১৮ নভেম্বর ২০১৯

ভারতে এনআরসিতে বাড়ছে শঙ্কা, দেশজুড়ে বিতর্ক

-

এনআরসি- এই একটি শব্দেই এখন উত্তাল ভারত। বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি। আশঙ্কা, আসামে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। যাদের পাঠানোর হুমকি দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। অথবা আটক করে রাখা হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। তাই এই শঙ্কা শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশেও। একইভাবে উদ্বেগ পশ্চিমবঙ্গেও। কারণ, সেখানেও এনআরসি বাস্তবায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেন হঠাৎ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো আসামে, কেনই বা আচমকা এমন পরিস্থিতি হলো ভারতের উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যে? আর আসাম নিয়ে পশ্চিমবঙ্গই বা কেন উদ্বিগ্ন? কেন উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের মানুষ?

ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি অব সিটিজেন্স- এনআরসি যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেই তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে যারা স্থায়ীভাবে আসামে বসবাস করছেন এবং ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, তাদের ১৯ লাখেরও বেশি মানুষের নাম নেই এই তালিকায়। তাদের সামনে এখন একটাই রাস্তা- আর সেটা হলো নিজেকে প্রমাণ করা যে, তিনি অবৈধ বাংলাদেশী নন, ভারতের নাগরিক।

আর এই প্রমাণের জন্য তাদের এখন পাড়ি দিতে হবে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পথ। আইন অনুযায়ী, এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য আগামী ১২০ দিনের মধ্যে বিদেশী ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে হবে। বলা হয়েছেÑ বিশেষভাবে তৈরি ট্রাইব্যুনাল ছাড়া তারা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টেও আপিল করতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, আদালতে গিয়ে দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল আপিল প্রক্রিয়ার সুবিধা কতজন নিতে পারবেন?

আসামে অনেক বছর ধরে বিদেশী ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে এখন ৩০০টি ট্রাইব্যুনালে ঠেকেছে। কিছু দিনের মধ্যে সরকার আরো এক হাজার ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ, এনআরসি থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষের মামলা এই আধা-বিচারিক ট্রাইব্যুনালগুলোকে সামলাতে হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যক্রম নিয়ে। এ ব্যাপারে গৌহাটি হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হাফিজ রশিদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল কিভাবে কাজ করে, সেটা নিয়ে বিভিন্ন আইনজীবীর কাছ থেকে তিনি নানা অভিযোগের কথা শুনেছেন। তার মধ্যে একটি হলো- ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীদের থেকে ইচ্ছেমতো সাক্ষ্য আদায় করা। ট্রাইব্যুনালে গেলে সাক্ষীদের ধমক দেয়া হয় যে, এই তুমি এটা বলো কেন, ওইটা বলো। গরিব মানুষ সে ওই ধমকি পেয়ে ঘাবড়ে যায়। ট্রাইব্যুনালের কথামতো দিয়ে দেয় স্টেটমেন্ট। এরকম শত শত কেস আমাদের কাছে রিপোর্ট করছেন উকিলরা। জুনিয়র উকিলরাও কিছু বলতে পারেন না। এরকম অবস্থায় তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষগুলো কতটা ন্যায়বিচার পাবে তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, এই মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত কিভাবে থাকবে তা একমাত্র সরকারের ওপর নির্ভর করবে।

আপিল আবেদন কতটা কাজে আসবে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। গৌহাটি হাইকোর্টের আরেক আইনজীবী আমান ওয়াদুদ। তিনি নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে অনেক দিন ধরে নানা গুরুত্বপূর্ণ মামলায় লড়ছেন। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের ব্যাপারে আপিল করার জন্য ১২০ দিন সময় দেয়া হয়েছে। সরকার এ জন্য সব ধরনের আইনি সহায়তা দেয়ার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু এটা আদৌ কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে। কারণ, আদালতের মামলা সবসময় একটু জটিল হয়। আর এখানে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার বোঝাটা যিনি মামলা করবেন তার ওপরই থাকবে। যা পুরো বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। অনেক সময় ব্যক্তির নাম, বয়স, কেস অব রেসিডেন্সের ভুলের জন্য, এমনকি দু’জন ব্যক্তির ছোটখাটো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বা অসঙ্গত বক্তব্যের কারণে অনেকেই নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হন।

এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ বা অস্বস্তি কেন? আসামে নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়- শুরু থেকেই ঢাকা তা বলে আসছে। কিন্তু ভারতের শাসকদলের তরফে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে, তাতে এনআরসির দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে যারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণে ব্যর্থ হবেন, তাদের বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানোর আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

আসামে অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণের জন্য প্রণীত এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয় গত শনিবার। ওই তালিকায় চূড়ান্তভাবে ঠাঁই হয়েছে তিন কোটি ১১ লাখ মানুষের। বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ছয় হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। ১৯৫১ সালে জনগণনার ভিত্তিতে ভারতে প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়।

এনআরসির নিয়ম অনুযায়ী, আসামের বাসিন্দা তারাই; যাদের নাম সেই তালিকায় ছিল অথবা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত যাদের নাম আসামের ভোটার তালিকায় ছিল। এখন যারা আসামের বাসিন্দা, তাদের প্রমাণ করতে হবে, তিনি নিজে অথবা তাদের পূর্বপুরুষেরা ওই সময়ে আসামের বাসিন্দা ছিলেন। যারা ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যে ভারতে এসেছেন তাদের নাম নথিভুক্ত করা হয় বিদেশী নাগরিক হিসেবে।

যারা অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছে, তারা ছয় বছর ভারতে থাকলে সে দেশের নাগরিক হয়ে যাবে, এই নিয়মে ঘোর আপত্তি আসামের।

২০১৬ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল এনে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে বদল করার প্রস্তাব করা হয়। সেই আইনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক ও খ্রিষ্টানদের নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হলেও ওই সব দেশ থেকে আগত কোনো মুসলমানকে নাগরিকত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করা ছিল না।


আরো সংবাদ