১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কী আছে গ্রিনল্যান্ডে : কেন কিনতে চান ট্রাম্প

কী আছে গ্রিনল্যান্ডে : কেন কিনতে চান ট্রাম্প - ছবি : সংগ্রহ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান। গত সপ্তাহে তার এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে আসে। সে সময় অনেকের মনেই সংশয় দেখা দিয়েছিল এই খবরের সত্যতা নিয়ে। তবে নিউ জার্সি থেকে ওয়াশিংটন ফেরার পথে ট্রাম্প আবারো জানিয়ে দিলেন, তিনি সত্যিই খনিজসম্পদে ভরপুর এই দ্বীপ কিনতে চান। তার মতে, এই ‘ডিল’ রিয়েল এস্টেট ব্যবসার দিক থেকে দেখলে অত্যন্ত লাভজনক। আইনজীবী ও উপদেষ্টাদের সাথে নাকি এ বিষয়ে পরামর্শও করেছেন তিনি।

তবে ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থান এবং এর খনিজসম্পদের কারণে ১৮৬০-এর দশকে গ্রিনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা করেছিল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের সরকার। কিন্তু তা প্রকাশ্যে আসেনি কখনো। এরপর ১৯৪৬ সালে ডেনমার্কের কাছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১০ কোটি ডলারে দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দেন। এর আগে আলাস্কার একটি অংশের সাথে গ্রিনল্যান্ডের কিছু কৌশলগত অংশ অদলবদল করার পরিকল্পনা করেছিলেন ট্রুম্যান।

তবে বরাবরই দ্বীপ বিক্রির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে গ্রিনল্যান্ড। গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান লোন বাগার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এ দ্বীপ বিক্রির জন্য নয়। তবে ব্যবসা করতে চাইলে দ্বার খোলা আছে।’ আর ট্রাম্পের এই প্রস্তাবকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন।

গ্রিনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ অঞ্চল তুষারাবৃত। মাত্র ৬০ হাজার লোকের বাস এই দ্বীপে। এমন একটি জায়গা কেন কিনতে চান, সে বিষয়ে ট্রাম্প নিজেও মুখফুটে কিছু বলেননি। তবে এই ক্রয়ের পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট কারণ আছে। এগুলোর একটি হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। গ্রিনল্যান্ড বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। লোহা, আকরিক, সিসা, দস্তা, হীরা, স্বর্ণ, ইউরেনিয়াম ও তেলসহ বিরল সব প্রাকৃতিক উপাদানের কী নেই সেখানে!
দ্বীপটির বেশির ভাগ এলাকা তুষারাবৃতের মধ্যে থাকায় সেই স্থানগুলো কেউ এখনো ব্যবহার করতে পারেনি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দ্বীপটির বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দু’টি বরফ গলার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। দ্বীপটির বরফ গলার ফলে সেখানকার ভূমি ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অপার সম্ভাবনাও উন্মোচিত হবে।

ট্রাম্পের কথায়, ‘অনেক কিছু করা যেতে পারে। এটা একটা দারুণ রিয়েল এস্টেট ডিল হতে পারে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা হাতে রাখতে গিয়ে বছরে কম করে ৭০ কোটি ডলার লোকসান হচ্ছে ডেনমার্কের। এই বোঝা থেকে তিনি ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ডেনমার্ককে মুক্ত করতে চান।
এককালে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার এমন ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে আসার পর দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন পড়ে গেছে। সোস্যাল মিডিয়ায় হাসিঠাট্টা করছেন অনেকে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের বাসিন্দা ও প্রশাসনের কাছে বিষয়টি একেবারেই হাসির নয়। ট্রাম্পের এমন প্রস্তাবে তারা যারপরনাই ক্ষুব্ধ।

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে হলেও তাদের স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। পৃথক সরকার তথা পার্লামেন্ট রয়েছে। রোববার গ্রিনল্যান্ডে গিয়েছিলেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডরিকসেন। ট্রাম্পের ‘ইচ্ছা’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। আর গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের সম্পত্তিও নয়। গ্রিনল্যান্ড এখানকার মানুষের। আমি এখনো আশা করি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মশকারা করেই এমন মন্তব্য করেছেন।’ একই কথা গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীরও।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ডেনমার্কের ওই দ্বীপ কেনার পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে ইতোমধ্যে পা রেখেছে। সেখানে ঠুলে এয়ার বেস নামে একটি সেনাঘাঁটি স্থাপন করেছে মার্কিন প্রশাসন। আর্কটিক সার্কেলের সাড়ে ৭০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত ওই সেনাঘাঁটি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। সেখানে একটি রাডার স্টেশন ও সেন্সর রয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কব্যবস্থার একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স স্পেস কমান্ড ও নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডও সামরিক ঘাঁটিটি ব্যবহার করে থাকে। ইউরোপে সামরিক শক্তি বাড়াতে গ্রিনল্যান্ড কেনার চিন্তাভাবনাও করতে পারেন ট্রাম্প। ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং খনিজসম্পদের কারণে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশেরই নজরে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড।

গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টার পেছনে আরেকটি কারণ হতে পারে নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার জাহির। অন্য দেশের সম্পদ কেনাকে প্রেসিডেন্টের বাড়তি দক্ষতা হিসেবে দেখা হয় মার্কিন মুলুকে। তাই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে নিজের পকেটে পুরতে চান। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চান ট্রাম্প।

ফলে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা আমেরিকার কাছে গুরুত্বের বিষয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে কথা বলে ট্রাম্প বিতর্ক বাধালেন বলেই মনে হচ্ছে। কারণ আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে ট্রাম্পের ডেনমার্ক সফরে যাওয়ার কথা থাকলেও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় রেগেমেগে সফর বাতিল করেছেন তিনি।


আরো সংবাদ