২৩ অক্টোবর ২০১৯

এ যেন ধর্ষণ-যুগ!

এ যেন ধর্ষণ-যুগ! - ছবি : সংগ্রহ

সাম্প্রতিক সময়কে কেউ যদি পৃথিবীর ধর্ষণ যুগ বলে আখ্যায়িত করেন, তবে তাকে কি খুব দোষ দেয়া যায়? বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান কিন্তু এ বক্তব্যের জোরালো সমর্থনে হাজির করা যায়। যুদ্ধের ময়দানে ধর্ষণ অন্য সব মারণাস্ত্রের মতো একটি অস্ত্র। এ কৌশল বহু বেশ পুরনো। শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে দিতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের নারীদের ধর্ষণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা উইমেন্স মিডিয়া সেন্টারের তথ্য মতে, একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্তত চার লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ২০ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার। রুয়ান্ডায় এ সংখ্যা পাঁচ লাখ। কঙ্গোতে সাড়ে চার লাখ। জনেভা কনভেনশনে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয়, আগের চেয়ে এখন সম্মুখ সমরের ঘটনা অনেক কম। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আফ্রিকার কিছু দেশে যুদ্ধ থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশ স্থিতিশীল।

কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনে ধর্ষণ প্রবণতা দিন দিন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকারের দেয়া তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩ হাজার ৬৩৮টি, যার ভেতরে গণধর্ষণ ছিল দুই হাজার ৫২৯টি। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে সব বয়সী নারী ও কন্যাশিশু। এ সময় ছয় হাজার ৯২৭টি শিশু ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় এক হাজার ৪৬৭ জনকে। ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ১৫৪ জন। এ চিত্র ভয়াবহ। নারীর প্রতি সহিংসতা বিশ্বব্যাপী প্রায় একই রকম।

দুনিয়াজুড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ নারী জীবনে কোনো-না-কোনোভাবে যৌননিপীড়নের শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে,৭ শতাংশ নারী সরাসরি ধর্ষণের শিকার। উন্নত অথবা অনুন্নত দেশ সবখানে একই চিত্র। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০৭ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষণ অথবা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বছর শেষে গড়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখ ৯৩ হাজার। শান্তির দেশ কানাডায় প্রতি চারজনে একজন নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। বার্ষিক যা চার লাখ ৬০ হাজার। মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে প্রতি বছর ৮৫ হাজার ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, উন্নত দেশের তকমা যাদের গায়ে লাগানো, সভ্য হিসেবে পরিচিত, ধর্ষণের ব্যাধি সেসব দেশেও ভয়ঙ্করভাবে সংক্রমিত। আবার ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪০ শতাংশ নরী ধর্ষণের শিকার। বছরজুড়ে ধর্ষণের সংখ্যা পাঁচ লাখ। সুতরাং এটি স্পষ্ট, ধনী বা গরিব শিক্ষার হার বেশি বা কম; ধর্ষণ এখন বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে উন্নত আর অনুন্নত দেশের ধর্ষণ প্রবণতার একটি মোটাদাগে পার্থক্য রয়েছে। উন্নত বিশে^ বেশির ভাগ ধর্ষণ হয় পরিচিতদের দিয়ে। সেখানে পুলিশে অভিযোগ করার হার অনেক বেশি। অন্য দিকে অনুন্নত দেশে রাস্তাঘাটে অপরিচিত পুরুষের মাধ্যমে ধর্ষণের সংখ্যা বেশি। পুলিশে অভিযোগের হার তুলনামূলক কম।

ধর্ষণের যে তথ্য-উপাত্ত আমরা পাই; তা কেবল পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ অথবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরেও আছে ধর্ষণের অজস্র ঘটনা। নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। শুধু অনুন্নত বিশ্বে নয়, উন্নত বিশ্বের এ প্রবণতা লক্ষণীয়। যৌন নির্যাতনের কথা গোপন করার পরিসংখ্যানটি ভয়াবহ। কানাডায় এক হাজার যৌন নির্যাতনের ঘটনার ৩৩টি পুলিশকে জানানো হয়। আমেরিকায় ৬৮ শতাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনায় নির্যাতিতরা পুলিশকে কিছুই জানায় না। উন্নত বিশ্বের অবস্থা এ হলে বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশগুলোতে এটি কত ভয়াবহ হতে পারে, সেটি সহজেই অনুমেয়।

প্রশ্ন হচ্ছে- ধর্ষণ কেন হচ্ছে? কেনই বা ধর্ষণের হার ব্যাপক হারে বাড়ছে? এর জবাব বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন। কেউ মনে করেন, ধর্ষণের সাথে পরোক্ষভাবে নারীর পোশাক জড়িত, কেউ মাদক-পর্নোগ্রাফি বা বিজাতীয় অপসংস্কৃতিকে দায়ী করেন ধর্ষণের কারণ হিসেবে। ধর্ষণের পেছনের অদৃশ্যমান আরেকটি কারণ কিছুটা হলেও উন্মোচন করা হয়েছে নারীপক্ষ নামে একটি সংস্থার গবেষণায়। নারীপক্ষের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র চারজনের সাজা হয়েছে। ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা হচ্ছে মাত্র চারজনের। মহিলা আইনজীবী সমিতির আরেক জরিপে দেখা যায়, ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। এসব মামলার ভেতরে যেগুলোর রায় হচ্ছে সেখানেও আছে দীর্ঘসূত্রতা। এ দীর্ঘ সময়ে ধর্ষিতাকেও মনস্তাত্ত্বিক ধর্ষণের শিকার হতে হয় বছরের পর বছরজুড়ে।

ধর্ষিতারা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতনকে গোপন করছেন, ধর্ষকেরাও পার পেয়ে যায় নানা ফন্দি-ফিকিরে। এ সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষকামীদের ধর্ষণে সাহস জোগায়। গত ছয় মাসে দুই হাজার ৮৩ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৭৩১ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতনের হারও অন্য সময়ের চেয়ে বেশি।

শিক্ষা-চেতনা অথবা অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা কোনো কিছু দিয়ে ধর্ষককে আলাদা করার উপায় নেই। ধর্ষকেরা শুধু একটি নির্দেশকের মাধ্যমেই চিহ্নিত হতে পারে সেটি হচ্ছে ধর্ষণকামী মন। ধর্ষণকামী এসব মানুষকে ভয় দেখাতে হবে। ধর্ষণ করলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কঠোর পরিণতির ভয়ে মনগুলো আর ধর্ষণকামী হয়ে উঠবে না। ভারতে ধর্ষণের মহামারীর সংবাদ শুনে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি, নিজের দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের পরিসংখ্যানগুলোর দিকেও তাকিয়ে দেখা উচিত, আমরাও কিন্তু হাঁটছি সেই দিকে যেখানে নারীর নিরাপত্তা সঙ্কুচিত হচ্ছে দিন দিন। গত ছয় মাসে দুই হাজার ৮৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৭৩১ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এসব ঘটনা ঘটেছে। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যাসহ অন্য নির্যাতনের হার ও যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। নারী ও শিশুদের উত্ত্যক্তকরণ ও যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে।

লেখক : শিক্ষার্থী


আরো সংবাদ