২৩ অক্টোবর ২০১৯

এক যাত্রায় দুই ফল

-

এক যাত্রায় দুই ফল। একটি দেশের একটি জাতি স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছে ৭২ বছর ধরে। কিন্তু ঈপ্সিত ফল পাচ্ছে না। আরেকটি দেশের জনতার স্বাধীনতা স্পৃহার পাশাপাশি বৃহৎ শক্তির আশীর্বাদে মাত্র ২৭ বছরেই স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে গেল। দু’টি উদাহরণ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হলেও বাস্তব ঘটনা। ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের মানুষ ৭২ বছর ধরে তাদের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের সমর্থন পেলেও আন্তর্জাতিক আদলে বলিষ্ঠ ভূমিকা না থাকায় কাশ্মিরের মানুষের ভাগ্যে স্বাধীনতা জোটেনি।

পক্ষান্তরে ৯৭ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পূর্ব তিমুরের জনগণ মাত্র ২৭ বছরেই স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে গেছে। তারা পেয়েছে খ্রিষ্টান বিশ্বের বলিষ্ঠ সমর্থন। পূর্ব তিমুর ছিল পর্তুগালের একটি কলোনি। ১৯৭৫ সালের ২৮ নভেম্বর পূর্ব তিমুরবাসী স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পার্শ্ববর্তী ইন্দোনেশিয়া ১৯৭৬ সালে পূর্ব তিমুর দখল করে নেয়। এর পরপরই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এই দেশের স্বাধীনতার জন্য খ্রিষ্টান বিশ্ব উঠেপড়ে লেগে যায়। জাতিসঙ্ঘের চাপে ১৯৯৯ সালের ৫ মে পূর্ব তিমুরের জনগণ ইন্দোনেশিয়ার অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট হিসেবে থাকতে চায় কি না সে জন্য প্রত্যক্ষ, গোপন এবং সর্বজনীন ব্যালটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানতে সম্মত হয় পর্তুগাল ও ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব তিমুরবাসী স্বায়ত্তশাসনের আওতায় থাকতে অসম্মত হলে ইন্দোনেশিয়া সরকারকে পূর্ব তিমুরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে এবং জাতিসঙ্ঘের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়। এভাবে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতার পথ সুগম হয়।

১৯৯৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে পরাশক্তিদের চাপে United Nations Transitional Arrangement for East Timor-এর আওতায় একটি অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ব তিমুর শাসন করতে থাকে এবং ২০০২ সালের ২০ মে পুরোপুরি স্বাধীনতা লাভ করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রবেষ্টিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হচ্ছে পূর্ব তিমুর বা তিমুর লেস্তে। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম তিমুরের নিকটবর্তী তিমুর দ্বীপের পূর্বাংশ, আতারাউ, জ্যাকো এবং অকুসি প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে পূর্ব তিমুর গঠিত। এই রাষ্ট্রের আয়তন মাত্র ১৫,০০৭ বর্গকিলোমিটার (৫,৭৯৪ বর্গমাইল)।

ষোড়শ শতক থেকে পর্তুগালের অধীনে পূর্ব তিমুর একটি কলোনি ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত পর্তুগিজ তিমুর হিসেবে এটা পরিচিত ছিল। এ সময় পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতাকামী রেভ্যুলিউশনারি ফ্রন্ট ফর দ্য ইনডিপেনডেন্ট ইস্ট তিমুর (ফ্রেতিলিন) দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর ৯ দিন পর ইন্দোনেশীয় সশস্ত্র বাহিনী দেশটি দখল করে সে দেশের ২৭তম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে। ইন্দোনেশিয়ার দখলে থাকাকালে সে দেশে স্বাধীনতার জন্য ব্যাপক বিক্ষোভ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ ও ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। তেমনটি চলছে আজকের কাশ্মিরে। ১৯৯৯ সালে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত গণভোটে পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ২০০২ সালের ২০ মে একবিংশ শতকের প্রথম সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব তিমুর আত্মপ্রকাশ করে এবং জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ পায়। দেশটি একই সাথে পর্তুগিজভাষী দেশগুলোর কমিউনিটির সদস্য হয়।

এদিকে ভারতের জম্মু ও কাশ্মির হচ্ছে এমন একটি রাজ্য যা পুরোপুরি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। জনগণের মধ্যে ৬৮.৩১ শতাংশ মুসলিম, ২৮.৪৩ শতাংশ হিন্দু, ১.৮৭ শতাংশ শিখ এবং বৌদ্ধদের সংখ্যা ০.৮৯ শতাংশ।

জম্মু ও কাশ্মির ভারত উপমহাদেশের সর্ব উত্তরাংশে অবস্থিত এবং ১৯৪৭ সাল থেকে বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মিরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে এবং জম্মু ও কাশ্মির এবং লাদাখকে কেন্দ্র শাসিত দু’টি এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে এই আদেশ কার্যকর হবে।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের আগেই মোদি সরকার সম্ভাব্য সব রকম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আগে থেকেই জম্মু ও কাশ্মিরে মোতায়েন ছিল কয়েক লাখ সৈন্য। এই ঘোষণার সাথে সাথে সৈন্য সংখ্যা আরো বাড়ানো হয়।

ভারত শাসিত কাশ্মিরে চলমান সঙ্কট ও সমস্যা সমাধানে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)। কাশ্মিরকে আন্তর্জাতিকভাবে দেয়া মর্যাদা রক্ষার কথাও সংস্থা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে।

কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা ও সেখানকার মানুষের মৌলিক অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সক্রিয় হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ওআইসি সচিবালয় থেকে এই বিবৃতিতে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জম্মু ও কাশ্মিরকে দেয়া বিশেষ মর্যাদার কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়। মুসলিম দেশগুলোর এই শীর্ষ সংস্থা কাশ্মিরের জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে সম্প্রতি ওআইসি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে নেয়া প্রস্তাবগুলোর কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ওআইসি অবিলম্বে ভারত শাসিত কাশ্মীর থেকে কারফিউ তুলে নেয়া, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ব্যবস্থাসহ যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং জনগণের মৌলিক অধিকারগুলোর প্রতি সম্মান দেখাতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কাশ্মিরের বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতো ওআইসিও উদ্বিগ্ন বলে উল্লেখ করেছে।

শুরুতেই ভারতের প্রতিশ্রুতি ছিল, কাশ্মিরে গণভোটের মাধ্যমে সেখানকার মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নির্ধারণ করবে। কিন্তু ভারত নানা টালবাহানায় তা হতে দিচ্ছে না এবং কাশ্মির দখল করার নানা অপকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। এখন জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ভারতকে চাপ দিয়ে সেখানে প্রতিশ্রুত গণভোটের আয়োজন করা; ঠিক যেমনটি করা হয়েছে পূর্ব তিমুরের বেলায়। আর এটাই হচ্ছে কাশ্মির সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ।


আরো সংবাদ