২৩ অক্টোবর ২০১৯

আগামী দিনের নেতৃত্ব ও যুবসমাজ

দেশের সামনে এখন অনেক সম্ভাবনা। সামনের দশক আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশবাসী একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, সুপ্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, গ্রহণযোগ্য আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা চায়। দুর্নীতি ও অরাজকতার বিরুদ্ধে গোটা জাতি যাতে এক হতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্ব রয়েছে দেশের নাগরিকসমাজের ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের। এ দেশের যুবসমাজের হাতে থাকবে আগামী দিনের নেতৃত্ব।

কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র, সুশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রশ্নে আমাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে জনাকীর্ণ স্থানে যখন কোনো যুবককে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে, অথচ এ দেশের শত শত লোক দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখে। কেউ প্রতিবাদ করে না। সমাজ কতটা অধঃপতিত হলে মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। কারণ, রাষ্ট্রশক্তির পক্ষ থেকেই খুনিরা বাধা পাচ্ছে না। বিশ্বজিৎ হত্যার কথাও কেউ ভোলেননি নিশ্চয়ই। সরকারবিরোধী সন্দেহে কুপিয়ে হত্যা করা হলো তাকে। পাশে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ সেটি তাকিয়ে দেখেছে বিনা প্রতিবাদে। এমনকি পুলিশও অদূরে নীরবে দাঁড়িয়ে এই নারকীয়তা প্রত্যক্ষ করেছে। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ চায় সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ সর্বক্ষেত্রে সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন সুন্দর সমাজ। এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

স্বাধীনতার তিন বছর পরই জরুরি আইন ও একদলীয় শাসন কায়েম হওয়ায় পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সংগঠিত হয় এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে এ দেশের ইতিহাস অন্য দিকে মোড় নেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ চলে যায় সামরিক শাসকের হাতে। অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানও হতে থাকে।

’৮২ তে আবার সামরিক শাসন জারি হয়। শাসনভার চলে যায় নতুন এক জান্তার হাতে। প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এ দেশের যুবক, ছাত্র-জনতা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এক হয়ে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। দেশবাসীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদায় নেয় স্বৈরশাসক। সেদিন এ দেশের যুবসমাজ, সর্বদলীয় ছাত্র-জনতার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে গণতন্ত্রের পথ খুলে যায়। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পুরোটা সময় নানামুখী চাপ সত্ত্বেও ছাত্র-জনতা আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিল, উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন পেশাজীবীরাও। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল সাহসী ও অনুপ্রেরণামূলক।

১৯৯১ সালের একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে গণতন্ত্র। বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আসে ক্ষমতায়। ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাধারণ নির্বাচন নিয়ে দেশে গভীর সঙ্কট তৈরি হলে ২০০৭ সালে জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে।

তবে ২৮ বছর পর আবারো নির্বাচন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জাতি গভীর সঙ্কটে পতিত হয়েছে। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন ও জাতিকে দেখতে হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে হয়েছে আরেকটি একতরফা, প্রহসনমূলক নির্বাচন। টিআইবি প্রণীত রিপোর্টে দেখা গেছে, ৫০টির মধ্যে ৩৩টিতেই আগের রাতে এবং ৩০টি কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে সিল মেরে বাক্স ভরা হয়েছিল। নির্বাচনের দিন সহিংসতার নিহত হয়েছিল ১৯ জন। এদিকে, অপহরণ, গুম ও রাজনৈতিক হত্যা থামছে না। ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিরাট সমস্যা রয়েছে।

ফলে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হলে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমান ছাত্র-জনতা ও যুবসমাজকে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের দাবির কথা মনে করতে হবে। বিগত দ্ইু দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা স্বাবলম্বী হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগতমান মুখ থুবড়ে পড়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী বেকার। ফলে নানা ধরনের অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, মাদকাসক্তির দরুণ যুবসমাজ অধঃপতিত হচ্ছে।

বিচারহীনতা ও ক্ষমতাশীন দলের প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসীচক্র প্রকাশ্যে হত্যা, ধর্ষণ ও জবর দখলে মেতে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের সঙ্কট দেখা দেয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমরা তবুও হতাশ হবো না, ভেঙে পড়ব না। কারণ আমাদের রয়েছে সম্ভাবনাময় তরুণসমাজ। নানা ক্ষেত্রে দেশের তরুণেরা প্রতিভা আর সম্ভাবনার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তাদের যেন পথবিভ্রাট না ঘটে। তারা যেন দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে যায়, সেদিকে সবার খেয়াল রাখা উচিত। এই তরুণদের থেকেই আগামী দিনের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। তাই সৎ দক্ষ, দেশপ্রেমিক, ধর্মপ্রাণ ও খোদাভীরু ও জবাবদিহিতা করায় প্রস্তুত নেতৃত্ব গড়ে ওঠা চাই।

আমাদের দেশে সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে যে নেতৃত্ব উঠে আসে, তা সাধারণত বিভিন্ন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো থেকেই আসে। ছাত্র সংগঠনগুলোকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা যদি সৎ, ধর্মপ্রাণ, পরমতসহিষ্ণু, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক না হন তাহলে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ ও সামাজিক অনাচার বহু গুণে বেড়ে যাবে। আমাদের তরুণদের বিশাল অংশ অস্থিরতার মধ্যে আছে। তাদের সঠিকভাবে পরিচালনার অভাব রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে মাদকের প্রভাব।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকবিরোধী, সন্ত্রাসবিরোধী যতই অভিযান পরিচালনা করুক না কেন, এতে কিছু দিন দমে থাকলেও পুনরায় অপরাধীচক্র নানাভাবে ফিরে আসছে। এ জন্য আমাদের দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় জ্ঞান ও খোদাভীরুতা এবং দেশপ্রেম ও পারস্পরিক ভালোবাসার সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। পরিবার থেকে যুবকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, নীতিনৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতে হবে। ছাত্র সংগঠনগুলোকে নেতা নির্বাচনে সৎ, আদর্শ, নিষ্ঠাবান ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন তরুণদেরকেই নেতৃত্বের আসনে নিয়ে আসা উচিত।

E-mail: [email protected]


আরো সংবাদ