২১ অক্টোবর ২০১৯

জলাতঙ্ক : অবহেলিত দরিদ্রদের মৃত্যুরোগ

-

২৮ সেপ্টেম্বর ছিল ‘বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস’। পানি বা জলকে দেখে আতঙ্ক হয় বলেই এই রোগের নাম ‘জলাতঙ্ক’। গ্রিক পুরাণে চার হাজার বছর আগেও জলাতঙ্ক রোগ বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। দুরারোগ্য এই রোগে আক্রান্ত হলে নানা উপসর্গ ও লক্ষণ দেখা দেয়। জলভীতি প্রধান উপসর্গ। এ ছাড়া জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য, ব্যথাসহ শব্দ ও ঠাণ্ডা বাতাস সহ্য করতে না পারা; তরল পদার্থ গিলতে না পারার সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। পানি পানের চেষ্টা করলে গলনালী ও সংলগ্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে তীব্র সঙ্কোচন ঘটে। ফল হয় প্রচণ্ড ব্যথা। সৃষ্টি হয় হাইড্রোফোবিয়া বা পানিভীতির। পানিশূন্যতার ফলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ানোর অক্ষমতা দেখা দেয়। চেতনাশূন্যতা দেখা দেয়, পাগলামো শুরু হয়, যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় ডিলিউসন বা হ্যালুসিনেশন বলে অভিহিত করা হয়।

র‌্যাবিস নামক এক ধরনের ভাইরাসের কারণে এই রোগ সৃষ্টি হয়। সাধারণত এই ভাইরাসটি গৃহপালিত পোষাপ্রাণী ও কিছু ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীদের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। সংক্রমিত ও আক্রান্ত এই প্রাণীগুলোর দ্বারাই মানুষের মধ্যে এটি ছড়ায়। প্রাণীগুলোর উপসর্গের ফলে মানুষকে কামড়ায়, আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত করে, কখনো বা লালা নিঃসরণের সংস্পর্শে আসে। আর তখনই তা ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এর বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। কোনো ওষুধই এই ভাইরাসের শক্তিমত্তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। ফল হয় অনিবার্য মৃত্যু।

পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে এই রোগে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বয়স হয় চার থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। কেবল কুকুরের কামড়েই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ৯৫ শতাংশ মানুষ। বাকি ৫ শতাংশের মৃত্যুর জন্য দায়ী বাঁদর, ইঁদুর, বিড়াল, শিয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণ-কামড়। কুকুরের মধ্যে ৯৯ শতাংশই গৃহপালিত। মানুষও যদি আক্রান্ত হয়ে পড়ে তবে তার পাগলামো আচরণের কারণে কামড়, আঁচড় ও লালার মাধ্যমে অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারে। ভাইরাসটির আক্রমণের শিকার হয় দুর্গম পাহাড়ি, হাওর, বাঁওড়, প্রান্তিক, অবহেলিত, অসচ্ছল, গরিব-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এলাকা।

সব দেশে জলাতঙ্কের মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি আছে। তবে এই রোগাক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ৯৫ শতাংশ ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকায়। সচেতন হওয়ার কারণে উন্নত দেশগুলো বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ১৯৮৩ সাল থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে। তারা এ পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক ও ৯৮ শতাংশ কুকুরের কামড় প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। তদুপরি জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আবিষ্কৃত নানা ধরনের টিকা তারা ব্যবহার করছে। তারা টিকা আগাম গ্রহণ করে। আর যদি কদাচিৎ পশুর কামড়ের শিকার হয়, তবে তা প্রতিকারে আবিষ্কৃত টিকার দ্রুত শরণাপন্ন হয়। সারা বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রতি বছর জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আগাম টিকা নিয়ে থাকে। আর এ কারণেই অসংখ্য মানুষ ভয়াবহ ট্রপিক্যাল ভাইরাসের এই আতঙ্ক থেকে নিস্তার পাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশও জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কুকুরের কামড় থেকে আত্মরক্ষার কলাকৌশল নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে যৌথভাবে এ কাজ শুরু করেছে ২০১০ সালে। এই রোগ যেন না ছড়ায় সে জন্য এবং এই রোগ থেকে নিস্তার পেতে আবিষ্কৃত সব ধরনের টিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিনামূল্যের এই টিকা যে কেউ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিতে পারেন।

এ ব্যাপারে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে এই রোগ সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)’। এটি চট্টগ্রাম শহরের প্রবেশদ্বার ফৌজদারহাটে সমুদ্র উপকূলঘেঁষা দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত। এই হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক হিসেবে উদ্যমী ভূমিকা পালন করছেন খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রফেসর ডা: মোহাম্মদ আবুল হাসান চৌধুরী। তিনি ডা: এম এ হাসান চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত। তিনি চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণায় আন্তঃবিভাগীয়, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সর্বোচ্চ পেশাগত নৈতিকতার বিকাশে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওই হাসপাতালে জলাতঙ্কসহ ট্রপিক্যাল রোগগুলোর কার্যকর চিকিৎসা, চিকিৎসক, টেকনোলজিস্টও নার্সসহ কর্মীদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ তদারকি, এই রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধে সর্বোচ্চ পেশাগত নৈতিকতা ও মানবিকতার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। সর্বস্তরের চিকিৎসক, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, নার্স ও সহায়ক কর্মীদের সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে মরণব্যাধি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এই অর্জন সারা বিশ্বের স্বাস্থ্যকর্মীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী বিধিবিধান প্রণয়ন, কর্মসম্পাদন ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে একযোগে কাজ করছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করা বিশ্বের প্রায় সব সংগঠন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব পশু স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর র‌্যাবিস কন্ট্রোল, ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট র‌্যাবিস, সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (ইউএসএ), আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন প্রভৃতি।

২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্ব থেকে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যুহার শূন্যে নামিয়ে আনার কৌশলপত্র নিয়ে জোরালোভাবে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জলাতঙ্ক নিয়ে গবেষক বিজ্ঞানীদের নিরলস অধ্যবসায়ে আবিষ্কার হচ্ছে নানা মান ও ধরনের প্রতিষেধক টিকার। আগামী ১৫ বছরকে অতি বছর হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ নিরূপণ করে মানসম্মত দক্ষ সেবা প্রদানে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। অব্যাহতভাবে আবিষ্কৃত টিকাগুলো থেকে আমাদের ট্রপিক্যাল জলবায়ু ও পরিবেশ উপযোগী কার্যকর ও নিরাপদ ‘হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিন’ (ঐউঈঠ) অধিক হারে সরবরাহ করা হচ্ছে। গত বছর প্রায় দুই লাখ টিকা এবং তিন লাখ মানুষকে প্রাণীর কামড়ের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বিদেশনির্ভর টিকাগুলোর প্রাপ্তি জটিলতায় সরকারি সরবরাহে বিলম্ব ঘটলেও বেসরকারিভাবে খুব অল্প দামে সর্বদা নিশ্চিতভাবে তা পাওয়া যায়।

জাতিসঙ্ঘের নিয়ন্ত্রণে ২০০৭ সাল থেকে জলাতঙ্ক দিবস বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে।

সচেতনতাই এই মৃত্যুরোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়। আশপাশের বেওয়ারিশ কুকুরসহ সব পালিত পশু সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে। বিশেষ করে চার থেকে ১৫ বছর বয়সীদের বিষয়ে গুরুত্বসহকারে সতর্ক হতে হবে। যদি পশুর কামড়, আঁচড় ও লালা লেগেই যায়; দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ-বৈদ্য থেকে দূরে থাকতে হবে। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। আর তাহলেই জলাতঙ্ক থেকে আমাদের মুক্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।

লেখক : টেকসই উন্নয়ন কর্মী
[email protected]


আরো সংবাদ