১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ভেজালমুক্ত দুধ পেতে করণীয়

-

মানুষসহ পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রাণী ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যা খায়, তা হলো দুধ। মায়ের বুকের দুধের পর মানুষ সাধারণত গরু, মহিষ, ছাগল বা ভেড়ার দুধ পান করে। দুধ সব বয়সের মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এতে রয়েছে আমিষ, শর্করা, চর্বি, অসংখ্য খনিজ উপাদান এবং ভিটামিনের এক চমৎকার সংমিশ্রণ, যে কারণে দুধকে বলা হয় আদর্শ খাবার। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মোতাবেক, গত এক দশকে দুধের উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ, যা অদূরভবিষ্যতে দেশকে দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার হাতছানি। কিন্তু নানা সমস্যায় উদীয়মান দুধশিল্প আজ অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক পাস্তুরিত দুধের ১০টি নমুনা পরীক্ষা করে সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এজিথ্রোমাইসিন, এনরোফ্লক্সসিন এবং লেভোফ্লক্সাসিন এন্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির কথা সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে অবগত করেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কর্মরত ভেটেরিনারি ডাক্তারদের ভাষ্য মতে, গবাদিপশুর চিকিৎসায় এনরোফ্লক্সাসিন এবং লেভোফ্লক্সাসিন এন্টিবায়োটিক কখনো ব্যবহার করা হয় না। এ দু’টি হলো মানুুষের ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক।

কাজেই, প্রশ্ন হলো ওই সব এন্টিবায়োটিক দুধে প্রবেশের উৎস কী? পরবর্তী সময়ে দেশের চারটি গবেষণাগারে ১৪টি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধের নমুনা পরীক্ষায় এন্টিবায়োটিক ও সিসার উপস্থিতি পাওয়ায় ওইসব প্রতিষ্ঠানকে পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন ও বিপণন থেকে পাঁচ সপ্তাহ বিরত থাকার একটি নির্দেশ ২৮ জুলাই হাইকোর্ট দিয়েছেন। পরে উচ্চ আদালতে কিছু কোম্পানির আদেশ স্থগিত হয়। বিশ্বের অনেক দেশের গরুর দুধেই এন্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতু পাওয়া যায় এবং একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত এদের উপস্থিতি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। সেজন্য আন্তর্জাতিকভাবে দুধে এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানের জন্য নির্দিষ্ট সধীরসঁস ৎবংরফঁব ষরসরঃ (গজখ) রয়েছে। হাইকোর্টের আদেশের পর, কোম্পানিগুলো তরল দুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, কৃষকের গাভীগুলো কি দুধ উৎপাদন এবং খাওয়া বন্ধ রাখবে? উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম গাভীর দুধ বিক্রি করতে না পেরে আজ খামারিরা ভাষাহীন, প্রতিবাদ জানান সড়কে দুধ ঢেলে। গাভীর জীবন বাঁচাতে কৃষক সর্বস্ব হারিয়ে হলেও উচ্চমূল্যের গোখাদ্য খাওয়াবেন। অথচ কৃষককে বাঁচিয়ে আমরা দুধের ভেজাল নির্মূলের বিকল্প উপায় পেলাম না!

বাজারের দুধে এন্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির বিষয়ে বিভিন্ন মহল সরব হয়েছিল। খবরটি সাধারণ জনমনে এমন প্রভাব ফেলে যেন দুধে এন্টিবায়োটিক নয়-বিষের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু দুধে ক্ষতিকারক উপাদানের প্রকৃত উৎস এবং সেগুলো প্রবেশ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ তথা দেশকে দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে করণীয় সম্পর্কে কথা বলার লোকের বড্ড অভাব। একইভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করা নিম্নমানের গুঁড়ো দুধের ভেজাল নির্ণয়েও আমাদের আগ্রহ কম। সমস্যাটি মোকাবেলা করার লক্ষ্যে ডেইরি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সব বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে দুধে এন্টিবায়োটিকের উৎস ও প্রবেশ রোধে করণীয় বিষয়ে আজো কোনো সভা বা সেমিনার জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত চোখে পড়েনি। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা কোনো জাতীয় বা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে একসাথে বসে সম্মিলিত উদ্যোগ ও করণীয় ঠিক করতে পারি না। দুধের দূষণ সমাধানে যেমন আমরা একসাথে বসতে পারি না, তেমনি বসতে পারি না ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের সমাধানেও। আর সে কারণেই দূষণ আজ সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, শুধু গরুর দুধেই নয়।

দুগ্ধশিল্প বিকাশে আরেকটি বড় বাধা হলো প্রান্তিক খামারিদের কাছে ভেটেরিনারি সেবা অপ্রতুলতা। বর্তমানে একটি উপজেলার ৭-৮ লাখ গবাদিপশু-পাখির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় মাত্র একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার নিয়োজিত রয়েছেন। ভেটেরিনারি ডাক্তারের অভাবে খামারিরা কোয়াকদের পরামর্শে গবাদিপশু-পাখিতে যাচ্ছেতাই বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া অনেক সময় পশুপাখির চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট রেসিডুয়াল পিরিয়ড না মেনে গাভীর দুধ বিক্রি করছেন। পশুতে অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কুফল সম্বন্ধে ভেটেরিনারি ডাক্তরদের প্রান্তিক খামারিদের সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে দুধ সংগ্রহের আগে আধুনিক যন্ত্র দিয়ে ক্ষতিকারক পদার্থের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে কেবল নিরাপদ দুধ সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে হাজার হাজার বেকার ভেটেরিনারি চিকিৎসক চাকরি প্রত্যাশায় হতাশ জীবনযাপন করছেন। কাজেই সরকারের উচিত প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে অতিরিক্ত জনবল সংবলিত নতুন অর্গানোগ্রাম পাস করে প্রতি উপজেলায় কমপক্ষে ছয়জন করে ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগ দিয়ে খামারিদের দোরগোড়ায় ভেটেরিনারি সেবা পৌঁছে দেয়া।

সম্প্রতি মানুষের চিকিৎসায় রেজিস্টার্ড ডাক্তারের এবং পশু-পাখির চিকিৎসায় রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না মর্মে হাইকোর্ট দু’টি আলাদা আদেশ জারি করেছেন। যাচ্ছেতাই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারায়। অধিকন্তু মানুষ ও পশু-পাখিতে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে খাদ্য চেইন ও পরস্পরের মাঝে ছড়িয়ে পরার আশঙ্কা থাকে। কাজেই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে এন্টিবায়োটিকের সুুনির্দিষ্ট ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে হাইকোর্টের আদেশ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নসহ এটি অমান্যকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফরের উপাত্ত মোতাবেক, দুধের বর্তমান উৎপাদন বার্ষিক চাহিদার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ (৬২.৫৮%)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বিদেশ থেকে নিম্নমানের গুঁড়ো দুধ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৭০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং জাতীয় ডেইরি উন্নয়ন ফোরাম এ দেশে দুগ্ধ বিপ্লব ঘটনার লক্ষ্যে বিদেশী গুঁড়ো দুধে আমদানি শুল্ক ৫০% করার দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু জাতীয় সংসদের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে গুঁড়ো দুধ আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। দুঃখের বিষয় কিছু বাংলাদেশী পণ্ডিত বিদেশী কোম্পানির গুঁড়ো দুধে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর বিপক্ষে ওকালতি করেন।

অদূরভবিষ্যতে আমরা যদি নিরাপদ দুধ উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে চাই, তবে বিদেশী উন্নত দুধাল জাতের ষাঁড়ের বীজ দিয়ে দেশীয় গাভীগুলোকে কৃত্রিম প্রজনন করতে হবে। ফলস্বরূপ আমাদের দেশীয় গাভীর জাত উন্নয়ন ও দুধ উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি ভ্রƒণ স্থানান্তর প্রযুক্তি প্রয়োগ করে অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক এ ভালো মানের গাভীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। অধিকন্তু আমাদের পর্বতসম বেকার জনগোষ্ঠীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দুগ্ধ উৎপাদনকারী পশু পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তরল দুধের সংরক্ষণ, সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য, পর্যাপ্ত ভেটেরিনারি সেবা ও এন্টিবায়োটিকের যথার্থ ব্যবহার। এতে এক দিকে যেমন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান হবে, অন্য দিকে দেশের চাহিদার দুধ উৎপাদনসহ বিদেশে আমাদের প্রস্তুত করা গুঁড়ো দুধ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।

দুধের সমস্যায় অবশ্যই কথা বলতে হবে। একই সাথে ওই সমস্যা নিরূপণে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সিদ্ধান্তের ত্রুটির কারণে যেন দরিদ্র দুগ্ধ খামারিদের পথে বসতে না হয়। বিদেশী গুঁড়ো দুধ কোম্পানিগুলো দুগ্ধ শিল্পের বেশির ভাগ দখলে না নিয়ে যায়। কাজেই দুধ উৎপাদন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং দুধে ক্ষতিকারক উপাদানের উৎস নির্ণয় করে তা অনুপ্রবেশের সব রাস্তা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আসুন, নিজেদের মনকে দূষণমুক্ত করি এবং আমাদের সব খাবার দূষণমুক্ত করতে পরস্পরকে সহযোগিতা করি। কেবল তাতেই ভেজালমুক্ত বাংলাদেশে নির্ভেজাল গরুর দুধ পাওয়া যাবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।
[email protected]


আরো সংবাদ