১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

স্বাধীনতার শতবর্ষেও রক্তাক্ত আফগানিস্তান

-

১৯ আগস্ট আফগানিস্তানের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশটিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এ সময়ে একের পর এক বোমা হামলায় গোটা দেশই যেন কেঁপে উঠছে। আফগান ও বিদেশী নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পনামাফিক হামলা চালানো হচ্ছে।

কারা এসব হামলা চালাচ্ছে তা বিস্তারিত না জানা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে আইএস মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে। তালেবান যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে শান্তি আলোচনায় অগ্রসর হতে চাইছে তখন, তালেবানের বিদ্রোহী একটি গ্রুপ ও আইএস গোটা আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে। এরা দেশটির পূর্বাঞ্চলে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি করেছে। দেশটিতে চলমান এই সহিংসতা বেশকিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে। দোহার শান্তি আলোচনা আদৌ কি কোনো ফল আনবে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি তালেবানদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে? অথবা এই শান্তি চুক্তি কি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে রক্তপাত বন্ধ করতে পারবে?

শান্তি স্থাপনে বিদেশী সেনাদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছে তালেবান। যতক্ষণ পর্যন্ত বিদেশী সেনা প্রত্যাহার না হবে, আফগান সরকারের সাথে কোনো সরাসরি আলোচনায় না যাওয়ার কথাও বলেছে তালেবানরা। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তালেবানদের শর্ত মানার দিকেই যাচ্ছেন। কয়েক দিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগেই আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।

২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগান কমব্যাট মিশন শেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আফগান বিমানবাহিনীকে সহযোগিতা এবং সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে এখনো ১৪ হাজার মার্কিন সেনা আছে দেশটিতে। জাতিসঙ্ঘের দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক দশকে আফগানিস্তানে ৩২ হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে। আর ২০১৮ সালে বিভিন্ন হামলায় তিন হাজার ৮০৪ আফগান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। যাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৯২৭। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ন্যাটোর হিসাব বলছে, হামলায় এক হাজার ৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

শান্তি আলোচনার মধ্যেই গত শনিবার রাজধানী কাবুলে এক বিয়ে অনুষ্ঠানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়। শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে এ হামলায় কমপক্ষে ১৮২ জন আহত হয়েছিল এবং হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও ছিল। স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তির এ সময় এমন হামলায় শোকাহত পুরো দেশের মানুষ। বিয়ের অনুষ্ঠানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৬৩ জন নিহতের ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনা চলাকালে এমন হামলায় ভাবমর্যাদা সঙ্কটে পড়েছে তালেবান।

স্বাধীনতা দিবসের দিনেরও আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে শিশুসহ কমপক্ষে ৬৬ জন আহত হয়েছেন। তবে এখনো কেউ হামলার দায় স্বীকার করেনি।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতার শততম বছর উদযাপনে সোমবার আফগানিস্তানে সরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল, সাধারণ জনগণ তাতে যোগ দিয়েছিলেন। মানুষ যখন স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছিল তখন জালালাবাদের বিভিন্ন অঞ্চলে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বিস্ফোরণ হয়।

আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি আশরাফ গনি বলেছেন, আহতদের সম্মান জানিয়ে আমরা অনুষ্ঠানগুলো স্থগিত করেছি কিন্তু আমরা অবশ্যই এর প্রতিশোধ নেব। আমরা প্রতি ফোঁটা রক্তের বদলা নেবো।

এ দিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ট্রাম্পের ইচ্ছের বিষয়টি আর গোপন নেই। তার প্রশাসন কাতারে তালেবানদের সাথে আলোচনায়ও বসেছে। মার্কিন কর্মকর্তা এবং তালেবানদের মধ্যে আলোচনা থেকে স্থায়ী শান্তি এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির কোনো পথ বেরিয়ে আসে না কি তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে পুরনো সঙ্ঘাত আবার জেগে ওঠেÑ এটা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।

ট্রাম্প বলেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আফগানিস্তান সম্পর্কে ‘কিছু বিষয়’ ঘোষণা করা হবে। কারণ, দেশটিতে সন্ত্রাসবাদী হামলা মোকাবেলার জন্য শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করাই হবে সেরা বিকল্প। তিনি বলেন, আমাদের খুব ভালো দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আমি বোঝাতে চাইছি, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কী ঘটেছিল, কাকে বের করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু বিষয় ঘোষণা করা হবে। পরে এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, আফগানিস্তানের বিষয়ে একটি ভালো আলোচনা সম্পন্ন হলো। যদি সম্ভব হয় এই ১৯ বছরের যুদ্ধের বিরোধী পক্ষের অনেকে এবং আমরা একটি চুক্তি করতে আগ্রহী।

এদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, তালেবানদের সাথে সাম্প্রতিক আলোচনায় মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনার পাশাপাশি উভয়পক্ষই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চুক্তি ঘোষণার কাছাকাছি রয়েছেন।

জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে একটি চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করা হয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে কিন্তু সেখানে তালেবানদের অস্ত্রবিরতির কোনো প্রতিশ্রুতি বা আফগান কর্মকর্তাদের সাথে তাদের রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো বিষয় নেই।

তবে আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনায় সবার অংশগ্রহণ না থাকলে দেশটিতে সাধারণ মানুষ হত্যা বন্ধ হবে না। একমাত্র সবার মিলিত পদক্ষেপই এ দেশটিতে যুদ্ধাবস্থা থেকে বের করে শান্তির পথ দেখাতে পারে।


আরো সংবাদ