১৫ নভেম্বর ২০১৯

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান ও কিছু কথা

-

ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে যখন সরগরম বাংলাদেশ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন হন্যে হয়ে খুঁজছে ক্যাসিনো মালিকদের এবং তাদের পার্টনারদের আটক করতে। তাদের আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করছে, তারা যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা করছে। তখন একটি তথ্য দিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মহিবুল হক। তিনি বলেছেন, দেশে আসা বিদেশী পর্যটকের জন্য ক্যাসিনো দরকার। এ মুহূর্তে তার এ ধরনের বক্তব্য সচেতন ও সুস্থ চিন্তার মানুষকে হতাশ ও বিহ্বল করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্যাসিনো জুয়া পছন্দ করে এমন অগণনাযোগ্য জুয়াড়িদের মনে সচিব আশার সঞ্চার করেছেন।

কিন্তু জাতি যখন প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযান বিশেষত ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানাচ্ছে, তখন সরকারের একজন সচিব হিসেবে জনপ্রত্যাশার বিরুদ্ধে গেলেন তিনি। আমাদের প্রশ্ন, পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে ক্যাসিনো বৈধ করে দেশ ও জাতি কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে? এর একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা আবশ্যক। জুয়ার ব্যাপারে তিনি এত বিগলিত কেন? পর্যটক আকর্ষণে নতুন করে কোনো পর্যটনকেন্দ্রের কথা ভাবলেন না, বিমানকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করতে পারছেন না, লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির। অথচ ক্যাসিনো তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠল কেন?

তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়ায় কিন্তু ক্যাসিনো আছে। সেখানে পাসপোর্ট দেখিয়ে ক্যাসিনোতে ঢুকতে হয়। আমরা তো বিদেশীদের এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে পারি না। আমরা এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন। সেই জোনে ট্যুরিস্টদের জন্য ক্যাসিনো থাকবে। এ সময় পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো: মাহবুব আলী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সচিব সরকারের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের দ্বিমত পোষণ না করে একমত হয়ে বলেছেন, বিদেশী পর্যটক সুবিধার কথা ভেবে এ প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। ঢাকায় যেসব ক্যাসিনো আছে সবই অবৈধ। তা ছাড়া বিভিন্ন মুসলিম দেশে এ ধরনের সুবিধা আছে; সেহেতু বাংলাদেশেও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে অসুবিধা নেই।

পর্যটকদের বাহানায় তিনি ক্যাসিনোকে বৈধ করার চেষ্টায় লিপ্ত। কোন মুসলিম দেশে কী কী অবৈধ ব্যবস্থা আছে, সেটা তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ইসলামে জুয়া নিন্দনীয় কাজে। বিষয়টি তার কাছে গুরুত্বই পেল না। অন্য দিকে ক্যাসিনো থেকে সরকারের প্রতি বছর কত কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতে পারে তারও উল্লেখ করেননি তিনি। তা ছাড়া ক্যাসিনো খেলতে গিয়ে কতজন দেউলিয়া হবেন, সেটিও ভাবেননি। তাহলে কার বা কাদের সুবিধায় এ অনৈতিক প্রস্তাব দিলেন, এটি আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, ক্যাসিনো চালু করেন জিয়াউর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম) তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ক্যাসিনো জিয়াউর রহমান চালু করেন তাতে মাহবুবউল হানিফের কী?

জিয়াউর রহমানের খারাপ কাজ কী তাকে বয়ে বেড়াতে হবে? মাহবুবউল হানিফের সুরে সুর মিলিয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি সরকারের আমলে ক্যাসিনো চালু হয়েছে। সেই সময় দলটির শীর্ষপর্যায়ের নেতারাও এর সাথে জড়িত ছিলেন। রাজশাহী সার্কিট হাউজে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে খবর এসেছে, জি কে শামীম এক কোটি টাকা দিতেন তারেক রহমানকে। এ ক্যাসিনো কালচার বিএনপি সৃষ্টি করেছিল বলে তারা মাসোয়ারা পেতেন।

পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানা যায়, ঢাকায় বিভিন্ন ক্যাসিনো ক্লাবে অভিযানের পর এসব মেশিন আমদানির তথ্য খুঁজতে শুরু করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। তাতে বেরিয়ে এসেছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচটি চালানে এসব জুয়া খেলার সামগ্রী এসেছে বলে চিহ্নিত করেছে। খেলাধুলার সরঞ্জাম হিসেবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এসব আমদানি করা হয়েছে। এসব চালানে বিপুল ক্যাসিনো যন্ত্রপাতি এসেছে দেশে। কারা এর সাথে যুক্ত, ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে কি না; সেসব খতিয়ে দেখছে কাস্টমস অধিদফতর।

এসব আমদানির সাথে জড়িত একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। এদের মধ্যে দু’টি প্রতিষ্ঠানের নাম হচ্ছে- পুষ্পিতা এন্টারপ্রাইজ, ঠিকানা : ১৮ দক্ষিণ কমলাপুর এবং অন্যটি হচ্ছে এবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ঠিকানা ১৪ মোহাম্মদিয়া হাউজিং, মোহাম্মদপুর। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান আমদানি ঘোষণাপত্রে আমদানি পণ্যের বিবরণ হিসেবে গেম মেশিনের উল্লেখ করে। ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানিতে দু’টি বন্দর ব্যবহার করা হয়। বেনাপোল কাস্টমস ও কমলাপুর আইসিডি থেকে পণ্যগুলো খালাস করা হয়।

কাস্টমসের অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে বেশির ভাগ জুয়াসামগ্রী ভারত, চীন ও হংকং থেকে আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ক্যাসিনো ওয়ার গেম, রুলেট, পুকার সেট ও পুকার চিপ। এগুলো ডিজিটাল খেলার সামগ্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে। পত্রপত্রিকার এ প্রতিবেদন থেকে প্রতীয়মান হয়, এ অপসংস্কৃতি কখন থেকে চালু হয়েছে। সুতরাং অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদের ঢাকা যাবে না। বরং প্রধানমন্ত্রীর এ চলমান অভিযানকে সার্থক করতে যারা ক্যাসিনোর মতো অনৈতিক অবৈধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সাহায্য করাই বড় কাজ।
লেখক : সাংবাদিক

 


আরো সংবাদ