২৩ অক্টোবর ২০১৯

হজ-পরবর্তী জীবনচিত্র

হজ ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। হজের মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার উপযোগী বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে। হজের আনুষ্ঠানিকতা তীব্র দায়িত্বানুভূতির সৃষ্টি করে এবং ঈমানকে বলিষ্ঠ করে। ফলে মুমিন হিসেবে একজন হাজী অনেক বেশি কার্যক্রম চালাতে পারেন আগের চেয়ে।

সাধারণভাবে মনে করা হয়, ‘দুনিয়ার ঝামেলামুক্ত হয়ে’ হজে যাওয়া দরকার। ফলে অনেকে বৃদ্ধ বয়সে হজে যান। হজ থেকে এসে সংসারে সময় দিতে চান না। কেউ কেউ হন দুনিয়াবিমুখ। আবার অনেকে হজ থেকে ফিরে এসে হালাল-হারাম বাছ-বিচার না করে আগের মতো চলতে থাকেন। হজ প্রস্তুতির আগে হজযাত্রী অবশ্যই ‘রাফাছ’-অশ্লীলতা, ‘ফুসুক’-পাপাচার, এবং ‘জিদাল’ বা ঝগড়া-বিবাদ থেকে পবিত্র হয়ে তাকওয়া অর্জনের অনুশীলন করবেন (সূত্র : সূরা আল বাকারাহ, আয়াত নং-১৯৭)। তাকওয়াকে পাথেয় করে হজের জন্য রওনা হবেন। হজে ‘মাবরুর’-কবুল হজের জন্য যেমন তাকওয়ার প্রস্তুতি দরকার, তেমনি সফল হাজীর পরবর্তী জীবন, কার্যক্রম সর্বাত্মকভাবে ইসলামের অনুসারী হতে হবে। হাজী তকমা নিয়ে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কর্মকাণ্ডে তৎপর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই (সূত্র : সূরা আল বাকারাহ, আয়াত নং-২০৩-২০৬)।

আমরা হজব্রত পালনের অন্যতম সেøাগান ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি নিয়ে একটু ভেবে নিই। ‘হাজির হে আল্লাহ, তোমার দুয়ারে হাজির, (এ ঘোষণা দিতে) যে, তোমার কোনো শরিক নেই, নিশ্চিতভাবে সর্ব প্রশংসা তোমার, সব নেয়ামত তোমার হতে, সার্বভৌমত্ব একান্তভাবে তোমারই এবং সবপ্রকার শেরেকি ও অপবিত্রতা থেকে তুমি মুক্ত।’

এভাবে আবেগজড়িত কণ্ঠে হজব্রত পালনকারী শেরেকি বা শির্ক, কুফর সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে একান্তভাবে কুরআন-সুন্নাহর জীবনে ফিরে আসে (তওবা করে) এবং আল্লাহর যেকোনো ডাকে সাড়া দেয়ার ব্যাপারে সদা প্রস্তুত থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করে।

হজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আরাফাতে অবস্থান, তাওয়াফে জিয়ারতসহ বাস্তব নিদর্শন এবং রাসূল সা:-এর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানগুলো প্রত্যক্ষ করার ফলে হাজীদের চিন্তা-চেতনা, চরিত্র ও কর্ম এবং জীবন বৈশিষ্ট্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। শয়তানকে কঙ্কর মারার মাধ্যমে তার মধ্যকার তাবৎ শয়তানি শক্তি দূর হয়। মশহুর হাদিসের ভাষায় ‘হজ শেষে নিষ্পাপ শিশু হয়ে ফিরে আসেন’। নিজেকে ‘সিবগাতাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর রঙে রঙিন করে নেন। ‘আল্লাহর পরম স্নেহশীল’ বান্দায় পরিণত হন, যা মৃত্যু পর্যন্ত কখনো মুছে যায় না।

সাফা-মারওয়ায় সাঈ হাজীর মনে দৃঢ় আশা ও মহান আল্লাহর রহমতের শাশ্বত প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে। সাঈ স্মরণ করিয়ে দেয় আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে প্রচুর চেষ্টা-মেহনতের প্রয়োজন। নিশ্চিন্তে বসে না থেকে ছোটাছুটি করলে আল্লাহ তালার অনুগ্রহ পাওয়া যায়। সূরা আল বাকারাহ ১৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চই সাফা-মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। অতএব, যে ব্যক্তি এই গৃহে ‘হজ’ কিংবা ‘ওমরাহ’ করে তার জন্য উভয়ের প্রদক্ষিণ করা দূষণীয় নয়। আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো ভালো কাজ করে, আল্লাহ তার উপযুক্ত মূল্য দান করেন এবং তিনি সবকিছু জানেন’। ওই ২:১৫৮ আয়াতের আগে ও পরের আয়াতগুলোতে হজ ও ওমরাহর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, কিন্তু এ আয়াতগুলো কেন এখানে সন্নিবেশিত করা হলো? ২:১৫৮ আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্টতা বুঝতে হলে সূরা আল বাকারার ১৫১-১৬৩ আয়াতগুলো বোঝা দরকার। এর মধ্যে সাঈর তাৎপর্য ও মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে।

ওই আয়াতগুলোর সারমর্ম হচ্ছে- রাসূল সা: প্রথমত, মানুষের কাছে আল্লাহর আয়াত পড়ে শুনাবেন। দ্বিতীয়ত, তাদের (জীবনকে) পরিশুদ্ধ করে দেবেন এবং তৃতীয়ত, তিনি আল্লাহর কিতাব ও (তার অন্তর্নিহিত) জ্ঞান শিক্ষা দেবেন। সর্বোপরি, তিনি এমন সব বিষয়ের জ্ঞান দান করবেন যা মানুষ আগে জানত না (২:১৫১)। রাসূল সা:-এর অবর্তমানে উপরিউক্ত তিনটি কাজ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যের আবশ্যিক কর্তব্য। আর যারা আল্লাহকে স্মরণ করবে, আল্লাহও তাদের স্মরণে রাখবেন। আর আল্লাহর হুকুম অমান্য করা যাবে না (২:১৫২)। আল্লাহকে এ প্রক্রিয়ায় স্মরণে রাখতে হলে তাঁকে অবশ্যই ‘তাগুতি’ বা ইসলামবিরোধী শক্তির কঠিন মোকাবেলায় দাঁড়াতে হবে। কারণ কুরআনি কাজে শয়তানি শক্তি নিস্পৃহ থাকবে না। শয়তানের সর্বগ্রাসী আক্রমণের মোকাবেলার জন্য ঈমানদারদের (পরম) ধৈর্য ও (খালেস) নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে, কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীল মানুষের সাথে থাকেন (২:১৫৩)।

ইসলামের এ কার্যক্রম চালাতে গিয়ে ‘বাতিল’ শক্তির মোকাবেলায় চূড়ান্তভাবে কিছু মুমিনকে জীবন বিসর্জন দিতে হতে পারে (২:১৫৪)। আল্লাহর রাস্তায় কর্মরত বাকিদের পরীক্ষা করা হবে ভয়-ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার, (কখনো) জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতি সাধন করে (২:২৫৫)। আর সত্যিকার মুমিনগণ বিপদ-মুসিবতে আপতিত হলেও কোনো পরওয়া করে না; বরং তারা বলবে, আমরা তো আল্লাহরই জন্য আর নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁর দিকে ফিরে যাবো (২:১৫৬)। এই পরীক্ষায় যারা টিকে থাকবে সেই অটল বিশ্বাসীরা আল্লাহর সমগ্র অনুগ্রহ, রহমত ও হেদায়েতপ্রাপ্ত (২:১৫৭)।

এভাবে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ঈমানি পরীক্ষা পাসের অপূর্ব সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। অতঃপর ২:১৫৮ নম্বর আয়াতে সাফা-মারওয়া সাঈকে জীবন্ত নিদর্শন বলা হয়েছে। হজরত ইবরাহিম আ:-এর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা, শিশুপুত্র ইসমাইল আর মা হাজেরার শুষ্ক মরুপ্রান্তরে ক্ষুধার জ্বালা ও প্রাণনাশের আশঙ্কা নিয়ে কী পরীক্ষাই না দিতে হয়েছে। সাফা-মারওয়ার সাঈ প্রত্যেক হাজী ও প্রত্যেক ওমরাহকারীকে আজো ২:১৫১-১৫৭ আয়াতে বর্ণিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে এবং প্রতিপক্ষ শক্তির মোকাবেলায় অগ্নিপরীক্ষায় টিকে থাকতে নির্দেশ দেয় এবং সাফল্যের সুসংবাদ প্রাপ্তিকে উৎসাহিত করে।

সাঈর নির্দেশ সংক্রান্ত ২:১৫৮ আয়াতের পরবর্তী ২:১৫৯-১৬৩ আয়াতগুলোর সারসংক্ষেপ হচ্ছে- যারা আল্লাহর সুস্পষ্ট পথনির্দেশ গোপন করবে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত, ফেরেশতাদের অভিসম্পাত এবং মানুষের অভিসম্পাত! তারা চিরন্তনভাবে অভিশপ্ত জীবনে থাকবে, যার শাস্তি কখনো কম করা হবে না। কিন্তু যারা তওবা করে ২:১৫১-১৫২ আয়াতে বর্ণিত কার্যক্রমে ফিরে আসবে এবং নিজেদের সংশোধন করে সত্যকে সুস্পষ্টভাবে অন্যের কাছে তুলে ধরবে, তাদের তওবা কবুল করা হবে। আর আল্লাহ ছাড়া কোনো ‘ইলাহ’ বা বিধানদাতা নেই। যারা তার হুকুম মেনে চলে, মহান আল্লাহ তাদের জন্য ‘রাহমানুর রাহিম’। সম্মানিত হাজীরা ওই আয়াতগুলো থেকে হজের পরবর্তী জীবনচিত্র কী হবে তা অবশ্যই নির্ধারণ করতে সক্ষম হবেন ইনশাআল্লাহ।

হজ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ প্রতিনিধি সম্মেলন। যেকোনো সম্মেলন থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মীরা উৎসাহিত হয়, তাদের করণীয় সাথে করে নিয়ে আসে এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালায়। ফলে হজ থেকে ফিরে দুনিয়াবিমুখ হওয়া এবং পাপ কাজ করা হজের শিক্ষার পরিপন্থী। হজ-পরবর্তী জীবনে মৌলিক ইবাদত-বন্দেগি আরো মজবুতির সাথে পালন করা দরকার। হজের জন্য হালাল সম্পদ বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় হজ কবুল হয় না। রাসূল সা: বলেন, ‘আল্লাহ পূতপবিত্র। তিনি পবিত্র সম্পদ ছাড়া অন্য কিছু কবুল করেন না’। অতএব, হজ-পরবর্তীকালে পবিত্র থেকে হালাল উপার্জন করা জরুরি। হজের পর মুসলিম সমাজে পরস্পরের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য কাজ করা আবশ্যক। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিভ্রান্তি, অনৈক্যের কারণগুলো হজের নিদর্শনের পরিপন্থী।

লেখক : এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, আইবিবিএল
[email protected]


আরো সংবাদ