন ব্যক্তির একার পক্ষে সম্ভব নয়। সংগৃহীত খবর সম্পাদকের কাটাছেঁড়ার পর নানাভাবে যাচাই হয়ে তারপর ছাপার হরফে বেরিয়ে আসে। নাগরিক সাংবাদিকতায় প্রায় ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক যা মনে হলো সেটিই হয়তো দাঁড় করানো হয়। তার ওপরে এটি তার পেশা নয়, কাজের ফাঁকে শখের বশে করা। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে সঠিক তথ্যের যে বিপুল চাহিদা তা পূরণে পেশাদার সংবাদমাধ্যমের বিকল্প নেই।

যেকোনো সময়ের চেয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা এখন সবচেয়ে বেশি। কারণ, এখন চার দিকে বিপুল তথ্যের ছড়াছড়ি, চাইলেই প্রয়োজনের থেকেও বেশি তথ্য এসে হাজির হয়। এরকম পরিস্থিতিতে পেশাদার সাংবাদিকতার প্রয়োজন সব থেকে বেশি। তাই বলা যায়, বিকল্প মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সহায়তা করার মাধ্যমেই নাগরিক সাংবাদিকতা বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। নাগরিক সাংবাদিকতা বর্তমান সময়ের এক নতুন শক্তির নাম, এতকাল মানুষ শুধু একতরফাভাবে খবর পড়েছেন। এখন খবর পড়া এবং সরবরাহ করা দু’দিকেই অবস্থান নেয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ মানুষকে আরো শক্ত অবস্থান দিয়েছে। এ সুযোগের সঠিক ব্যবহার ও গঠনমূলক চর্চা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার এ ‘ফোর্থ এস্টেট’কে শক্তিশালী করবে। সত্যিকারে সুফল ভোগ করতে সব পক্ষকেই আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।


আরো সংবাদ