১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মোদির কাশ্মির অভিযান

-

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গত ছয় মাসের মধ্যে ভুল গোয়েন্দা তথ্যের কারণে দ্বিতীয়বার এক বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রথমবার ২০১৯ এর ফেব্র“য়ারিতে মোদি আজাদ কাশ্মিরসংলগ্ন খায়বারপাখতুনখাওয়ার বালাকোটে বোমাবর্ষণ করেন এবং একটি প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংসের দাবি করে বসেন। কিন্তু এ দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ওই মিথ্যাচারিতার কারণে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তাতে দুটি ভারতীয় বিমান ধ্বংস হয় এবং একজন ভারতীয় পাইলট তার বিধ্বস্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়ে আজাদ কাশ্মিরে গ্রেফতার হন। দ্বিতীয়বার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে এ তথ্য প্রদান করে যে, কাতারে আমেরিকা ও আফগান তালেবানের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়ে গেছে। আর এ চুক্তির ঘোষণা হওয়ামাত্রই কাশ্মির সঙ্কটের দিকে বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে। মোদিকে এ কথাও বলা হয় যে, ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে রুশ বাহিনী প্রত্যাহারের পর কাশ্মিরে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়েছিল। আশঙ্কা হচ্ছে, ২০১৯ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের পর কাশ্মিরের বিষয়টি আরো একবার বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করবে। ওই গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়েছে, কাশ্মিরের ওপর ভারতের দখলদারিত্ব দৃঢ় করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। যাতে আমেরিকা ও আফগান তালেবানের মধ্যে শান্তি চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাবের মোকাবেলা করা যায়।

সুতরাং মোদি তাৎক্ষণিকভাবে অধিকৃত জম্মু-কাশ্মির রাজ্যে সামরিক আইন জারি করেন এবং সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারার আলোকে রাজ্যের বিশেষ মর্যাদাও বিলুপ্ত করেন। ফেব্র“য়ারিতে বালাকোট হামলার দ্বারা বিশ্বের কাছে কাশ্মির সঙ্কট উদ্ভাসিত হয়েছিল এবং আগস্টে অধিকৃত অঞ্চলে সামরিক আইন জারির ফল জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকরূপে প্রকাশ হলো। পঞ্চাশ বছর পর নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কাশ্মির নিয়ে দ্বিতীয়বার কথা হলো। রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর কোনো ঘোষণা জারি হয়নি। ভারত এটাকে তার সফলতা বলে আখ্যায়িত করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই বৈঠক আরো একবার বিশ্বকে কাশ্মির সঙ্কট সম্পর্কে সতর্ক করল এবং ভারত কাশ্মির সঙ্কটকে তার অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের মিডিয়াতেও এ তথ্য প্রকাশ হচ্ছে যে, মোদি সরকার ৫ আগস্ট অত্যন্ত তড়িঘড়ি জম্মু-কাশ্মির রাজ্যে যে সামরিক আইন জারি করেছেন, তার নেপথ্যে ছিল গোয়েন্দা তথ্য, যেখানে বলা হয়েছে, কিছু দিনের মধ্যে আমেরিকা ও আফগান তালেবানের মাঝের চুক্তি এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থকে খুব খারাপভাবে ধাক্কা দেবে। সুতরাং ভারতের তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

১৪ আগস্ট, ২০১৯ ভারতের ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় সুহাসিনী হায়দার লিখেছেন, ৫ আগস্ট মোদির কাশ্মির অভিযানের নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এ তথ্য ছিল যে, আমেরিকা ও আফগান তালেবানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি ভারতের জন্য বেশ ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে। কেননা এ অবস্থায় ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাবে। ভারত সরকার ওই নির্বাচনে একসাথে আশরাফ গনী ও আবদুল্লাহসহ কমপক্ষে এমন ১৭ জন প্রার্থীকে সহায়তা করছে, ভারতের সাথে রীতিমতো যাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্থগিত হওয়ার দ্বারা কাবুলে আফগান তালেবানের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, যারা পাকিস্তানের খুব ঘনিষ্ঠ। যে সময় মোদি সরকার অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে সামরিক আইন জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়, ওই সময় কাতারে আমেরিকা ও আফগান তালেবানের মধ্যে আলোচনার অষ্টম রাউন্ড চলছিল। আলোচনার এই রাউন্ড ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় কোনো প্রকার ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়ে যায়।

কেননা ঈদুল আজহা চলে এসেছিল। ওই আলোচনায় অংশগ্রহণকারী মার্কিন প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ বেশ চেষ্টা করেছিলেন, আলোচনাকে ফলপ্রসূ বানিয়ে ঈদুল আজহার দিন কিছু একটা সুসংবাদ দিতে। কিন্তু আফগান তালেবান কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ ছাড়া এ ব্যাপারে প্রস্তুত নয় বলে আপত্তি প্রকাশ করে। আর এভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এ তথ্য ‘৩ আগস্ট কাতারে শুরু হওয়া আলোচনার অষ্টম রাউন্ড একটি ফলাফলে গিয়ে পৌঁছবে’ ভুল প্রমাণিত হয়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মূলত জালমে খলিলজাদের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যার সাথে ভারত সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সম্পর্ক রয়েছে। আমেরিকা ও আফগান তালেবানের আলোচনা ব্যর্থ হয়নি, তবে নিষ্ফলতার শিকার হয়েছে। আফগান তালেবান একটি বক্তব্যে এটা স্পষ্ট করেছে যে, আফগান সমঝোতা কার্যক্রমকে কাশ্মির পরিস্থিতির সাথে মেলানো ঠিক হবে না।

কিন্তু কী আর করা, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আফগান শান্তি আলোচনা নিজেদের ব্যর্থতা অনুসন্ধান করে মোদি সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হচ্ছে। এখন মোদি সরকারকে বাধ্য হয়ে অধিকৃত অঞ্চলে কারফিউ শিথিল করতে হবে। সরকারি দফতর ও শিক্ষা খাত খুলে দিতে হবে। আর যখন ওখানে সভা-সমাবেশের ধারা শুরু হবে, তখন মোদি সরকার চাপের মধ্যে আসবে। এ চাপ থেকে বের হওয়ার জন্য তারা নিয়ন্ত্রণরেখায় হামলা বৃদ্ধি করবে। ভারতের হামলার ফলে এক দিকে অধিকৃত অঞ্চলে কাশ্মিরিদের রক্ত ঝরানো হচ্ছে, অপর দিকে নিয়ন্ত্রণরেখায় পাক-বাহিনীর জওয়ান ও বেসামরিক লোকও শহীদ হচ্ছেন। এ পরিস্থিতির দাবি ছিল, পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এক হয়ে কাশ্মিরিদের জন্য সোচ্চার হবে। কেননা কাশ্মিরিদের একটাই অপরাধ, পাকিস্তানকে ভালোবাসা। কিন্তু আফসোস, পাকিস্তানে সরকার ও বিরোধী দল কাশ্মিরিদের সাথে শুধু নাটুকেপনা একাত্মতা প্রকাশ করেছে এবং অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের পরিস্থিতি নিয়ে আহূত পার্লামেন্টের যৌথ বৈঠকেও একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পয়েন্ট স্কোরিং করা হয়েছে। কেউ মানুক আর না মানুক, বর্তমানে পাকিস্তান নড়বড়ে অর্থনীতির শিকার। আর নড়বড়ে রাজনীতিও এর অন্যতম কারণ।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা চাচ্ছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মিডিয়া কাশ্মিরের লড়াইটা লড়বে। পাকিস্তানের মিডিয়া যখন অধিকৃত কাশ্মিরের রাজনীতিবিদদের গ্রেফতারি বিষয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন ভারতের মিডিয়া বলে, তোমরা তোমাদের কীর্তি নিয়ে আনন্দোৎসব করো, তোমাদের দুইজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রীও এখন কারাগারে। এটা এমন দুর্বলতা ভারতের পক্ষ থেকে যার ফায়দা ওঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভারত সরকার বেশ অগোচরে হুররিয়্যাত কনফারেন্সের নেতাদের মিডিয়া থেকে গায়েব করে দিয়েছে। পশ্চিমা মিডিয়া এমনকি পাকিস্তানের মিডিয়াতেও শিক্ষানবিশ কাশ্মিরি রাজনীতিবিদ শাহ ফয়সালের আলোচনা করা হচ্ছে। ভারত সরকার আগামীতে অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের রাজ্য অ্যাসেম্বলির নির্বাচন করাবে। এর মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব সামনে নিয়ে এসে ওই নেতৃত্বের মাধ্যমে কাশ্মিরিদের কিছু নামসর্বস্ব রিলিফ দেয়া হবে। কিন্তু যদি অধিকৃত অঞ্চলে জুলুম-নির্যাতনের ঘটনা শুরু হয়ে যায়, তাহলে ভারত ওই ঘটনা থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য সীমিত যুদ্ধের মাধ্যমে আজাদ কাশ্মিরের কিছু অঞ্চল দখল করার চেষ্টা করবে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বর্তমানে উগ্রবাদী হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণে। যারা হুশের পরিবর্তে জোশের ঠেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ জন্য পাকিস্তান অবশ্যই যুদ্ধ এড়িয়ে যাবে, তবে যুদ্ধের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। আর দেশের মধ্যে স্থিতিশীল রাজনীতি আনা ছাড়া এ প্রস্তুতি গ্রহণ করা যাবে না। নড়বড়ে রাজনীতি দূর না করা শত্র“র হাতে খেলনা হওয়ার নামান্তর।

হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১৯ আগস্ট, ২০১৯ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব


আরো সংবাদ