১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

হংকংয়ে এবার স্বাধীনতার সুর

-

বড় দু’টি পক্ষের রেষারেষিতে ছোট পক্ষগুলোর যে প্রাণ যাওয়ার দশা হয়, বর্তমানের হংকং ঠিক তারই উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প অধিষ্ঠিত হওয়ার পর যে বিতর্কগুলো সৃষ্টি করেছেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিভিন্ন দেশের সাথে শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধ। চীনের সাথে সেটি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিগত কয়েক মাস ধরে বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়ে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে ভোগাতে বেছে নেয় হংকংকে। না চাইতেই হংকংকে সামরিকসহ নানা ধরনের সাহায্য দিতে থাকে ওয়াশিংটন।

চীনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপে স্বভাবতই ক্ষিপ্ত হয় বেইজিং। একপর্যায়ে তারা হংকংয়ের ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রমাণ করতে গিয়ে দেশটির ওপর নতুন প্রত্যর্পণ বিলটি চাপিয়ে দিতে চায়। এ বছরের এপ্রিলে আনা ওই বিলের ফলে বিভিন্ন মামলায় অপরাধীদের বিচার হওয়ার কথা চীনের মূল ভূখণ্ডে। বিলটি নিয়ে শুরু থেকেই বাধার মুখে পড়ে হংকং প্রশাসন। দেশটির প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম তো শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, কোনোভাবেই এটা থেকে সরে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভের কারণে জুনে এসে সুর পাল্টাতে বাধ্য হন তিনি। কিন্তু ততদিনে অঞ্চলটির অনেকখানি ক্ষতি হয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষের এ বিক্ষোভে একাত্মতা পোষণ করে রাস্তায় নেমে পড়ে শিক্ষার্থী, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষজনও। ফলে আন্দোলন বিরাট আকার ধারণ করে। দেশটিতে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা উচ্চ প্রবৃদ্ধি একেবারে তলানিতে নেমে আসে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো নজিরবিহীন এ ধর্মঘটে তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলে। সভ্য দেশ হংকংয়ে বিক্ষোভকারীরা প্রথমে অনেকদিন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করলেও একপর্যায়ে তারা বিমানবন্দর, মেট্রোরেল বন্ধ করে দেয়। রেল স্টেশনে ভাঙচুর করে। বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

এ অবস্থায় শোনা যায়, দেশটির প্রশাসন উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি নিয়ন্ত্রণ আইন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করতে পারে, যা ১৯৯৭ সালে ওই অঞ্চল থেকে সরে যাওয়া ৭৫ বছর আগে ব্রিটিশরা প্রবর্তন করেছিল। ১৯৬৭ সালে কমিউনিস্টদের দাঙ্গা ঠেকাতে ব্রিটিশ প্রশাসন শেষবারের মতো এটি ব্যবহার করেছিল। ওই জরুরি অবস্থা জারি করা হলে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ আরোপ করতে পারে, সম্পত্তি দখল করতে পারে এবং আরো গণহারে লোকদের গ্রেফতার করতে পারে। চীনের পক্ষ থেকেও শক্তি প্রয়োগের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তা না হলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে নামে। তারা গণহারে গ্রেফতার যেমন করেছে, ঠিক তেমনি জলকামান, লাঠিচার্জ, গুলিবর্ষণসহ সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ওপর। কিন্তু তাতে দমে যায়নি হংকংবাসী।

হংকংয়ের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা একটি সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করে পুলিশ। তবে তা উপেক্ষা করেই বিক্ষোভ চালিয়ে যায় আন্দোলনকারীরা। বরং সরকারের বাধায় আরো গতি লাভ করে ওই আন্দোলন। আগে আন্দোলনকারীরা শুধু এ বিল বাতিলের দাবি জানালেও পরবর্তীতে তারা পাঁচ দফা দাবিতে অনড় অবস্থান নেয়। এগুলোর মধ্যে বিল পুরোপুরি বাতিল, গ্রেফতারকৃত আন্দোলকারীদের মুক্তি, পুলিশি অত্যাচারের নিরপেক্ষ তদন্ত, হংকংয়ের জন্য আরো স্বাধীনতার দাবি, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে ‘দাঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ।

শান্ত ভূখণ্ড হংকংয়ে হঠাৎ করে এমন তীব্র আন্দোলনে একেবারে বেকায়দায় পড়ে যান অঞ্চলটির প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম। চীনা সমর্থিত ক্যারি লাম ক্ষমতায় আসেন ২০১৭ সালের ১ জুলাই। উচ্চপর্যায়ের কমিটির ভোটে তিনি নির্বাচিত হন, যে কমিটিতে বেইজিংপন্থীরা সুস্পষ্টভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ক্যারি লামের নির্বাচিত হওয়ার সময়ই দেশটিতে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সে সময় তিনি বিষয়টিকে মোটামুটি সামলে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ বছরের এপ্রিলে বিতর্কিত বিলটি প্রকাশ্যে এলে এর প্রতিবাদ জানাতে মাঠে নামে ১০ লক্ষাধিক লোক। কিন্তু ক্যারি লাম বিলটি প্রত্যাহারে দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু সে আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে গত ১৫ জুন তিনি তা স্থগিতের কথা জানান। কিন্তু তাতেও মন গলেনি বিক্ষোভকারীদের। তারা এটি পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানায়। একপর্যায়ে ৪ সেপ্টেম্বর তা পুরোপুরি বাতিলের কথা জানান ক্যারি লাম। তবে বিক্ষোভকারীরা এবার এতেও শান্ত হয়নি। বিক্ষোভকারীরা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, সব দাবিই পূরণ করতে হবে। তা না হলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।

গত ১৩ আগস্ট একটি সংবাদ সম্মেলনে ক্যারি লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে চীন সরকার তার হাত বেঁধে রেখেছে কি না, যার কারণে বিলটি প্রত্যাহারের ব্যাপারে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কিন্তু ক্যারি লাম ওই সময় সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।

৪ সেপ্টেম্বরের বিল প্রত্যাহারের ঘোষণার দুদিন আগে হংকংয়ের ব্যবসায়ীদের সাথে লামের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের একটি অডিও প্রকাশ হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ওই অডিও ফাঁস করে। ওই বৈঠকে হংকংয়ের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ক্যারি লাম নিজেকে দায়ী করে বলেন, রাজনৈতিক সঙ্কটের সূচনা করে ‘ক্ষমার অযোগ্য বিপর্যয়’ ডেকে এনেছেন এবং সুযোগ থাকলে তিনি পদত্যাগ করতেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার হাতে ক্ষমতা খুবই অল্প বলেও জানান তিনি। ক্যারি লাম আরো বলেন, বিশ্বের দু’টি বৃহত্তম অর্থনীতির (যুক্তরাষ্ট্র-চীন) মধ্যে নজিরবিহীন উত্তেজনার মধ্যে হংকংয়ের বিক্ষোভ আক্ষরিক অর্থেই একটি বিপর্যয়। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে তিনি বিলটি প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তখন বেইজিং তাকে তা করতে দেয়নি।

প্রত্যর্পণ বিল কী : প্রায় দেড় শ’ বছর ব্রিটেনের উপনিবেশ থাকার পর ১৯৯৭ সালে হংকংকে হস্তান্তর করা হয় চীনের কাছে। হংকং চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হলেও ২০৪৭ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটির স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দেয় চীন। সেসময় এক দেশ দুই নীতির প্রথা মেনে নেয়া হয়। এর ফলে বিক্ষোভ দেখানো, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার অধিকার ভোগ করতেন হংকংবাসী।

২০১৮ সালের এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত বিলটি পাস করা হয়। সে বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাইওয়ানে ঘুরতে গিয়ে ২০ বছর বয়সী এক নারী তার প্রেমিকের হাতে নিহত হন। গর্ভবতী অবস্থায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করে হংকংয়ে পালিয়ে যান ঘাতক। তাইওয়ানের কর্মকর্তারা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে বলেন। তাইওয়ান ও হংকংয়ের বন্দিবিনিময়ের চুক্তি না থাকায় প্রত্যর্পণ বিলটি নতুন করে সামনে আসে। প্রত্যর্পণ বিলটি পাস হলে অপরাধের মামলার বিচার হওয়ার কথা চীনের মূল ভূখণ্ডে।

সর্বশেষ : প্রথমে প্রত্যর্পণ বিল বাতিল, পরে পাঁচ দফা দাবিতে ১৪ সপ্তাহ ধরে চলা এ আন্দোলন থেকে এখন স্বাধীনতার দাবি উঠতে শুরু করেছে। অব্যাহত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ৮ সেপ্টেম্বর চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়েছে। উড়ানো হয়েছে দেশটির পতাকাও। একই সাথে এ অঞ্চলটিকে স্বাধীন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বানও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীরা, ‘স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করো, হংকংয়ের পাশে দাঁড়াও’, ‘বর্ণবাদী বেইজিং, হংকংকে স্বাধীন করো’ স্লোগান দেয়। আন্দোলনকারীর পোস্টারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে লেখা রয়েছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, দয়া করে হংকংকে স্বাধীন করে দাও। আমাদের সংবিধানকে রক্ষা করো।’ হংকংয়ে মানবাধিকার নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা করে বিক্ষোভকারীরা।

দেখুন:

আরো সংবাদ