২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাশ্মিরের জনগণের স্বপ্ন

কাশ্মিরের জনগণের স্বপ্ন - ছবি : সংগ্রহ

আফগান থেকে আরাকান, জিনজিয়াং থেকে ফিলিপাইন, ফিলিস্তিন থেকে কাশ্মির- কোথায়ও নেই শান্তি কিংবা নেই নিরাপদে মুসলিম জনগোষ্ঠী।

ইসরাইল, আমেরিকা, মিয়ানমার, চীন কিংবা ভারত কেউ তাদের দায়িত্বশীলতার লেশমাত্র দেখাচ্ছে না মানুষগুলোর জন্য। মানবাধিকার কিংবা বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই তাদের যেন থাকতে নেই। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতা চলমান কাশ্মিরিদের ওপর। ভারতের এমন অত্যাচারের বিরুদ্ধে শুধুই কাশ্মিরিরাই প্রতিবাদ করলে কি চলবে? মুসলিম বিশ্ব কিংবা মানবতাবাদী রাষ্ট্রগুলোর করার কি কিছু নেই?

১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার স্বল্পকালীন স্বাদ পেলেও নিপীড়ক রাজা হরি সিংয়ের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মাত্র ৭৩ দিনের মাথায় স্বাধীনতা হারায় ‘ভূস্বর্গ’ কাশ্মির। আজ অবধি ৭২ বছর ধরে সেখানে চলছে জুলুম-নির্যাতন। চরম অস্থিরতার মাঝে চরম ক্ষোভ নিয়ে বেঁচে আছে কাশ্মিরি জনগণ। কিন্তু বুঝতে হবে, ভারত সরাসরি কাশ্মিরের ওপর তার মালিকানা দাবি করতে পারে না।

ভারতের অধিভুক্ত ২৮টি রাজ্য (কাশ্মিরসহ ২৯টি) ও সাতটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মতো কাশ্মির সাধারণ কোনো রাজ্য নয়। ভারতীয় কনস্টিটিউশনের (সংবিধান) ৩৭০ নং আর্টিকেলের ক্ষমতা বলে ভারত কাশ্মিরের ওপর সাময়িক অধিকার লাভ করে মাত্র। তা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কাশ্মির ভারতের সাময়িক অধিকারে থাকলেও তা এমন এক রাজ্য, যা স্বাধীন স্ট্যাটাসের পূর্ণ অধিকারী এক বিশেষ ভূখণ্ড। ওই ধারার ক্ষমতা বলে, কাশ্মিরের রয়েছে আলাদা পতাকা ও সংবিধান।

১৯৪৭ সালের ২৫-২৭ অক্টোবর হরি সিং ও শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরিদের ভাগ্য নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আজ এই ভূখণ্ডটির মাটি ও মানুষ কম-বেশি তিনটি দেশের অধীন। তবে পাকিস্তান ও চীনের আওতাধীন অংশ নিয়ে দুনিয়াজুড়ে কোনো সমস্যা বলতে গেলে, নেই। যত সমস্যা ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মির নিয়ে। এখানকার মানুষ হয় পূর্ণ স্বাধীন কিংবা পাকিস্তানের অংশ হতে চায়।

নেহরুই কাশ্মির প্রসঙ্গ প্রথমে জাতিসঙ্ঘে উপস্থাপন করেছিলেন। এরপর জাতিসঙ্ঘের অধীনে গণভোটের বিষয়ে সম্মতিও দেন। একটি দেশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা রক্ষা যদি না করে, তাহলে তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বর্তমানের ভারতীয় নেতারা হাস্যকর পাত্রে যে পরিণত হবেন, তা সহজেই বলা যায়।

রাজনৈতিক কারণে নির্বাচন এলেই ভারতের ক্ষমতায় থাকা দলটি কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে একটা সীমিত যুদ্ধের পাঁয়তারা করে, যাতে করে দেশের (৩৬ কোটি সনাতনী ও ৪৪ কোটি তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত) সাধারণ নাগরিকদের বিব্রত করে ভোট সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সীমিত যুদ্ধের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ভয়াবহ খেলা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিজেপি তথা মোদি সরকারের প্রতি জনসমর্থন অনেক কম ছিল। তাই পাবলিক রেটিং বাড়াতে আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ ও বজরংয়ে মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলের আশীর্বাদে মোদি সরকার পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা লাগানোর প্রচেষ্টা করে। তা ছাড়া ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র বানানোর উগ্র মেসেজ দেন।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে সঙ্ঘটিত পুলওয়ামা ঘটনাটি এক সুইসাইড বোমা হামলা। জম্মু-কাশ্মিরের গোরিপোরার কাছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের গাড়িবহরে সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আদিল হোসেন দার ওই হামলাটি করে। নিজস্ব ক্ষোভ থেকে সে এ কাজটি করেছে, যদিও ‘জয়েশ-ই-মোহাম্মদ’ এ হামলার দায় স্বীকার করে নেয়।

এতে প্রধানমন্ত্রী মোদির সামনে সুযোগ এসে গেল। অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ৫০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক যুবকটি সংগ্রহ করল কোথা থেকে? যে রাস্তায় কিছু পথ অন্তর অন্তর একটি করে চেকপোস্ট রয়েছে, সেখানে বিনা বাধায় আদিল এমন কাজ করতে পারল কেমন করে? নাকি মোদি সরকারের কোনো গোয়েন্দা ফাঁদে পড়ে সে এমন কাজ করল?

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শান্তির আহ্বান জানানোর পরও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির আচরণে শান্তির আকাঙ্ক্ষার লেশমাত্র পাওয়া যায়নি। উপরন্তু তিনি অশান্তির নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, বলা চলে। পরিকল্পনা মোতাবেক, চরম হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার রাষ্ট্রপতির ফরমান জারি করে কাশ্মিরের (স্বাধীন স্ট্যাটাসের পূর্ণ অধিকারী ভূখণ্ড) সাংবিধানিক মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। কাশ্মির এতদিন চলছিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫(ক) ধারা মতে যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটিকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দিয়েছিল।

মূলত সংবিধানের ৩৭০ ধারার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মিরের ওপর পররাষ্ট্র, যোগাযোগ, অর্থ ও প্রতিরক্ষা ছাড়া আর কোনো কাজে হস্তক্ষেপ এবং ৩৫(ক) এর কারণে এ অঞ্চলে বাইরের কেউ জমি ক্রয় করতে পারত না। কট্টর সাম্প্রদায়িক মোদি সরকার কাশ্মিরের বিশেষ ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার সাথে সাথে অঞ্চলটিকে দু’ভাগে (জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ) বিভক্ত করছে। এর নিজস্ব পতাকা ও সংবিধান কেড়ে নিয়ে অঞ্চলটিকে সাধারণ রাজ্যের চেয়ে কম মর্যাদা দিয়ে ‘কেন্দ্র শাসিত’ করা হয়, যেখানে পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন সরকার নিযুক্ত একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর।

এহেন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য এক চরম লজ্জা।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য বৃহৎ অংশ (সাত লাখ) আগে থেকেই কাশ্মিরে নিয়োজিত রয়েছে। বর্তমানে, আরো লক্ষাধিক সেনাদল মিলে প্রায় আট লাখ সেনাদলের গ্যারিসনে লাখ লাখ মুসলমানের বাস। ভারতজুড়ে হাজার নাগরিকের বিপরীতে একজন নিরাপত্তা সদস্য থাকলেও কাশ্মিরে তা মাত্র ১০ জনের বিপরীতে একজন। কাশ্মির আজ সান্ধ্যআইনেও অবরুদ্ধ ও জর্জরিত। শিক্ষাঙ্গন বন্ধ, জাতীয় নেতৃবৃন্দ গৃহবন্দী কিংবা গ্রেফতার। কাশ্মিরের প্রত্যেক মুসলমান আজ সেনাদের নজরের আওতায়।

উগ্রবাদী মোদি সরকার অঞ্চলটিতে ভারতীয় অমুসলিমদের এনে মুসলিমদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে চায়। কিন্তু স্থানীয় মুসলমানেরা তা কোনো দিন মেনে নেবেন না, তা অকপটে বলা যায়। তা ছাড়া পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্ব বিষয়টিকে ভালো মনে করার কোনো কারণ নেই। সব কিছু মিলে মোদির নেতৃত্বের হঠকারী সরকার কাশ্মিরের মজলুম মানুষগুলোর শান্তি যে কেড়ে নিয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতির জন্য কোনোভাবেই শুভ হবে না।

খোদ বিজেপি সরকারের অংশীদার সংযুক্ত জনতা দল বিজেপির এমন অপরিণামদর্শী আচরণে ক্ষুব্ধ এবং কেরালা কংগ্রেস, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, আম আদমি পার্টি, বামদলগুলো, সমাজবাদী দল, ডিএমকে ও কংগ্রেস বলছে- সরকারের এমন আচরণ দেশের অখণ্ডতাকে বিনষ্ট করবে। কাশ্মিরের অন্যতম নেতা সৈয়দ আহমদ ওমর আবদুল্লাহ ও হুররিয়াত কনফারেন্সের নেতা শাহ গিলানি বলেছেন, তারা জীবন থাকতে এর বিরোধিতা করবেনই। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেন, মোদি সরকার যা করেছে এবং করছে তা দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি ও লজ্জাজনক।

অশান্তির চাদরে মোড়ানো মোদি সরকারের মাঝে শান্তির মানসিকতা বিকশিত হবে এবং জাতিসঙ্ঘ ও মানবতাবাদী দেশগুলোর দায়বদ্ধতার উপলব্ধি থেকে একদিন ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মিরের নিরীহ জনগণ স্বাধীনতার অমিয় স্বাদ পাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক


আরো সংবাদ