১৫ নভেম্বর ২০১৯

আফগানিস্তানে নতুন যুগের সূচনা হবে কি

-

আফগানিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বন্ধনের শত বছর উদযাপনের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। দুই দেশ শত বছর আগে শুরু হওয়া, গভীর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ। আফগানিস্তানের বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বেশির ভাগ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সামরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার সাথে সম্পৃক্ত। আফগানিস্তান ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের মাত্র দু’বছর পর ১৯২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি অর্জন করে।

ফলে দু’দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯ সালে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আইজেন হাওয়ার আফগানিস্তান সফর করেন। একইভাবে বাদশাহ জহির শাহ আফগান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। অপর দিকে, প্রধানমন্ত্রী সরদার দাউদ খান হচ্ছেন প্রথম আফগান যিনি মার্কিন কংগ্রেসে বক্তৃতা করেছেন। গোটা দশকব্যাপী দু’দেশের মধ্যে পারস্পরিক সফর বিনিময় ও যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়ন অব্যাহত থাকে। প্রধানমন্ত্রী সরদার দাউদ খান ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় আমেরিকাকে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সহায়তা প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ওই অনুরোধ রাখেনি। বরং তারা এর পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহায়তা দানের ব্যাপারে আলোকপাত করেন।

আফগানিস্তানে কিভাবে ধীরে ধীরে এবং ক্রমান্বয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র হিসাবে ভুল করে ফেলে। ওই অঞ্চলে মস্কোর কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে এবং তারা দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ঢোকার প্রবেশপথ হিসেবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিল। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্ররোচনায় ১৯৭৮ সালে কমিউনিস্টদের এক অভ্যুত্থানে দাউদ খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নেয় পুরোপুরিভাবে। কাবুলে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার বহাল রাখার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন হাজার হাজার সৈন্য পাঠায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাজার হাজার আফগান নাগরিক দেশ ছেড়ে পাশের দেশগুলোতে, প্রধানত পাকিস্তান ও ইরানে আশ্রয় গ্রহণ করে। সোভিয়েত আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আফগানরা তাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করে দেয়। আফগান প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব ও ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্বে মুক্তবিশ্ব ব্যাপক সমর্থন দান করেছিল। আফগান স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান সমর্থনদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয় যুক্তরাষ্ট্র।

আফগান উদ্বাস্তুদের মানবিক সহায়তা এবং আফগান স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা যোদ্ধাদের শত কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়া হলো। ত্রাণ এবং সামরিক উভয় ধরনের সহায়তার অপর একটি চ্যানেল হলো পাকিস্তান। ওই সময়ে মনোযোগ বা দৃষ্টি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাকিস্তান এবং পাকিস্তানকে সহায়তা করার জন্যও লাখ লাখ ডলার দেয়া হয়েছিল। বিশেষভাবে, পশ্চিমা দেশগুলো এবং আরব ও ইসলামী বিশ্ব আফগান প্রতিরোধ আন্দোলনকে তাদের সমর্থনের জন্য এবং সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মুখসারির দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান ওই সঙ্কটজনক সময়ে নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ওই সময়ে প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র আফগান স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দেয়ার জন্য পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন পাকিস্তান আফগান মুজাহিদদের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের প্রধান রুট হিসেবে কাজ করে। ওই কঠিন বছরগুলোতে আফগানরা পাকিস্তানের সরকার ও সে দেশের জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ সে সময় ইসলামাবাদ লাখ লাখ শরণার্থীকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সব ধরনের সহায়তা দিয়েছিল।

অবশ্য পরে তারা আফগানিস্তানে পাকিস্তানের অব্যাহত হস্তক্ষেপে খুশি হতে পারেনি। কারণ ওই হস্তক্ষেপে দু’দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দু’দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

মার্কিন চাপে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিচ্ছিন্নতার কারণে মস্কো ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এরপর ১৯৯২ সালে সোভিয়েত সমর্থিত কমিউনিস্ট প্রশাসনের পতন ঘটে এবং আফগানিস্তানে মুজাহিদদের নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হয়। এটা ছিল গৃহযুদ্ধ, নৈরাজ্য এবং অস্থিতিশীলতা শুরু হওয়ার বছর। এই সময়ে প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের ব্যাপারে সব ধরনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

মুজাহিদীনদের নৈরাজ্যকর শাসনের প্রাক্কালে তালেবানদের উত্থান ঘটে। ক্রমান্বয়ে তারা আফগানিস্তানের ৯৫ শতাংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং দেশটিতে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা নিয়ে আসে। কিন্তু উগ্র রক্ষণশীল শাসন এবং আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে স্বাগত জানানোর কারণে তারা আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আমেরিকার নেতৃত্বে অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডমের মাধ্যমে ২০০১ সালের শেষের দিকে তালেবান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এটা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

দুই দেশ ২০১২ সালে একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানকে ন্যাটো জোটের বাইরে একটি প্রধান মিত্র দেশের মর্যাদা দান করে। একইভাবে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় ঐক্য সরকারের দ্বিতীয় দিনে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। কৌশলগত বন্ধনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের জাতীয় বাজেটের ৫০ শতাংশ অর্থায়ন করে থাকে। আর দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বার্ষিক প্রায় চার বিলিয়ন তথা ৪০০ কোটি ডলারের তহবিল পেয়ে থাকে।

আফগানিস্তানের পুনর্গঠনসংক্রান্ত স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেলের মতে, দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের চমৎকার অগ্রগতি সত্ত্বেও যথাযথ যতœ এবং অধিকতর মনিটরিংয়ের জন্য আরো যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, সেটিও এ ক্ষেত্রে বিরাট প্রভাব ফেলছে।

যুক্তরাষ্ট্র ১৭ বছর ধরে আফগানিস্তানে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে। আল কায়েদাকে পরাজিত করা হয়েছে। কিন্তু তালেবানরা আফগান রাষ্ট্র এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সৈন্য, উভয়ের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে বিরাজমান। ট্রাম্প প্রশাসন চার দশকের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কাতারে মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খালিলজাদ এবং তালেবান প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার ফলাফলের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আফগান নাগরিকেরা। তারা কয়েক দফা আলোচনায় মিলিত হয়েছেন এবং অগ্রগতির ব্যাপারে উচ্চ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ে মনে করে রক্তপাত এবং সম্পদ নষ্ট করে অর্থাৎ জানমালের বিনিময়ে এই যুদ্ধ আর বেশি দিন অব্যাহত রাখা যাবে না। প্রত্যেকেই যুদ্ধের অবসান ও স্থায়ী শান্তি চায়। 

লেখক : আফগানিস্তান সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট। জাতীয় ঐক্য সরকারের সাবেক ডেপুটি মন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগে আশরাফ ঘানির পলিসি অ্যাডভাইজার।
‘আরব নিউজ’ থেকে ভাষান্তর মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ